রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

চালচিত্র এখন

অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় সম্বৃত মৃণাল

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:১৫

There is always some madness in love. But there is also always some reason in madness.
—Friedrich Nietzsche

 

My city, mercilessly maligned and dangerously loved, in a way, is a state of my mind.
—Mrinal Sen

সাল ১৯৮১, মৃণাল সেন কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে একটি ছবি বানিয়ে মুক্তি দিলেন, নাম রাখলেন ‘চালচিত্র’, তাতে প্রথমবারের মতো অভিনয় করলেন অঞ্জন দত্ত। এমন এক চরিত্রে তিনি অভিনয় করলেন, যে চরিত্র সবকিছুর ভেতরেই একটি গল্প খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, কারণ পত্রিকা অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট, চাকরিটা তাঁর দরকার। গল্পটা হতে হবে বিক্রয়যোগ্য, লোকে যেন খায়। সত্তর দশকের সেই কলকাতার চালচিত্র দেখাতে গিয়ে মৃণাল সেন শহরের তালগোল পাকানো ট্রাফিক, শহুরে মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের খিটমিট, হাতের রেখায় উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ বিক্রি করা মানুষের দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতায় পুলিশের সঙ্গে আমজনতার সংঘাত ইত্যাদির ভেতর অপরের জন্য ভালোবাসা : যেমন সন্তানসম্ভবা প্রতিবেশীর জন্য ট্যাক্সি ডেকে দেওয়া, সম্মিলিত শক্তির উদ্বোধন : সকলে মিলে উঠোনটা পরিষ্কার করে দেওয়া ইত্যাদিও দেখিয়ে দেন।

কলকাতা মৃণালের জন্য ছিল এল ডোরাডো। না, ইতিহাসের পুরাণ থেকে তিনি সোনায় মোড়ানো এমাজোনিয়ার রাজাকে কলকাতার সঙ্গে তুল্য করে তোলেননি, বরং সুযোগ-সুবিধা ও প্রাচুর্যের হাতছানি এবং সকলকে খেয়েপরে বেঁচে থাকার প্রতুল ফিকিরের এক স্বপ্নস্থান হিসেবে দেখেছেন। ভাগ্যাহত মানুষের ন্যূনতম খেয়েপরে জীবনধারণের আস্থাদাতা হিসেবে দেখেছেন। যদিও মৃণাল কলকাতায় জন্মাননি, তিনি এই শহরে পা রেখেছিলেন ১৭ বছর বয়সে, সুদূর বাংলাদেশের ফরিদপুর থেকে এসে, তখন চল্লিশের দশক শুরু হয়েছে কেবল। তারপরও এই শহর তাঁর প্রিয় হয়ে ওঠে। অপ্রিয় হয়ে ওঠে। কলকাতার সঙ্গে মৃণালের সম্পর্ক যুগপত্ প্রেম ও ঘৃণার।

মৃণাল সেনকে একবার বব ডিলানের ‘লাভ সিক’ গানটি শুনিয়েছিলেন অঞ্জন দত্ত : I am sick of love/but I am in the thick with it. মৃণাল সেন আত্মজীবনীতে বলছেন, এমন এক সম্পর্কেই মৃণাল সেন বাঁধা পড়েছিলেন কলকাতার সঙ্গে, যেখান থেকে পালানো অসম্ভব, যার জন্য নিন্দা আর ভালোবাসা দুটোই বরাদ্দ থাকে প্রবলভাবে।

তালগোল পাকানো, অস্থির ও ঠগ-প্রতারকের শহর কলকাতা, কিন্তু বিপরীতে এই শহর আশাজাগানিয়া ও সৃজনশীলও বটে। মৃণাল সেন নিজের ভেতর এই বৈপরীত্যের কলকাতাকে ধারণ করেন, আবার কলকাতার শরীরের ভেতর নিজেকেও আবিষ্কার করেন। অঞ্জন দত্তকেও দেখা যায় কলকাতাকে কাছে টেনে নিচ্ছেন, আবার ঠেলে দিচ্ছেন দূরে। প্রতিটি শহরের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে, যে বৈশিষ্ট্যের কারণে শহর মানুষকে আকৃষ্ট করে। শহর আয়-উপার্জনের পথ খুলে দেয়। সুযোগ সৃষ্টি করে। জৌলুস চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এসবের দৌলতে ভাগ্যান্বেষীদের ভিড়ে শহর হয়ে পড়ে ক্লিষ্ট, ঘিঞ্জি গলিতে জমে আবর্জনার স্তূপ, ব্যক্তি মানুষ আবদ্ধ হতে থাকে বিচ্ছিন্নতার আবহে, কেউ কারো পরিচিত নয়। তারপরও, এই সকল ভালোমন্দ নিয়ে যে ব্যক্তি শহরে বেড়ে ওঠে, তার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে যায় শহর, শহরের জনস্রোত, জলকাদা, ধুলোবালি, যান্ত্রিক শব্দের সিম্ফনি, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং শহরের নানাবিধ স্থূল ও সূক্ষ্ম মাত্রা। মৃণাল সেনের মতো অঞ্জন দত্তও সেটা অনুধাবন করতে পারেন। প্রথম জীবনে অঞ্জন দত্ত মঞ্চ অভিনেতা, এরপর চলচ্চিত্রে অভিষেক, পরবর্তীকালে একজন সফল গায়ক ও নির্মাতা। শহর নিয়ে মৃণালের অনুভবকে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি গানে গানে কলকাতা বন্দনা করেন। আর সম্প্রতি কলকাতাকে নেপথ্যের নীরব নায়ক বানিয়ে তৈরি করেছেন ‘চালচিত্র এখন’। ছবির মূল নায়ক যদিও মৃণাল সেন।

২০২৩ সালে এসে মৃণাল সেনের জন্মশতবর্ষে, নৈবেদ্য হিসেবে অঞ্জন দত্ত হেঁটেছেন ১৯৮১ সালের স্মৃতির সরণিতে। প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা তিনি ফিরিয়ে আনেন নতুন তর্জমায়। না তিনি নিজে সেই দীপু চরিত্রটি করেননি। করলেন খোদ মৃণাল সেনের চরিত্র। ‘চালচিত্র এখন’ ছবিতে অঞ্জন দত্ত যেন সত্যিই মৃণাল সেনের রূপ নিয়ে ধরা দিলেন, ইনকারনেশন, আর বিয়াল্লিশ বছর আগের অঞ্জনের দীপু চরিত্রে দেখা গেল শাওন চক্রবর্তীকে। ‘চালচিত্র’ নির্মাণ প্রক্রিয়ায় অঞ্জনকে কীভাবে মৃণাল সেন চলচ্চিত্রের জন্য উপযোগী করে তুলেছিলেন, মোটা দাগে সেটার বয়ান মনে হলেও, আদতে ‘চালচিত্র এখন’ অনেকগুলো স্তর নিয়ে হাজির হয় দর্শকের সামনে।

প্রথমত, নগর : মৃণাল ও অঞ্জনের শহর কলকাতার প্রতি যে অভিন্ন প্রেম ও অপ্রেমের সম্পর্ক সেটা ফুটে ওঠে দৃশ্যমালা ও গানের কলিতে। কলকাতা শহর গোটা ছবিতেই থেকেছে একটি জমিন আকারে। তার উপরেই অঞ্জন বুনেছেন তাঁর নকশিকাঁথা। দ্বিতীয়ত, আত্মানুসন্ধান : মৃণাল সেন যেমন চাকরিবাকরি ছেড়ে, দৃঢ় সংকল্প নেন, তিনি ছবিই বানাবেন এবং এরপর পুরোপুরি নিয়োজিত করেন চলচ্চিত্র নির্মাণে; ঠিক তেমনি নবীন অঞ্জনও নিজেকে ভেঙেচুরে পরিণত করেন অন্য মানুষে। তাই গোটা ছবিতে একটি সংলাপ হয়ে যায় মোটিফ, বা সঞ্জীবনী মন্ত্র : ‘নিজেকে নিজে টেনে, হিঁচড়ে টেনে দাঁড় করানো, নিজেকে নিজে ওলটপালট করে ঝাঁকানো, তারপর গোটা পৃথিবীটাকে একটা তরতাজা দৃষ্টিতে দেখা।’ না, এটা অঞ্জনের লেখা সংলাপ নয়, পরিচালক অঞ্জন এটি নিয়েছেন জর্মন নাট্যকার পিটার বাইসের লেখা নাটক ‘মারাট/সাদ’ থেকে। সংলাপটি মারাটের মুখে ছিল। ‘চালচিত্র এখন’-এ দেখা যায় তরুণ অঞ্জন পিটারের নাটকটি মঞ্চস্থ করবেন, এবং তিনি মারাটের চরিত্রে অভিনয় করছেন। মারাটের চরিত্রে অনুশীলন করতে দেখেই মৃণাল সেন তাকে ছবিতে নেয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তৃতীয়ত, অরৈখিক বয়ান : শহর কলকাতা যেরকম বিশৃঙ্খলার ভেতরেও শৃঙ্খলাকে আগলে রাখে, চলচ্চৈত্রিক ভাষা দিয়ে অঞ্জন দত্ত সেই বয়ানরীতিকেই হাজির করতে চেয়েছেন বড় পর্দায়। সেজন্য ছবিতে তিনি ফ্রিজ শট, স্লো মোশন, স্থিরচিত্র, কালো স্ক্রিন, জাম্প কাট—সব ব্যবহার করেছেন। গল্পটাকে তিনি শহরের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে বলতে চেয়েছেন। আপাত বিশৃঙ্খল মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত একটা গল্প ঠিকঠিকই শুনিয়ে ফেলেন অঞ্জন দত্ত। চতুর্থত, ভাবাদর্শ : ছবিতে বেশ সূচারুভাবে রাজনৈতিক আদর্শের বাহাস বিস্তার করেন নির্মাতা অঞ্জন। ব্যক্তি বনাম সমষ্টির ব্যঞ্জনাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন তিনি। সেখানে আরো থাকে পুঁজিবাদ বনাম সাম্যবাদ, থাকে বাণিজ্য বনাম শিল্প। মৃণাল সেনের মানসিক গড়নটা ছিল বামঘেঁষা। আর তরুণ অঞ্জনের তা নয়। যদিও দেখা যায় তিনি পিটারের লেখা নাটকে অভিনয় করছেন। পিটার ছিলেন কমিউনিস্ট। আর মারাট যে চরিত্রটি, সেই জঁ পল মারাট ছিলেন ফরাসি রাজনীতিবিদ, তাত্ত্বিক এবং তিনি ফরাসি বিপ্লবের কালে ঘনিষ্ঠ ছিলেন চরমপন্থি জ্যাকোবিন দলের। ‘চালচিত্র এখন’-এ মারাট চরিত্রের অবতারণা করে হয়তো সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি কিছুটা ইতিবাচক মনোভঙ্গির ইঙ্গিত রেখে যেতে চেয়েছেন অঞ্জন। এই স্তরগুলোর ফাঁকে ফাঁকে অঞ্জন দত্ত আমাদের জানিয়ে দেন মৃণাল সেন ও গীতা সেনের জীবন সংগ্রামের কথা। মীনার্ভা থেকে শিয়ালদা পর্যন্ত গীতাকে নিয়ে যাওয়ার পয়সা ছিল না মৃণালের কাছে, তাই জোয়ান অব আর্কের গল্প বলতে বলতে গীতার পথের ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দিয়েছিলেন মৃণাল। আমরা দেখি অঞ্জনের প্রতি মৃণালের ভালোবাসার স্বাক্ষর : পাসোলিনির লেখা ‘ইদিপাস রেক্সে’র চিত্রনাট্যটি ধরার সঙ্গে সঙ্গে অঞ্জনকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন মৃণাল। দেখি অঞ্জন দত্তের প্রতি গীতা সেনের মাতৃস্নেহ : শ্যুটিং স্পটে ঘুমিয়ে পড়া ক্লান্ত অঞ্জনের গায়ে চাদর টেনে দিচ্ছেন গীতা। আরো দেখি অভিনয় ও কলকাতার প্রতি প্রেম : থিয়েটার নিয়ে কাজ করার আহ্বান আসে বার্লিন থেকে, তখন অঞ্জন বুঝতে পারেন এই কলকাতাতেই রয়েছে অভিনয়ের অপার সম্ভাবনা—যা তিনি করতে চাইছিলেন।

এসব ছাড়াও আমরা দেখি, শ্যুটিং ইউনিটের সঙ্গে মৃণাল সেনের আত্মার বন্ধন। এমনকি মৃণাল সেন যে ফরাসি মূর্তিভঙ্গকারী জঁ-লুক গদারের দ্বারা প্রভাবিত সেটাও উল্লেখ করতে ভোলেন না অঞ্জন দত্ত। এই যে শ্রদ্ধা নিবেদনের ফাঁকে এতগুলো বিষয় অঞ্জন দত্ত বুনে দিয়েছেন, এটা যেন শহরের ব্যস্ত রাস্তায় ট্রাম, বাস, গাড়ির ফাঁকে রিকশা আর সাইকেলের এক অদ্ভুত একমুখী চলন। কোথাও কোনো ঝামেলা নেই, যে যার যার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অঞ্জন দত্তও এগিয়ে গেছেন। শ্রদ্ধা নিবেদনই তার লক্ষ্য। একবারের জন্যও মনে হয়নি কোনো ঘটনা বাহুল্য, বা জোর করে চিত্রনাট্যে আনা হয়েছে। দক্ষ জাগলারের মতোই নির্মাতা প্রতিটি স্তর ও উপাদান নিয়ে খেলেছেন, নিয়ন্ত্রণ করেছেন, আর দর্শককে মুগ্ধ করেছেন। এই ছবিতে চলচ্চিত্রের ভাষাকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন অঞ্জন দত্ত, তা এককথায় বলব : অপূর্ব। নির্মাতা ও অভিনেতা অঞ্জন দত্ত এভাবে আগে কোনোদিন নিজেকে মেলে ধরেননি বড় পর্দায়। এই চলচ্চিত্র মৃণাল সেনের মতোই অমরত্ব লাভ করবে বলে আমার ধারণা।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন