মাঠের খেলায় যেমন তেমন, মাঠের বাইরে সরগরম

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৪, ১৮:৪০

ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে বিদায় নিয়েছে ২০২৩ সাল। ২০২৪ সালকে সাদরে বরণ করে নিয়েছে পুরো বিশ্ব। দেশের ফুটবলে ২০২৩ সাল ছিল বেশ ঘটনাবহুল। নারী ফুটবলের দলের সাফজয়ী কোচের পদত্যাগ, বাফুফে সাধারণ সম্পাদকের নিষেধাজ্ঞা, ফুটবলারদের মদকাণ্ড ও বিকেএসপির নিষেধাজ্ঞার ঘটনায় বেশ উত্তপ্ত ছিল দেশের ফুটবল। চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ২০২৩ সালে দেশের ফুটবলের হালচাল। 

ঘটনাবহুল নারী ফুটবল

২০২৩ সালের মার্চে মিয়ানমারে অলিম্পিক বাছাইয়ে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে পাঠায়নি ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। ফেডারেশনের আর্থিক অনটনের কারণে সাবিনাদের খেলতে না পাঠানোর ঘটনায় তীব্র সমালোচনা হয়। এই ঘটনায় দেশের দুই শীর্ষ ক্রীড়া সংস্থা বাফুফে ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) সভাপতির বাকযুদ্ধও ছিল কয়েক দিন।

২০২২ সালে সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। ২০২৩ সালে বেশিরভাগ সময়ই গিয়েছে আন্দোলন-সংগ্রামে। সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ফেডারেশনের দুই শীর্ষ কর্তা অর্ধকোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন। পুরস্কার, নিয়মিত বেতন-বকেয়াসহ নানা ইস্যুতে অনুশীলন বর্জন করেছিলেন সাবিনারা। 

এছাড়াও বেশ কিছু নারী ফুটবলার ছেড়ে যান বাফুফে ক্যাম্প। অভিমানে সাবিনাদের গুরু সাফজয়ী গোলাম রব্বানী ছোটনও দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। নানা নাটকের পর ফেডারেশন ছাড়েন ব্রিটিশ টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলিও। 

নিষিদ্ধ বাফুফের সাধারণ সম্পাদক সোহাগ 

গত বছরের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিন বড় ধাক্কা খায় দেশের ফুটবল। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগকে দুই বছরের জন্য সব ধরনের ফুটবল কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করে ফিফা। এছাড়া বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয় তাকে। ফিফার ওয়েবসাইটে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানার কথা জানানো হয়। 

এই শাস্তির কারণ আর্থিক জালিয়াতি। বৈশ্বিক ফুটবল সংস্থাটি জানায়, বাফুফেকে দেওয়া ফিফার টাকার হিসাবে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে শাস্তির বিষয়টি জানিয়ে আবু নাঈমকে চিঠি পাঠিয়েছে ফিফা। চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও এশিয়ান ফুটবল।

১৪ বছর সাফের সেমিফাইনালে বাংলাদেশ

সবশেষ পাঁচটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল বাংলাদেশ। এরমধ্যে চারবারই সেমির সমীকরণটা আটকে ছিল শেষ ম্যাচে। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে জিতেছিল বাংলাদেশ। এরপর ২০০৫ সালে ফাইনালে খেলেছিল তারা। আর ২০০৯ সালে সবশেষ সেমিফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ। এরপর বাকিটা কেবলই আক্ষেপের গল্প। 

২০২৩ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত হয় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সর্বোচ্চ এই আসরে ১৪ বছর পর সেই আক্ষেপে কিছুটা প্রলেপ দেয় জামালরা। সব সমীকরণকে পাশ কাঁটিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে কুয়েতের সঙ্গে দারুণ ফুটবল খেললেও ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

মার্টিনেজ-রোনালদিনহোর আগমন

২০২৩ সালে সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় আসেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। আর্জেন্টাইন এই গোলরক্ষক চলে যাওয়ার পর ঢাকায় পা রাখেন বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলের সাবেক কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদিনহো। 

তবে এই দুই ফুটবলারের ঢাকায় আসা আলোচনার চেয়ে সমালোচনায় বেশ হয়। বিশেষ করে মার্টিনেজের বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়ার সঙ্গে দেখা না করার ঘটনা বেশ সমালোচনার জন্ম দেয়।  

ল্যাতিন আমেরিকার লিগে জামাল ভুঁইয়া

আর্জেন্টাইন ক্লাবের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার চুক্তি নিয়ে রহস্যময় ও জলঘোলা পরিস্থিতির অবসান হয়। দেশটির তৃতীয় বিভাগের ক্লাব সোল দা মায়োর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেন এই ফুটবলার। বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই সোল দা মায়োর সঙ্গে জামালের আলোচনা চলে আসছে। তবে বিষয়টি নিয়ে এতদিন মুখ খোলেননি তিনি। এরই মাঝে আগামী মৌসুমেও জামাল তাদের হয়ে খেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানায় বাংলাদেশি ক্লাব শেখ রাসেল। 

পরবর্তীতে সর্বশেষ তিনি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে আর্জেন্টিনায় চুক্তি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানান। নতুন ক্লাবের সঙ্গে যাত্রা প্রসঙ্গে জামাল বলেন, ‘আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই ক্লাবকে সাহায্য করতে চাই। বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে আমার। সে অনুসারে দলে নতুন প্রাণশক্তি দিতে চাই। আমি চাই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সোল দা মায়োকে আরও এক ধাপ ওপরে নিয়ে যেতে।’

বসুন্ধরা কিংসের ইতিহাস

বাংলাদেশে পেশাদার ফুটবল লিগের যাত্রা এক যুগের বেশি সময়। এত দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো ক্লাব নিজস্ব ভেন্যু করতে পারেনি। তিন বছর আগে প্রিমিয়ার ফুটবলে আগমন হওয়া বসুন্ধরা কিংস এবার নিজস্ব স্টেডিয়ামে 'কিংস অ্যারেনায়' খেলেছে। ঘরোয়া ফুটবলে সেই অর্থে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ের সংস্কৃতি চালু নেই। বসুন্ধরা নতুন ক্লাব হলেও দেশের ফুটবলে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করছে।

১৪ বছর পর শিরোপা ঘরে তুলল মোহামেডান

দীর্ঘদিন শিরোপাহীন ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব মোহামেডান। দীর্ঘ ১৪ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ফেডারেশন কাপের শিরোপা জিতে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। সবশেষ ২০০৯ সালে আবাহনী লিমিটেডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সাদা-কালোরা। এবারও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সেই আবাহনীকে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তোলে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি। 

কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ স্টেডিয়ামে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হয় ৩-৩ গোলের সমতায়। অতিরিক্ত সময়ে মোহামেডান এগিয়ে যখন শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর তখনই আবাহনীকে উদ্ধার করেন রহমত মিয়া। এরপর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৪-২ গোলে আবাহনীকে হারিয়ে ফেডারেশন কাপের ১১তম শিরোপা ঘরে তোলে মোহামেডান। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে একাই সব আলো কেড়ে নেন মোহামেডানের মালির ফুটবলার সোলেমান দিয়াবাতে।

মদ কাণ্ডে তোলপাড় বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গন 

মালদ্বীপে খেলতে গিয়ে ৬৪ বোতল মদ নিয়ে এসেছিলেন বসুন্ধরা কিংসের ৫ ফুটবলার। যে অপরাধে তাদের সাময়িক নিষিদ্ধ করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। এরপর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) তরফেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয় অভিযুক্ত ওই পাঁচ ফুটবলারের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত পাঁচ ফুটবলার হচ্ছেন আনিসুর রহমান জিকো, তপু বর্মণ, মোরসালিন, সবুজ ও রিমন। দেশের তারকা ফুটবলাররা মদ আনার ঘটনাটি বেশ আলোচিত হয়। 

ফুটবলে নিষিদ্ধ বিকেএসপি

বাংলাদেশের একমাত্র ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ (বিকেএসপি)। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের আঁতুড়ঘর এই প্রতিষ্ঠানটি। অনেক বড় বড় তারকা ক্রীড়াবিদের জন্ম বিকেএসপি থেকে। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানকে জালিয়াতির অভিযোগে আগামী এক বছরের জন্য ফুটবলে নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ডিসিপ্লিনারি কমিটি। 

বাফুফে জানায়, এ বছর তৃতীয় বিভাগ ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল চকবাজার কিংস। সেই দলের কয়েকজন ফুটবলার দ্বিতীয় বিভাগে বিকেএসপির হয়ে খেলেছেন। আবার বিকেএসপির কয়েকজন শিক্ষার্থী চকবাজার কিংসের হয়ে তৃতীয় বিভাগে অন্য নামে খেলেন। দুই লিগে দুই পরিচয়ে খেলার বিষয়টি বাফুফের নজরে আসে। এরপর বাফুফে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দোষ খুঁজে পায়। ডিসিপ্লিনারি কমিটি এ বিষয়ে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিকেএসপির সিনিয়র ফুটবল কোচ শাহীনুল হক এবং প্রশিক্ষক রবিউল ইসলামকে ফুটবলসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে বাফুফে। পাশাপাশি দুজনকে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানাও করা হয়েছে। এছাড়া নাম পরিবর্তনকারী তিন খেলোয়াড় নিজ দলের পক্ষে পরবর্তী ছয় ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকবে। আর বিকেএসপিকে ঘরোয়া ফুটবলে এক বছর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/জেডএইচ