রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ইসলামের দৃষ্টিতে ভোটের গুরুত্ব

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৯:০৬

ভোট গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ‘ভোট বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, অত্যাচারী, পাপাচারী ও বেঠিক লোককে ভোট দিলে পাপের কারণ হয়ে থাকে; ঠিক তেমনি একজন সত্ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়াতে সওয়াবও রয়েছে। শুধু তাই নয়, বরং তা একটি শরিয়ত নির্দেশিত যৌথ বা সামষ্টিক ফরজও বটে’ (মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) : জাওয়াহিরুল ফিকহ :খ-২, পৃ-২৯৩, মাকতাবা দারুল উলুম, করাচি)।

পবিত্র কুরআন যেভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকে হারাম করেছে, একইভাবে সত্য সাক্ষ্য দেওয়াকে জরুরি ও আবশ্যকীয় বলে নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহ ইরশাদ করেন : ‘তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্য দান করো।’ (নিসা :১৩৫) ‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে।’ (মায়িদা :৮) আয়াতে মুসলমানদের প্রতি সত্য সাক্ষ্যদানকে ফরজ করে দেওয়া হয়েছে, যেন কেউ তা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা না করে। আল্লহর সন্তুষ্টির জন্য, তার নির্দেশ মনে করে সত্য সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে সব সময়।

সুরা তালাকে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দেবে।’ (তালাক :০২)। এই আয়াতে সাক্ষ্যদানের ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বলা হয়েছে, যা কিনা যৌথভাবে হয়ে থাকে। আরেকটি আয়াতে ইরশাদ হয়েছে : ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করবে না; আর যে তেমনটি করবে তার অন্তর পাপরাশিতে বিষাক্ত হয়ে পড়বে।’ (বাকারা : আয়াত নং-২৮৩)।

অর্থাৎ সত্য সাক্ষ্য না দিয়ে তা গোপন করা হারাম ও পাপ। সব আয়াতে সত্য সাক্ষ্য দেওয়াকে মুসলমানের প্রতি ফরজ বলে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনোভাবেই মুসলমানেরা সত্য সাক্ষ্য দিতে পিছপা হবেন না। এ জন্য প্রতিটি অঞ্চলে-কেন্দ্রে-আসনে যাকে অপরাপর প্রার্থীর তুলনায় নেককার বা সৎ মনে হয়, তাকে ভোট দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। এমনকি কোনো আসনে যদি কোনো একজন প্রার্থীও সঠিক অর্থে পুরো সৎ ও আমানতদার না পাওয়া যায়; তবে যে কজন প্রার্থী রয়েছেন, তাদের মধ্যে দিন-ধর্ম, সততা-যোগ্যতায় এবং আল্লাহভীতিতে যিনি কিছুটা অগ্রগামী অর্থাৎ, যিনি অপকর্ম কম করবেন, তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা বৈধ এবং উত্তমও বটে। যেমন—মন্দ কমাতে সচেষ্ট হওয়া এবং জুলুম-নির্যাতন কমাতে চেষ্টা করা, শরিয়তেরই আরেকটি আইনি নীতিমালা হিসেবে প্রমাণিত, এমনটাই ফকিহ ইমাম ও ইসলামি আইন গবেষকদের ব্যাখ্যা।

এই আলোচনার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, নির্বাচনগুলোয় ভোট প্রদানের বিষয়টি শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যূনতম সাক্ষ্য প্রদান কর্মের অন্তর্ভুক্ত, যা গোপন করা হারাম এবং তাতে মিথ্যার আশ্রয় নেয়াও হারাম। আপনি যাকে ভোট দিচ্ছেন, শরিয়তের মাপকাঠিতে তার অর্থ হচ্ছে- আপনি এই মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন যে, এই ব্যক্তি নিজের বোধ-বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা জ্ঞান-অভিজ্ঞতা এবং সততা ও আমানতদারির প্রশ্নে এই দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত এবং অন্য সব প্রার্থীদের চেয়ে উত্তম।

মোদ্দাকথা হলো : (১) আপনার ভোট ও সাক্ষ্যদানে যে জনপ্রতিনিধি সংসদ বা আইনসভায় পৌঁছাবেন, তিনি যত রকম ভালো-মন্দ পদক্ষেপ নেবেন, তার দায়দায়িত্ব ও জবাবদিহি আপনার-আমার ওপরও বর্তাবে। আমরাও তার সঙ্গে একই পাপ-পুণ্যের অংশীদার হব। (২) ব্যক্তিগত পর্যায়ে বা কারও একার কর্মকাণ্ডে কোনো ভুল হয়ে গেলে তার ভালো-মন্দ প্রভাব ব্যক্তি ও সীমিত পর্যায়ে পড়ে থাকে; পাপ-পুণ্যও সীমিত হয়ে থাকে। অন্যদিকে ভোটের মাধ্যমে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পুরো জাতি তাতে প্রভাবান্বিত হয়ে থাকে। তাই তার সওয়াব বা শাস্তিও অনেক বেশি ও বড়। (৩) টাকা-পয়সার বিনিময়ে ভোট প্রদান সর্বনিকৃষ্ট পর্যায়ের 'ঘুষ গ্রহণ' হিসেবে গণ্য এবং কয়েকটি টাকার খাতিরে ইসলামবিরুদ্ধ ও রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। অন্যদের জাগতিক জীবন জৌলুসপূর্ণ করতে গিয়ে নিজের দিন-ধর্ম কোরবানি করা, চাই তা যত বেশি মাল-সম্পদের বিনিময়েই হোক না কেন; কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। মহানবি (স.) ইরশাদ করেছেন : ‘ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, যে অপরের দুনিয়া অর্জনের স্বার্থে নিজের ধর্ম বিকিয়ে দিল।’ (প্রাগুক্ত : পৃ-২৯৫)।

লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইত্তেফাক/এসকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন