সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বর্ষ বিদায়

আত্মসমালোচনা ও পরকালের সঞ্চয়

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৯:২৭

বিরামহীন সময়ের স্রোতে বর্ষ বিদায়—স্বাগত সন্ধিক্ষণে আত্মজিজ্ঞাসা—জীবনবৃক্ষের ৩৬৫টি ফুল দিয়ে ২০২৩ সালে সার্থক একটি মালা গাথা হলো কি? জীবনখাতার প্রতিদিনের ৮৬,৪০০ সেকেন্ডের অব্যবহূত একটি সেকেন্ডও আমরা জমা রাখতে পেরেছি কি? পবিত্র কুরআনের আহ্বান ‘... ভেবে দেখো আগামীকালের জন্য কী সঞ্চয় করেছ।’ (সুরা হাশর:১৮)। ইসলামে সময়ের সদ্ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘ওয়াল আসর’ বা পড়ন্ত বিকেল তথা মহাকালের শপথ। মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত...’ (সুরা আসর :০১)। প্রিয় নবি (স.) বলেন ‘এমনভাবে দুনিয়ায় বসবাস করো, যেন তুমি একজন মুসাফির অথবা স্রেফ পথ অতিক্রমকারী...’ (বুখারি)। হজরত ওমর (রা.) তার এক খুতবায় বলেন, ‘তোমার কাছে হিসাব চাওয়ার আগেই নিজের হিসাব করে নাও....’ (তিরমিজি)। ২০২৩-এর বিদায়েও প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা ও হিসাব মেলানোর পালা—যে কাজ করা উচিত ছিল অথচ করা হয়নি এবং যে কাজ করা ঠিক হয়নি অথচ করা হয়েছে, তা কি যথার্থ হয়েছে?

ইসলামে ‘মুহাসাবা’, ‘ইহিতসাব’ শব্দের দ্বারা আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মসমালচনাকে বোঝায়। লিসানুল আরব অভিধানে আছে, মুহাসাবা অর্থ গণনা, হিসাব করা। ইহতিসাব অর্থ সওয়াবের আশা, আত্মসমালোচনা। অর্থাৎ, হিসাব, গণনা, পর্যালোচনা ইত্যাদি। আত্মসমালোচনাকে আরবিতে ‘মুহাসাবা-ই নাফস’ বলে।

দুয়ারে কুয়াশার চাদর মোরা নববর্ষ ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ সমাগত। বর্ষপরিক্রমায়ও রয়েছে মহান আল্লাহ্র অমোঘ বিধান—‘তিনি সূর্যকে প্রচণ্ড দিপ্তি দিয়ে/ চাঁদ বানিয়ে দিলেন স্নিগ্ধতা ভরে,/ বছর গণনা ও হিসাবের তরে’ (কাব্যানুবাদ, সুরা ইউনুস, আয়াত :০৫)। এছাড়া পবিত্র কুরআনে ১২ মাসে এক বছর প্রসঙ্গে আছে ‘নভোমণ্ডল-ভূমণ্ডল সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই আল্লাহ্ ১২টি মাস নির্ধারণ করেছেন....’ (সুরা তওবা, আয়াতাংশ :৩৬)। নববর্ষ, বঙ্গাব্দ বা ইংরেজি বর্ষবরণ, হোক না তা হিজরি সনের প্রথম দিন। মনে রাখতে হবে, আমরা মুসলমান, আমাদের ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গে শৈথিল্যের অবকাশ নেই। প্রিয় নবি (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসবে এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্যই কারো সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে, আবার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করবে অথবা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দান করা থেকে বিরত থাকবে, সে-ই তার ইমানকে পূর্ণতায় পৌঁছে দিল’ (তিরমিজি)।

প্রিয় নবি (স.)-এর নবুওয়াতপূর্ব জাহিলিয়াত বা ‘মূর্খতার যুগের’ উত্সবে ছিল না নৈতিকতার ছোঁয়া। আইয়ামে জাহিলিয়াতের আরবরা যুদ্ধবিদ্যা, অতিথিসেবা, পশুপালন, দেশভ্রমণ, আন্তদেশীয় ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদিতে ছিল বিখ্যাত। শিল্প-সাহিত্যেও কম যায়নি তারা। সেই সময়ের ইতিহাসখ্যাত ছিল ‘উকাজের মেলা’। কবিতা উত্সবের সর্বশ্রেষ্ঠ সাতটি কবিতা ‘সাবউল মুয়ল্লাকাত’ স্থান পেয়েছিল পবিত্র কা’বার দেওয়ালে। ছিল নববর্ষ পালন ও ঘৌড়দৌড় উপলক্ষ্যে প্রচলিত দুটি উত্সব ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরগান’। এসবের মধ্যে সংস্কৃতির নামে ছিল অপসংস্কৃতির অবাধ্যতা। এই পটভূমিতেই সুরা মায়েদার ৯০ নম্বর আয়াতে কতিপয় অপকর্মকে ‘ঘৃণিত শয়তানি কর্ম’ বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। তবুু ২০২৪ হতে পারে আমাদের কল্যাণের উপায়। যদি আমরা নববর্ষকে আল্লাহ্র নিয়ামত মনে করে শুকরিয়া আদায় করি। নববর্ষের আনন্দ দুস্থ-দরিদ্রদের সঙ্গে ভাগ করি। এবং নববর্ষে শীতার্ত ও অভাবী মানুষের খোঁজ-খাতির, তাদের পোশাক ও খাদ্য দান করি।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন