দিন দশেক হবে হাসান সাহেব চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। কিন্তু অফিসে যাবার অভ্যেসটা ছাড়তে পারছেন না। আজও ঘুম থেকে উঠে গোসল সারলেন। তারপর স্ত্রীকে ডাকলেন, কই খাবার দাও গাড়ি চলে আসবে।
শেলী বলল, কার গাড়ি আসবে?
কেন অফিসের গাড়ি।
আজ অফিস আছে নাকি?
হাসান সাহেব বললেন, নেই! কেন?
শেলী অবাক হয়ে হাসান সাহেবকে দেখছে আর ভাবছে কী হলো মানুষটার? শেলী বলল, তুমি খেতে বস। খাবার প্রায় হয়ে গেছে।
হাসান সাহেব খাবার টেবিলে গিয়ে বসলেন। শেলী খাবার দিল।
হাসান সাহেব বললেন, গাড়ি আসছে না কেন?
শেলী বলল, তুমি তো চাকরি থেকে অবসর নিয়েছ। গাড়ি আসবে না।
হাসান সাহেব খুব মন খারাপ করে বললেন, দেখেছ আমি তো ভুলেই গিয়েছি।
শেলী বলল, তোমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে?
হাসান সাহেব বললেন, কাপড় তো পরেই আছি, নীতু ভাবির বাসায় যাই?
শেলী বলল, এখন যেয়ো না। নীতু ভাবি তো চাকরি করে। তার দেখাই পাবে না। বিকালে যেয়ো।
হাসান সাহেব বললেন, ঠিক আছে।
বিকাল পাঁচটার দিকে শেলী একটু শুয়েছে। ঘুমানোর চেষ্টা করছে। হাসান সাহেব বললেন, শেলী ঘুমানোর চেষ্টা করছ তো?
শেলী বলল, হ্যাঁ। কেন?
হাসান সাহেব বললেন, আমি নীতু ভাবিদের বাসা থেকে ঘুরে আসি।
শেলী বলল, ঠিক আছে যাও। সাথে কে যাচ্ছে?
হাসান সাহেব বললেন, পিকলুকে নিয়ে যাচ্ছি।
শেলী বলল, ঠিক আছে যাও। এই পিকলু একটা গাড়ি ডেকে আন।
ওরা চলে গেল। শেলী যথারীতি তার কাজকর্ম সারল। রাত্রি প্রায় নটা বাজে। পিকলুরা এখনো এলো না। এলো প্রায় সাড়ে নটার দিকে। শেলী বলল, এত দেরি করলে?
আর বোলো না হাজার রকম কথাবার্তায় দেরি হয়ে গেল।
ঠিক আছে ভাত খেয়ে নাও।
হাসান সাহেব বললেন, ভাত খাব নাকি তাই ভাবছি।
কেন?
অনেক কিছু খাওয়াল নীতু ভাবি।
ঠিক আছে। এই পিকলু খেতে বোস।
পিকলু বলল, হ্যাঁ মা। তাড়াতাড়ি খেতে দাও।
শিপলু জিগ্যেস করল, এই পিকলু কী খেলি রে?
পিকলু বলল, ঘোড়ার ডিম।
তার মানে? মানে?
বিস্কিট কলা পেয়ারা এসব খেয়েছি। বাবা আবার কখন কত কিছু খেল বুঝতে পারছি না।
রাত পোহাল। হাসান সাহেব সকালে উঠে ঘোষণা দিলেন, আজ গ্রামের বাড়িতে যাবেন। বহুদিন যাওয়া হয় না। শেলী অবাক, বাড়ি যাবে?
হ্যাঁ যেতে হবে। তোমরা যাবে নাকি?
না আমরা যাব না।
ঠিক আছে যেতে হবে না।
আমি একাই যাই।
সাবধানে থেক।
তা তো থাকবই। চিন্তা কোরো না। তাড়াতাড়ি চলে আসব।
গ্রামে এসে পৌঁছালেন হাসান সাহবে। কিন্তু কিচ্ছু ভালো লাগল না। মা নেই বাবা নেই। সব ফাঁকা ফাঁকা। দোলনচাঁপার গাছদুটো কারা যেন নষ্ট করে রেখেছে। মাধবীলতার ঝাড় উধাও। প্রিয় বাগানবিলাসও নেই। হাসান সাহেবের মন খারাপ। শিউলিগাছ দুটিও নেই। উঠোন ভরতি শিউলি ফুল ঘ্রাণ ছড়াত। সেসব দিন কোথায় হারিয়ে গেল। ভাবতেই খারাপ লাগছে।
কিছুতেই তাঁর মন টিকল না। দুদিন পর ঢাকায় চলে এলেন। হাসান সাহেব এসেই পিকলু-শিপলুকে ডাকাডাকি শুরু করলেন। এটাই ভালো। হাসান সাহেব একটা সুখ সুখ অনুভূতি টের পেলেন। ভালো লাগল। শেলী বলল, কী হয়েছে তোমার? ওদের তো ক’দিন পরই পরীক্ষা, এখন ডেকো না। ওদের পড়তে দাও।
আচ্ছা আর ডাকব না।
এই শেলী, একটা গান শোনাও না।
শেলী বলল, কতোদিন চর্চা নেই। ভালো হবে না।
ভালোর দরকার নেই। আমিই তো শুধু শুনব।
শেলী হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না।
হাসান সাহেব বললেন, শেলী চল না কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসি। কিছু ভালো লাগছে না।
এবার শেলীর মায়া হলো। শেলী বলল, আমরা পার্কে বেড়াতে যাব।
হাসান সাহেব বললেন, পার্কে যাব? কী করব গিয়ে? দোলনায় চড়ব? তুমি গান গাইবে?
শেলী বলল, সে দেখা যাবে।
পরের দিন বিকালে ওরা পার্কে এলো। পার্কটা খুব সুন্দর। অনেক ফুলের গাছ। দোলনা তো আছেই। হাসান সাহেব নানান রকমের গাছ দেখতে শুরু করলেন। ভালোই লাগল। হাসান সাহবে বললেন, দোলনচাঁপা গাছ তো দেখছি না।
শেলী বলল, নেই। ওটা পাওয়া যাবে নার্সারিতে। আনাবার ব্যবস্থা আমি করব। চিন্তা কোরো না।
হাসান সাহেব আনন্দে বিভোর হয়ে রইলেন। দোলনচাঁপা এলো। গাছও লাগানো হলো। হাসান সাহেব বললেন, আর কী কী গাছ লাগানো যায়?
এই বাসাতে অনেক গাছ আছে। আম জাম কাঁঠাল শিউলি গন্ধরাজ কামিনী আরো অনেক কিছুই আছে। শেলী বলল, দোলনচাঁপার যত্ন কোরো।
হাসান সাহেব বললেন, এখন তো আমার অফিস নেই। গাছের যত্নই করব। সেই ভালো।
