সুষম খাদ্যের মতো সুষম উন্নয়নও জরুরি

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:৩০

ইতিপূর্বে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী একটি অনুষ্ঠানে বলিয়াছিলেন যে, শ্রেণি-পেশানির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে সরকার কাজ করিতেছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সুষম উন্নয়ন আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম মূল ভাবনা। কারণ, বাংলাদেশ স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক উন্নয়নকাজ। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানকে বিবিধ বৈষ্যমে তিমিরাচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল; কিন্তু দুঃখের বিষয় হইল, স্বাধীনতার অর্ধশতক বত্সর পরেও সুষম উন্নয়নে আমরা এখনো যথেষ্ট পিছাইয়া রহিয়াছি। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত জরিপে দেখা গিয়াছে, বাংলাদেশে বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পাইয়াছে। ২০১৬ সালে এই বিভাগে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ, বর্তমানে তাহা ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ বরিশাল অঞ্চলটি শস্যভান্ডার হিসাবে পরিচিত। আবার বরিশাল বিভাগেই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সবচাইতে অধিক। সেই হিসাবে সেইখানে দারিদ্র্য হ্রাস হইবার কথা। তবে কাহারো মতে, দারিদ্র্যের হার অধিক বলিয়াই সেইখানে সামাজিক নিরাপত্তা অধিক। জরিপে আরো প্রকাশ পাইয়াছে যে, ঢাকায় বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, সিলেটে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ, রংপুরে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ, আর ময়মনসিংহে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। গত ছয় বত্সরে ঢাকা, সিলেট ও বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার বাড়িয়াছে। বাকিগুলিতে কমিয়াছে। সকল মিলাইয়া দেশে এখন সার্বিক দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ছয় বত্সর পূর্বে অর্থাত্ ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশে অতিদারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ; ছয় বত্সর পূর্বে এই হার ছিল ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। কয়েক মাস পূর্বে ‘ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর (আইপিডি) একটি গবেষণায় উঠিয়া আসিয়াছে যে, বাংলাদেশের এডিপি প্রকল্পে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত সাতটি জেলাই মোট বরাদ্দের ৫০ শতাংশ বরাদ্দ পাইতেছে, অথচ স্বল্প বরাদ্দপ্রাপ্ত ২৫টি জেলা পাইতেছে মাত্র ১৩ শতাংশ। বৈষম্য পরিমাপক ‘পালমা রেশিও’ অনুযায়ী ইহার মান ৩ দশমিক ৭২, যাহা এখনো দেশের মধ্যে উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের উচ্চ বৈষম্যকেই নির্দেশ করে।

তবে আশার কথা হইল, পদ্মা সেতু চালু হইবার পাশাপাশি বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন উদ্যোগের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়নবৈষম্য হ্রাসের সুযোগ তৈরি হইয়াছে। ইহার পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দের ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করিতে হইবে। এই সকল বৈষম্য দূরীভূত করা না গেলে বাংলাদেশের সুষম উন্নয়ন সম্ভব হইবে না। ইহাতে এই সকল অঞ্চল দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়নে পিছাইয়া পড়িতেছে। ইহা ছাড়াও বাংলাদেশের সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করিতে বিশেষায়িত এলাকা তথা পাহাড়ি অঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল, হাওর এলাকা ও চরাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের নগরায়ণে ঢাকাকেন্দ্রিকতা প্রতিনিয়ত বাড়িতেছে। অন্যদিকে অন্যান্য বিভাগীয় শহরসহ জেলা, উপজেলা ও পৌর এলাকার নগরায়ণ হইতেছে অগোছালো ও অপরিকল্পিতভাবে। স্বাভাবিকভাবেই ইহা আমাদের সুষম, পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করিতেছে।

আমরা জানি, কর্মসংস্থান, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা—মূলত এই তিন কারণে মানুষ গ্রাম হইতে শহরে আসিতে চাহে। সমগ্র দেশে সুষম বিনিয়োগের মাধ্যমেই কেবল বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব। আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি যে, শহরের সুবিধা গ্রামে ছড়াইয়া দেওয়ার জন্য সরকার একটি উদ্যোগ লইয়াছে। শহরের সুবিধা যখন গ্রামে যাইবে এবং গ্রামের সুবিধা যখন শহরে পাওয়া যাইবে তখনই ভারসাম্যপূর্ণ ও সুষম উন্নয়ন হইবে। আমরা আশা করিব, সুষম এই উন্নয়নের ধারা হইবে পরিকল্পিত ও ভারসাম্যপূর্ণ। প্রতিটি পিছিয়ে পড়া জেলা তাত্পর্যপূর্ণ উন্নয়ন পরিকাঠামোর মধ্যে আসিলে তাহার দেশেরও সার্বিক স্থিতিশীলতা ও উন্নতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মূল ভাবনা দেশের ‘সুষম উন্নয়ন’ বাংলাদেশের প্রতিটি কোনায় ছড়াইয়া দিতে হইবে। শরীরের জন্য যেমন সুষম খাদ্য, তেমনি দেশের জন্য সুষম উন্নয়ন জরুরি।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন