সমীকরণ হলো সংখ্যা ও প্রতীক ব্যবহারের একধরনের গাণিতিক বিবৃতি, যেখানে দুইটি পক্ষের সমান বা আনুপাতিক ভারসাম্যের হিসাব দেখানো হয়। গাণিতিকভাবে এই ফর্মুলা ব্যবহার ও প্রমাণ করা যত সহজ, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা ততই কঠিন। তবে বাঙালির ইতিহাসে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ মানুষের অধিকার ও স্বাধিকার আদায়ের সবচেয়ে বড় দুইটি অর্জনে আছে এক চমত্কার গাণিতিক সমীকরণ। সেটি হচ্ছে ২০২৪ সালে ৫২-এর ৭১ বছর আর ৭১-এর ৫২ বছর। আছে গণিতের মতোই অনেক সমতা ও অর্জন; যেমন বাংলা ভাষা আজ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে, অন্তর্ভুক্ত হয়েছে জাতিসংঘের পঞ্চম ভাষা হিসেবে। ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আজ বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে অনায়াসে। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বাঙালি জাতি আজ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিত্সা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামা ইত্যাদি খাতে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিস্ময়। দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দর, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, ৪জি-৫জি মোবাইল টেকনোলজি, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল বাংলাদেশের সফল জার্নি শেষে, স্মার্ট বাংলাদেশে উপনীত হওয়ার এক বিস্ময়কর সমীকরণে এগোচ্ছে বাংলাদেশ, যা সত্যিকার অর্থে ৫২ এবং ৭১’র চেতনাকে ধারণ করে চলেছে।
তবুও ভাষা আন্দোলনের ৭১ বছর এবং স্বাধীনতার ৫২ বছর আমাদের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির সমীকরণে যেমন বেশ কিছু চমত্কার মিল আছে, তেমনি আছে অমিলও; যেমন ভাষা আন্দোলনের ৭১ বছরেও স্বীকৃতি পাননি বাগেরহাটের চারণ কবি সামসুদ্দিন শেখ। ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনও করিলিরে বাঙ্গালী, তোরা ঢাকা শহর রক্তেই ভাসায়লী’—এই গানের রচয়িতা সে। ৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকায় বসে এই গান রচনা করেন তিনি, যা সে সময়ে ‘রাষ্ট্রভাষা’ নামে ভাষা আন্দোলনের প্রথম গান হিসেবে অনেকেই মনে করেন। তার এই গান অমর হয়ে থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাষাসৈনিক হিসেবে তিনি আজও কোনো স্বীকৃতি পাননি। নাম না জানা এরকম আরো ভাষাসৈনিক আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। একইভাবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ঐতিহাসিক প্রতীক শহিদ মিনারও নেই অনেক প্রতিষ্ঠানে। গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, শুধু বরিশালের ৩১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার নেই। সারা বাংলাদেশে এই সংখ্যা কত, তা খুব সহজেই অনুমেয়। স্থায়ী শহিদ মিনার না থাকায় প্রতি বছর এসব প্রতিষ্ঠানে বাঁশ-কাঠ ও কাগজ দিয়ে অস্থায়ী শহিদ মিনার বানিয়ে শহিদদের উদ্দেশে তারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ফলে ভাষা আন্দোলনের ৭১ বছর এবং স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও অনেক শিক্ষার্থী ভাষাশহিদের আত্মত্যাগের সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে না; অথচ ৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিল একই সমীকরণের শুরু ও শেষের ধাপ।
এদিকে শহিদ কাজী মতিউর রহমান, ৭১-এর রণাঙ্গনের অমিত সাহসী এক অকুতোভয় বীর যোদ্ধার কথা কে না জানে। তার ১৯৭০ সালের বরিশালের চাষাঢ়ে শের-ই-বাংলার পুত্র একে ফায়জুল হকের নির্বাচনি জনসভায় জ্ঞানগর্ব জ্বালাময়ী বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু নিজের গায়ের চাদর খুলে তার গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই ছাত্রনেতা দেশ বিজয়ের মাত্র ২০ দিন আগে শত্রুদের নির্মম বুলেটে নিহত হন; অথচ গত ৫২ বছর মহান এই শহিদের কোনো স্বীকৃতি ছিল না। অবশেষে এ বছর (২০২৪) ৫ জানুয়ারি তাকে শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয় (বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যার ৭ ক্রমিকে ৩৬৩৮ নম্বর গেজেট)। তবে তার মৃতদেহ খুঁজে না পাওয়ায় স্মৃতি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না আজও। এভাবে এখনো যেমন অনেক মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস অজানা রয়ে গেছে, তেমনি সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের তথ্যসংবলিত ‘মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ’ তৈরি করে জাতিকে ধন্য করেছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৫৬টি সংবাদ, ফিচার, চিঠি, কনটেন্ট ইত্যাদি সংগ্রহের একটি সমৃদ্ধ ডাটাবেজ হলো এই ‘মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ’। এর বিপরীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রায়ই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার খবর প্রকাশিত হয়। এদিকে অনেক মুক্তিযোদ্ধার খবর প্রকাশিত হয়, যাদের বয়স ঐ সময় সাত বছর থেকে আট বছর ছিল। এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা মাসিক হারে ভাতাও নিচ্ছেন, যা খুবই লজ্জাকর এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য কলঙ্কজনক। এই অন্যায় চলতে দেওয়া যায় না এবং এই অসম সমীকরণের লাগাম টানা দরকার।
সর্বত্র বাংলা বছর প্রচলনটি আজও পরিপূর্ণ হয়নি গত ৭১ বছরে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ বিচারব্যবস্থার রায়ে। প্রফেসর সলিমুল্লাহ স্যারের মতে, প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অনেকেই শুদ্ধ বাংলা বলতে ও লিখতে পারে না। শিক্ষাজীবনে প্রত্যেকটি ছাত্র যেসব বিষয়ে কম নম্বর পায়, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলা, আর বিকৃত ও বাংলিশ উচ্চারণ এখন প্রতিদিনের অভ্যাস, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্মার্টনেস হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। দেশের অগণিত টেলিভিশন চ্যানেলের খবর পাঠকদের কথা শুনলেই এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা ভাষার প্রতি দরদ দিনদিন কমে যাচ্ছে। একইভাবে অসম্মান করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু আজ ধর্মকে ব্যবসা করে রাজনীতি হচ্ছে। ফলে রাজনীতিতে নেই নিবেদিত রাজনীতিবিদ, সাংবাদিকতায় নেই সাচ্চা সাংবাদিক। রাজনীতিতে আজ ব্যবসায়ীরা ও সরকারি কর্মকর্তারা কথা বলছে রাজনীতির ভাষায়। পেঁয়াজ-রসুন-আদার দাম বাড়িয়ে গরিবের পেটে মারা হচ্ছে লাথি, মন্ত্রী-এমপি-আমলাদের অর্থ ও সম্পদের পরিমাণ বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে (সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত নির্বাচনি হলফনামার বর্ণনা)। হাসপাতালে চলছে রোগীবাণিজ্য, ভূমি ও পাসপোর্ট অফিসে চলছে দালালদের দৌরাত্ম্য। কৃষক পাচ্ছে না তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য, ধনী ও গরিবের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে বৈষম্যহীনভাবে। এসব কিছুই ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। যদিও এসব অনিয়ম নিরসনে সরকারের নানা উদ্যোগের অন্ত নেই। তাই কোনো আইন দিয়ে নয়, মায়ের ভাষার প্রতি সম্মান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের বিবেক ও বিবেচনার সমীকরণ দিয়ে এই বৈষম্য দূর করতে হবে, সমুন্নত রাখতে হবে ৫২ ও ৭১-এর আদর্শকে।
লেখক: অধ্যাপক ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
