রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

সহজাত লোক-আনন্দের পসরা

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:৫৫

উজানের সঙ্গে ভাটিকে ঠিক মেলানো যায় না। ভাটির মানুষজনের চালচলন, কথাবার্তা, আয়োজন, উত্সব, ঠাটবাট ইত্যাদি কিছুই উত্তরের সঙ্গে খাপ খায় না। বলতে গেলে নোনা অঞ্চলে বসবাসরত জনমানুষের বিশ্বাস, আচারনিষ্ঠা এমনকি লোকঐতিহ্যও একটু আলাদাই বটে। গাজী কালু চম্পাবতী, বন বিবি আর মনসাদেবীদের মতো বহুবিধ কিংবদন্তিতুল্য উপাখ্যানে ভরে আছে বনবর্তী দক্ষিণাঞ্চল। লোক-উত্সবগুলোতেও আলাদা মাত্রা পাওয়া যায় এখানে। কলারোয়ার ভাদুলিয়া, কেরাগাছির যেমন।

ভেবেছিলাম হরিণখোলাতে গিয়ে দম নেব। পাটকেলঘাটা পার হতে গিয়ে আটকে গেলাম। বেতনা বাঁকতে বাঁকতে ব্রিজতলায় এসে মোচড় দিয়েছে। তারপর ধনুকের ছিলা হয়ে দক্ষিণে চলে গেছে। চন্দ্রকার তীর ধরে শ্যামলা উপত্যকা উঠে গিয়ে গাছগাছালির তলে তলে বাস্তুভিটা। ভাটার শেষ কলি চলছে বলে কলকলিয়ে পানি নেমে যাচ্ছে এখন। আর তিরতিরে হয়ে যাচ্ছে নদীটা। কাদায় গাঁথা নৌকোগুলো নিশ্চয়ই গতরাতে আটকা পড়েছে। এমন নরম দৃশ্য একদাগে দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার! মিনিট দশেক পরেই অবশ্য থম ধরবে। তারপর উলটো দমকে ক্রমেই দৃশ্যগুলো পালটে যাবে। হয়তো মাইল পাঁচেক দক্ষিণে জোয়ারের মুখ আছে। পানি ফুলতে ফুলতে দু-তিন তলা হয়ে গেলে ছিটিয়ে থাকা নৌকোগুলো ভেসে উঠবে। ঘণ্টা দুয়েক অপেক্ষা করতে হবে। দৃশ্যের মায়া থেকে চোখ সরিয়ে নিতে হলো।

আপাতত হরিণখোলাকে মনে রেখে স্পিড বাড়িয়ে দিলাম। ডুমুরিয়ার আঠারো মাইল ছুঁয়ে তালা। তারপর পাথার ফাঁড়ি দিয়ে মেঠোপথ। কেউটে পথটা ডালে ডালে ভাগ হয়ে গেলে পথিকেরা আমাকে পথ দেখায়। হাসিমুখে আলাপ তুলতে চায়—‘ভাইজান, কো থেকি এয়িলেন।’

ঘরে ঘরে দুধেল গাই আর কোমলা বাছুর। এমন সুখমুখো জনপদে আমুদে লোকের অভাব হয় না। একটা পুরোদস্তুর লাঠিয়াল দলের খোঁজ পেয়ে গেলাম। পথের কোমরেই আসিরুলের বাড়ি। পাল্লা আছে তাই খেলোয়াড়রা আগাম জমা হচ্ছে আসিরুলের বাড়িতে। আসিরুলরা সহজমানুষ। ভদ্রলোকদের মতো তাঁরা মুখ মনের আড়াল রাখেন না। ‘ভাই আপনের সাথে একটু কথা বলতে চাই, শুনলাম আপনি লাঠিয়াল’—ব্যাস, এটুকু বলাতেই কপালের ভাঁজ নেমে গেল। বারান্দায় মাদুর পাতলেন। স্ত্রী নাজমা অন্দর থেকে দাওয়ায় বসলেন। পরিবেশটা সাদাসিধে হয়ে গেল। দলের লোকজন কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভূমিকা লাগল না। আপনিতেই গল্পের নদী বয়ে চলল। লাঠিয়াল হিসেবে সেও তো প্রায় পনেরো বছর। ‘জিয়ালা জোয়ান লাঠিয়াল’ দলে আসিরুলকে নিয়ে এখন ১২ জন। জার্সি টুপি ঘুঙুর থেকে শুরু করে যা যা লাগে সব আছে।

জার্সির কথা উঠতেই আসিরুল জটলা ফেলে ঘরের ভিতর চলে গেলেন। তারপর নতুন প্যান্ট জার্সি গায়ে সামনে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘ন্যান ছবি তোলেন’। যোগ্যতায় যেতে গিয়ে তাঁকে কম লাঠিপেটা হতে হয়নি। কনুই উঁচু করার পর টের পেলাম বহু লাঠির আঘাত খেয়ে তবে লাঠিয়াল হওয়া যায়। আঙুলের জয়েন্টগুলো পর্যন্ত কটকটা আর শক্ত হয়ে গেছে। বললাম, ‘এত ঝুঁকির পরও খেলেন ক্যানো?’

অসিরুল হেসে ফেললেন, ‘দ্যাকেন, এ নিয়ে ভাবলি লাঠিয়ালের মান থাকে না। এতি আমুদের জন্যি খেলি, এতি তো হিম্মতের খেলা।’

কেমন আনন্দ উত্সব হয়? ব্যাখ্যায় নামার আগে বৃদ্ধ খলিলুর রহমান চশমা খুলে হাতে রাখলেন। তারপর শ্লেষ্মাভেজা গলাটা খাঁকারি দিয়ে গলা ছাড়লেন, ‘শোনেন, লাটি খেলা তো এমমি এমমি হবিনানে, সাতে ঢোল কাশি ইয়াতি বাজানি লাগে। ই খেলার আল্দা একটা বাজেন আছে। বাজেন শুনলি মানুষি এমমি বুঝতি পারে যে, লাটিখেলার বাজেন বাইজতেছি।’

যেসব শরমেন্দা মেয়ে এতক্ষণ অন্যদিকে চাওনির ভান করে কথা শুনছিল তারাও এখন কাছে এসে কথার মানে ধরছে। বর্ণনায় যা পেলাম তা হলো—তাকত দেখানোর পাশাপাশি দর্শকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে তাঁরা বিপজ্জনক খেলা করেন। ধারালো দায়ের মাথায় ত্যানা পেঁচিয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরানো হয়। তারপর জ্বলন্ত তিনখান দা শূন্যে ছুড়ে দিয়ে হাতবদল করে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ধরতে হয়। বিরাট হাততালি পড়ে যায়। উনিশ-বিশ হলেই ক্ষতবিক্ষত হতে হবে। কিন্তু মামুলি কাটাকুটি বাহাদুরির চেয়ে বড় নয়। এমনি এমনি লাঠি চালালে হবে না। ঢোলের তালে তালে পায়ের গোড়ালি তুলতে হবে আর শরীর দুলিয়ে আক্রমণ করতে হবে প্রতিপক্ষকে। পা তুললেই বেজে উঠবে দুশো ঘুঙুরের বিছা। থামলে চলবে না। বিপক্ষ দল তো কমে ছাড়বে না। তারাও ক্যারিশমা দেখাবে। হেরে গেলে মানসম্মানের ব্যাপার। সেজন্যই নতুন করে প্রাকটিস চলছে। আলাদা করে তেমন অনুরোধ করতে হলো না। দ্রুত জার্সি পরে নিল তারা। সব হাফপ্যান্ট খুঁজে পাওয়া গেল না। অগত্যা কেউ লুঙিতে গিঁট মেরেই চাতালে নেমে গেল। দিদার বখত বনাম আসিরুল। তেল মাখা লাঠি হাতে মুখোমুখি ঘুরতে ঘুরতেই দিদার বখত মুখে চিত্কার তুললেন। কটাকট কোপে পাড়াসুদ্ধ খবর হয়ে গেল। দেখার মতো খেলাই বটে। প্যাটার্ন চেঞ্জ হয়ে গেল। এবার মাথার উপর লাঠি ঘুরছে। আর ডানে বাঁয়ে কোপ পড়ছে। দিদার বখত অবশ্য বেশিক্ষণ খেলতে পারলেন না। হাঁফ ধরে গেল। মোসলেম দেরি করলেন না। তড়াক করে লাঠি হাতে নেমে পড়লেন। ভিড়ের মধ্যেই থালায় গুড়মুড়ি নিয়ে নাজমা এগিয়ে এলেন—ন্যান, এটটু চাবান। পালটা কথা খুঁজে পেলাম না। দমাদম লাঠির কোপ পড়ছে। হই-চিত্কারের ভিতর হারিয়ে গেল নাজমার মুখ।

সীমানা বয়ে চলা নদীতে এখানে ঈদের দিন নৌকাবাইচ হয়। ইছামতি জুড়ে বর্ণিল নৌকাবাইচের দৃশ্যাদি উপভোগ করতে দু দেশের কয়েক থানার মানুষ একযোগে ভেঙে পড়ে। বাইচের নৌকায় বৈঠা চালাতে তাগড়া গোছের নয় জোড়া করে বাইচাল (মাঝি) এবং একজন করে হালদার থাকে। হইহই রইরই বাজ-বাজনার মধ্যে হালদারকে ক্ষিপ্র গতির নৌকার দিক ঠিক রাখতে হয়। ছিপছিপে লম্বা নৌকোর গলুইতে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে এই কাজটি একাই করতে হয় তাঁকে। হালদার বিচলিত হলে কাজ হবে না। সে কারণে দলের সদস্যরা বেছে বেছে মনমর্জির দিক থেকে যে বেশি ধী-সম্পন্ন তাঁকেই হালদার নিযুক্ত করে। প্রতিটি নৌকায় গানবাজনার ব্যবস্থা থাকে বটে। দোতারা সারিন্দা দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু লোকগান চললেও মূল বাইচের সময় সারিন্দাওয়ালের নামিয়ে রাখা হয়। নৌকার এত বেগ হয় যে বাতাসে গান শোনার মতো পরিবেশ থাকে না। তখন কেবল নৌকার আগায় তিনকোণা খাঁজের মধ্যে একটা একমুখী ঢোল বাঁধা থাকে। নৌকা চলার সময় তালদার কিসিমের একজন দুহাত দিয়ে ছন্দময় তালে ঢোল বাজিয়ে যায়। অনেকটা লেফট রাইটের মতো। তাল এবং শরীরের দোল খাওয়ার ঝাঁকিভাব এমন হয় যে বাইচালদের মনে জেতার জন্য একটা জেদ তৈরি করে দেয়। নিজেদের গ্রামের মান রাখতে ঢোলের বাজন খুব কাজে দেয়। আসলে ঢোলের বেদম দমাদম শব্দ বাইচালদের মনে একটা বিপ্লবী মনোভাব এনে দেয়। তখন গায়ের যত জোর আছে তাই দিয়ে বৈঠা চালাতে থাকে তারা। থইথই ইছামতির দু’পাড়ে আনন্দের ঢল পড়ে যায়। ঈদানন্দের সঙ্গে লোকানন্দ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

কেরাগাছির মুরুব্বিরাই জানালেন যে, আগের মতো অত বড় আয়োজন এখন আর হচ্ছে না। স্মৃতি হাতড়ে এক বৃদ্ধ চোখ ছানাবড়া করলেন—‘সেসব দিনের কতা কী কবো, উ আল্দা ব্যাপার ছিল। সিগেল একেকটা নৌকোই ছিল, বিরাট বড়। মানুষের জাগা দেওয়া যাইতো না। ভারতের নৌকা আসতো ম্যালা।’

ক্রমেই যেন কমে আসছে জৌলুস। তবে কি সহজাত লোক-আনন্দ থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি? নাকি কেউ সন্তর্পণে সরিয়ে দিচ্ছে আমাদের। শেষে কি যন্ত্র এবং পরাধীনতার কাছেই সমর্পিত হব আমরা! বঙ্গের সমৃদ্ধ ভান্ডারে আমরা কি খুঁজব না আমাদের বিবিধ রতন?

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন