কেমন ছিল তেইশের জীবন

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৩:৩০

বেশ ঘটনাবহুল ছিল ২০২৩। কোন বছর এমন ইস্যু থাকে না? তবে এই বছরটা কিছুটা ব্যতিক্রম। নানা চমক আর বৈশ্বিক ইস্যুর ডামাডোলে ভরপুর এ পুরো সময়টা যে দেশের মানুষ বেশ উপভোগ করেছে, একদমই তেমনটা বলা যাবে না। সদ্য অতীত হয়ে যাওয়া এ বছর মানুষের জীবন আর অভ্যাসে এনেছে ইতিবাচক নানা পরিবর্তন। 

রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট থেকে শুরু করে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ বা জাতীয় নির্বাচন, ইস্যু দেশের হোক অথবা আন্তর্জাতিক, বাঙালির জীবনে পড়েছে এই সবগুলোরই প্রভাব। আরও সহজ করে বলতে গেলে, আমরা যে দিন দিন বৈশ্বিক নাগরিকে পরিণত হচ্ছি, তা হারে হারে বুঝিয়ে দিয়েছে ২০২৩। সাত সাগরের ওপারের যুক্তরাষ্ট্র বা দূরের দেশ ইউক্রেন থেকে হিমালয়ের পাদদেশ ঘেঁষে বাংলাদেশে বছরব্যাপী ঘটে যাওয়া নানা ইস্যুর আমাদের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে, সেই আলোচনা নিয়েই এই আয়োজন।

 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকট

২০২৩ সালের শুরুতেও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যুদ্ধের এক বছর পূরণ হয়েছে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে। যার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে। বেড়েছে তেল-গ্যাস আর গমের দাম। এ বছরের এপ্রিলে কৃষ্ণসাগর শস্য-চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দেয় রাশিয়া। জুলাইয়ে যা বাস্তবে রূপ নেয়। গমের দাম বাড়ার যে আশঙ্কা ছিল জনমনে তা রূপ নেয় সংকটের। এ যুদ্ধের প্রভাব পড়েছিল আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারেও। যার প্রভাব এসেছে দেশের জ্বালানি তেলের বাজার পর্যন্ত। তবে সবকিছু ছাপিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গে ভূরাজনৈতিক প্রশ্নই মানুষের মনে কাজ করেছে বেশি। বিভিন্ন সময়ে নানা গুজবও ছড়িয়েছে। 'যত দোষ নন্দ ঘোষের' সব পণ্যের দাম বাড়ানোর পেছনেই উঠে এসেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বলা যায়, এ গুজবের মহা সুযোগ নিয়েছে সিন্ডিকেট নামক অদৃশ্য এক শক্তি। 

চালের বাজারের দামামা

নিজেদের অভ্যন্তরীণ চালের বাজারের লাগাম টানতে বাসমতি ছাড়া সব ধরনের সাদা চালের রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ভারত সরকার। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ইন্ডিয়ান মুদি দোকানগুলিতে আতঙ্কিত খদ্দেরদের চাল কেনা এবং দোকানের খালি হয়ে যাওয়া তাকের ছবি এবং ভিডিও চলে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ আতঙ্কে চালের দাম আরও বেড়ে যায়। একই সময় পাকিস্তানে বন্যা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তোলে চালের বাজার। যার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেড়ে যায় চালের দাম। এমন পরিস্থিতিতে 'হুজুগে বাঙালি' বাড়িতে মজুত বাড়াতে শুরু করে তাড়াহুড়ো করে চাল কেনা। তবে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছে শ্রমজীবী মানুষ ও নিম্ন আয়ের লোকদের। দীর্ঘ সারি, টোকেনের জন্য কাড়াকাড়ি-হুড়োহুড়ি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে চাল না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফেরা। 

শঙ্কার বছর

২০২৩-কে দুর্যোগের বছর বললে ভুল হবে না। এ বছরের বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় অসংখ্য ভূমিকম্প অনুভব করেছে দেশের মানুষ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অনুভূত ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে ১৭টির উৎপত্তি বাংলাদেশে। আর চলতি বছর বাংলাদেশ ও এর আশপাশে অন্তত ৩৩টি ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে আটটিরই উৎপত্তিস্থল দেশের অভ্যন্তরে। এর মধ্যে প্রথম ভূকম্পন অনুভূত হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি। রিকটার স্কেলে ৩ দশমিক ৯ মাত্রার এ কম্পন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের পাশাপাশি সিলেট অঞ্চলে অনুভূত হয়। এরপরেরটা ২৫ ফেব্রুয়ারি, যা মিয়ানমারের পাশাপাশি কক্সবাজারেও ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল। মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। পরে একে একে ৩০ এপ্রিল ৪ দশমিক ৬ মাত্রার, ৫ মে ৪ দশমিক ৩ মাত্রার, ১৬ জুন ৪ দশমিক ৫ মাত্রার, ১৪ আগস্ট ৫ দশমিক ৫ মাত্রার, ২৯ আগস্ট ও ১৮ সেপ্টেম্বর দফায় দফায় ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। অক্টোবরে মেঘালয়ের ৫ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে কাঁপে বাংলাদেশ। 

চলতি বছরের মার্চে এক সমীক্ষায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জানায়, ঢাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। টাঙ্গাইলের মধুপুরে মাটির নিচে যে চ্যুতিরেখা বা ফল্টলাইন রয়েছে, সেখানে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকায় ৮ লাখ ৬৫ হাজার ভবন ধসে পড়বে। দিনের বেলায় এ ভূমিকম্প হলে মারা যাবেন ২ লাখ ১০ হাজার মানুষ, আহত হবেন ২ লাখ ২৯ হাজার। আর ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ভূমিকম্পের প্রবণতা বেড়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ

ঘূর্ণিঝড় এবং মধ্যমেয়াদী বন্যাতেও এ বছর আক্রান্ত হয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলা। এগুলোকে ছাপিয়েও বিপর্যয় এনেছে বন্যা ও দাবদাহ। জুন-জুলাইয়ে তীব্র দাবদাহে পুড়েছে পুরো বিশ্ব। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জারি করা হয়েছিল জরুরি অবস্থা। তীব্র গরমে বিপর্যস্ত হয়েছিল বাংলাদেশও। গরমের তীব্রতায় অবশেষে ঢাকায় নিয়োগ দেওয়া হয় এশিয়ার প্রথম চিফ হিট অফিসারকে। তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে সৃষ্ট সঙ্কট মোকাবিলা এবং নগরে 'হিট আইল্যান্ডে'র প্রভাব কমানোর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন করেন চিফ হিট অফিসার। প্রচণ্ড গরমে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে ছোট-বড় ফ্যানের চাহিদাও যায় বেড়ে। অনেকে উন্নত প্রযুক্তির বহনযোগ্য টেবিল ফ্যান এমনকি নেক ফ্যান (হেডফোনের মতো গলায় ঝুলিয়ে রাখা যায়) কেনা শুরু করেন। এই সুযোগে বাজারে ফ্যানের দাম বাড়িয়ে দিতে শুরু করেন বিক্রেতারা। সংবাদমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদনে উঠে আসে ঘর্মাক্ত কলেবরে দোকানে দোকানে ঘুরতে থাকা মানুষের ভোগান্তির চিত্র। অনেকে তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেন। 

যেন নিয়ন্ত্রণেই আসছে না ডেঙ্গু

২০২৩ সালে বেশ ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে। তাদের নানা কার্যক্রমের পরও ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআরের তথ্য বলছে, এ বছরের ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা গত ২৪ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সিঙ্গাপুর থেকে আনা হয়েছে ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস সেরোটাইপ ইসরায়েলেন্সিস (বিটিআই) নামক কীটনাশক ব্যাকটেরিয়া। অনেকে রসিকতা করে কর্তৃপক্ষের এসব উদ্যোগকে বলেছেন, মশা মারতে কামান দাগা।

অন্যদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষে পরিপূর্ণ হাসপাতালগুলোতে দুর্ভোগের চিত্রও উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে। হাসপাতালের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকের আরও অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরও উঠে আসে গণমাধ্যমে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্যালাইনের সংকট দেখা দেয় বাজারে। ফার্মেসিতে ঘুরে বাড়তি টাকা দিয়েও পাওয়া যায়নি স্যালাইন। এ সময় উঠে আসে স্যালাইন উৎপাদনে আমাদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নানা বিপত্তি। আবার হু হু করে বাড়তে থাকে ডাবের দাম। এ নিয়ে রোগীদের হতাশা ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও শোনা যেতে শুরু করে। 

সামান্য বৃষ্টি, সড়কে অনাসৃষ্টি

জলাবদ্ধতা ছিল ২০২৩ সালের আরেক ভয়াবহ ঘটনা। সামান্য বৃষ্টিতেই নগর অঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলেও মধ্যমেয়াদী বন্যা দেখা দিতে শুরু করে। অবকাঠামো নির্মাণগত ত্রুটি এবং জটিলতার কারণে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হতে না পারায় এ সমস্যা দেখা দেয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। সামান্য বৃষ্টিতে সড়ক ডুবে যাওয়া এবং পথঘাটে হাঁটাচলার ভোগান্তি মানুষের জীবনে এনেছে পরিবর্তন। 

এ বছরের ২১ সেপ্টেম্বর রাতে মাত্র ৪ ঘণ্টায় ঢাকা শহরে ১১৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। তলিয়ে যায় শহরের অধিকাংশ রাস্তা। ভয়াল যানজটে আটকে ছিল পুরো ঢাকা। রাত থেকেই শহরবাসীকে আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়েছে। রাজধানীর কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি জমে যায়। একই সঙ্গে নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, জিগাতলা, মিরপুর, পুরান ঢাকাসহ পুরো রাজধানী জলাবদ্ধ ছিল টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত শেষে নিউমার্কেট, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা কলেজসহ দুই সিটি করপোরেশনের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ঢাকার মিরপুরের অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতা বহু পুরোনো ঘটনা। সামান্য বৃষ্টিতেই শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া অঞ্চল যায় ডুবে। এ সময় নৌকাও নামতে দেখা যায়। এ নিয়ে মানুষ রসিকতা করলেও চলতি বছর আর করেনি। কারণ জলাবদ্ধতার দরুন মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। সেইসঙ্গে দেখছি সিলেট, টাঙ্গাইল, ফেনী, বরিশালের বহু অঞ্চলে ফসল নষ্ট হয়েছে, মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ। দূষিত হয়েছে সুপেয় পানির আঁধার। ফলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সংকট এখনও মানুষের মনে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

গণপরিবহনের ভাড়া নিয়েও নৈরাজ্য

পরিবর্তন সড়কে শুধু জলাবদ্ধতাতে নয়। পরিবর্তন এসেছে গণপরিবহনে ভাড়ার তালিকায়। গণপরিবহনে নৈরাজ্য রোধে চালু হয় ই-টিকেটিং সার্ভিস। খুব শিগগিরই এ ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে। রাজধানীর কয়েকটি বাসে ই-টিকেট সুবিধা চালু হলেও অধিকাংশ বাসেই কার্যকর হয়নি। শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই উদ্যোগ অনেকের প্রশংসা কুড়োলেও তা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। এর মধ্যে আবার তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বাড়ানোর দাবিও ওঠে। বাড়ে জনদুর্ভোগ। গণপরিবহন কর্মীদের ধর্মঘটের মুখে অবশেষে সিটিং সার্ভিস নামক পদ্ধতি তুলে দেওয়া হয়। চালু হয় সেমি-লোকাল পদ্ধতি। সিদ্ধান্ত হয় প্রত্যেক গণপরিবহনে স্টুডেন্ট পাস চালু হবে এবং দূরত্বের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারিত হবে। দু-এক মাস এ পদ্ধতিতে গণপরিবহন চললেও ফিরে যায় পুরোনো ধাঁচে।

মেগাপ্রকল্পের বছর

২০২৩ সালে জনজীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে মেগাপ্রকল্প ও নানা প্রকল্পের উদ্বোধন। একে একে চালু হয় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেলের আগারগাঁও-মতিঝিল অংশ, খুলনা-মোংলা রেলপথ, দোহাজারি-কক্সবাজার রেলপথ, কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন। চালু হয় দেশের প্রথম ব্যাংক নেটওয়ার্ক সার্ভিস 'টাকা পে'। এসব প্রকল্পের উদ্বোধন গণপরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করে। প্রভাব পড়ে ইতিবাচক। ৭ অক্টোবর দেশের প্রথম ও বৃহত্তম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শাহজালালে ভবিষ্যতে যাত্রী বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নতুন রানওয়ে করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। তিনতলাবিশিষ্ট তৃতীয় টার্মিনালের আয়তন ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার। যাত্রীধারণ সক্ষমতা বছরে ১ কোটি ৬০ লাখ। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পে করিডোর নির্মাণ করা হবে। 

দেশের প্রথম দ্রুতগতির উড়ালপথ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন হয় ২ সেপ্টেম্বর। এর মধ্য দিয়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। পরদিন সকাল ছয়টা থেকে সাধারণ যানবাহন উড়ালসড়কে চলাচল করতে পারছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কাওলা থেকে রেললাইন ধরে তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর হয়ে যাত্রাবাড়ীর কাছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালীতে গিয়ে শেষ হবে এই উড়ালসড়ক। পুরো উড়ালসড়কে ৩১টি স্থান দিয়ে যানবাহন ওঠানামা (র্যা ম্প) করার ব্যবস্থা থাকছে। র্যা ম্পসহ উড়ালসড়কের দৈর্ঘ্য হবে ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। এর সুবাদে কাওলা থেকে তেজগাঁও অংশ পাড়ি দিতে লাগে ১২ মিনিট।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দের পাড়াতে ২৯ একর জমিতে নির্মিত হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুটের দৃষ্টিনন্দন ছয়তলা ভবনের আইকনিক রেলস্টেশন। যেখানে রয়েছে পাঁচ তারকা মানের হোটেল, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, শিশুযত্ন কেন্দ্র, পোস্ট অফিস, কনভেনশন সেন্টার, ইনফরমেশন বুথ, এটিএম বুথ, মসজিদ, লাগেজ রাখার লকারসহ অত্যাধুনিক সব সুবিধা। যা ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। আক্ষরিক অর্থে ঝিনুক না হলেও সমুদ্র দেখতে এসে প্রথম দর্শনেই সামুদ্রিক আবহ পাওয়া যাবে পুরো স্টেশনে। কেবল আসা-যাওয়ার জন্যই হয়নি এই স্টেশন, দৃষ্টিনন্দন করতে দেওয়া হয়েছে এর বহুমাত্রিক রূপও। নান্দনিক ডিজাইন আর নির্মাণ শৈলীর পাশাপাশি বহুমাত্রিক পরিধি নিয়ে গড়ে ওঠা এই স্টেশন তাই পরিণত হয়েছে দর্শনার্থীদের বিনোদনের নতুন গন্তব্য।

চলতি বছরের সব মেগাপ্রকল্পই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। মেট্রোরেলে যাত্রীদের ভিড়। মেট্রোরেলের দ্রুতগামিতা এবং প্রযুক্তিগত সুবিধার বিষয়েও মুগ্ধতা প্রকাশ করেছে যাত্রীরা। কর্ণফুলী টানেল, কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন চালুর পর ভ্রমণপিপাসুদের স্বাগত জানানোর চিত্র দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। 

মূল্যস্ফীতিতে পিষ্ট জনজীবন

বাজারে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, রান্নার গ্যাস, পেঁয়াজ, শাকসবজি থেকে শুরু করে এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নেই, যার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে না। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি জনজীবনকে সত্যিই অতিষ্ঠ করে তুলছে। বাজারে অগ্নিমূল্যে ভোক্তারা নির্বিকার, বিশেষভাবে নিম্নআয়ের মানুষ যা আয় করছে তার পুরোটাই জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদির জন্য ব্যয় করার মতো অর্থ তাদের হাতে আর থাকছে না।

চলতি বছরে নেতিবাচক ঘটনার মধ্যে প্রথমটি মূল্যস্ফীতি। বছরে মরিচের দাম আচমকা বেড়ে যাওয়ায় পড়ে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব। সেই প্রভাব মাংসের দামেও ছড়ালে অনেকেই অবাক হন। হোটেল-রেস্তোরাঁয় হু হু করে বাড়তে থাকে নানা খাদ্যদ্রব্যের দাম। আবার অনেক জায়গায় দেওয়া হয় না পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ। আস্তে আস্তে বাড়ে আলুর দাম। বেড়ে যায় নিত্যপণ্যের দাম। এক সময় মাংসের দাম কমে এলেও পেঁয়াজ রপ্তানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞায় নতুন করে দেশের বাজার অস্থিতিশীল করে তোলে। টিসিবির ট্রাকের সামনে দেখা যায় দীর্ঘ সারি। অনেকে সারাদিন লাইন ধরেও পেঁয়াজ সংগ্রহ করতে পারেননি।  

২০২৩ ছিল বর্ণিল। অসংখ্য ঘটনার সমাহার। ঘটেছে অনেক কিছুই। জনজীবনেও তা স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে ব্যাপকভাবে।

ইত্তেফাক/এসসি