রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

গল্প

প্রতিবিম্ব

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:০৫

বিনীত স্বভাবের হাস্যরসিক আবদুর রশীদ হাওলাদারকে সবাই চেনে। কিন্তু সেটা অন্য নামে—একজন বড় ঘুষখোর হিসাবে। তাঁর ঘুষ খাওয়ার পদ্ধতি অন্য ধরনের। তিনি সেবাগ্রহীতাদের জন্য এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন যাতে তারা বাধ্য হয় তাঁকে ঘুষ দিতে। অনেক সময় সেবাগ্রহীতারা তাঁকে ঘুষ দিতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে করে।

আবদুর রশীদ হাওলাদার মুচকি মুচকি হাসেন আর আপন মনে বলেন, আমি ঘুষ খেলেও কেউ আমাকে ঘুষখোর বলতে পারবে না। আমি মানুষের উপকার করি বলেই তার বিনিময়ে তারা আমাকে বখশিশের মতো কিছু দেয়। তবে এটাকে বখশিশ বলা যাবে না। বখশিশ নেয় ছোটলোকে। আপন মনে বলেন, বড়লোকে ঘুষ খায়, ছোটলোকে বখশিশ নেয়। আমি এ দুটোর কোনোটা নই।

কোনো সেবাগ্রহীতা তার কাছে কাজের জন্য এলে তিনি মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলেন। অনেক সময় তার দুঃখে নিজেও দুঃখপ্রকাশ করে তার আস্থাভাজন হন। খুব শিগগিরই ঐ ব্যক্তির কাজ হয়ে যাবে বলে তাকে আশ্বাস দেন। কিন্তু ঐ ব্যক্তির কাজ সহজে হাসিল হয় না। তাকে কখনো বড় সাহেবের অনুপস্থিতির কথা বলেন, কখনো নিজে বিপত্নিক হওয়া সত্ত্বেও কল্পিত স্ত্রীর অসুস্থতার কারণ বলে তাঁর ব্যস্ততার কথা বলেন। অভিজ্ঞতার আলোকে সেবাগ্রহীতারা তাঁর এ চালাকির কথা বুঝে ফেলেছে। তাই দ্রুত সেবা পাওয়ার জন্য অর্থ দাবি করার আগেই তাঁকে তারা উেকাচ বা ঘুষ দিয়ে থাকে। এজন্য হাওলাদারের কিছু দুর্নাম থাকলেও সুনামও আছে। কেননা, অনেক ঘুষখোর ঘুষ খেয়েও সেবাগ্রহীতার কাজ করে দেয় না। অনেক সময় তারা তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করে থাকে। হাওলাদার সে চরিত্রের লোক নন।

আবদুর রশীদ হাওলাদার যেমন আয় করেন, তেমনি ব্যয়ও করে থাকেন। অফিসের সকল সহকর্মীকে তিনি চা-নাস্তা খাওয়ান। হাওলাদার বলেন, টাকা-পয়সা হলো কচু পাতার ওপর পানি থাকার মতো, এই আছে তো এই নেই। আর তাছাড়া টাকা-পয়সা জমাব কার জন্যে? আমার স্ত্রী নেই, ছেলেপুলে নেই। এই বলে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন। অদূরে বসেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ রহিমা খাতুন। তিনি বলেন, আপনি বললে আমরা মেয়ে দেখতে পারি। যে বয়সের মেয়ে চান সে বয়সের বউ পাবেন।

হাওলাদার মৃদু হেসে বলেন, এদেশে মেয়েরা যে এত সস্তা তা জানা ছিল না।

হাওলাদার বিয়ে করতে রাজি না হলেও মেয়েদের তিনি খুব ভালোবাসেন, তাদের পছন্দ করেন। কোনো সেবাগ্রহীতা নারী হলে তিনি তার কাছ থেকে ঘুষ বা বখশিশ নেন না। বিনিময়ে তিনি তার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোশগল্প করতে থাকেন। হাওলাদার বিশ্বাস করেন, নিজেকে সংযত রাখতে পারলে তিনি বেহেশতে সুন্দরী নারী পাবেন।

ইদানীং আবদুর রশীদ হাওলাদার ক্ষণিক নারীসঙ্গ লাভের জন্য হস্তবিশারদ সেজেছেন। তিনি নারীর নরম কোমল হাত অনেকক্ষণ নিজের হাতের মধ্যে ধরে রেখে স্পর্শানুভূতি পেতে পেতে তাদের ভাগ্য গণনা করেন। যেসব কথা শুনলে মেয়েরা বেশি খুশি হয় তা তাদের শোনান। অনেক সহকর্মী হাসতে হাসতে বলে, মেয়েদের নরম হাত টিপেই যদি বিয়ের সুখ পাওয়া যায় তাহলে আর বিয়ে করার দরকার কী?

ফজলে আজিম বলে, বিয়ে করতে হলে পুরুষ মানুষের হিম্মত লাগে। এ হিম্মত হাওলাদারের নেই।

হাওলাদার সহকর্মীদের কথায় বিরক্ত হন, কিন্তু কোনো মন্তব্য করেন না। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে মেয়েদের একটি কলেজ পড়ে। নাম ‘শ্রীপুর আদর্শ নারী বিদ্যা নিকেতন’। একই সময়ে কলেজেরও ছুটি হয়। দলবদ্ধ হয়ে মেয়েরা কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়। হাওলাদার ঐ পথেই যাতায়াত করেন। তিনি নিত্যদিন অদূরে দাঁড়িয়ে মেয়েদের অবলোকন করেন আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

কলেজের আশেপাশে তরুণ বয়সের ছেলেদের সমাগম ঘটে। মাঝেমধ্যে মেয়েদের উদ্দেশ্যে শিস দেয়, সিগারেট খেতে খেতে তারা নানান ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। হাওলাদার তা করেন না। ছেলের দল তাকে ‘মেয়েপাগলা বুড়ো’ বলে। তাদের কথা তিনি না শোনার ভান করেন, আর আপন মনে বলেন, ‘একদিন তোদের মতো আমারও বয়স ছিল। কিন্তু আমি তোদের মতো অসভ্য এবং বেয়াদপ ছিলাম না। মা-বাপ তোদের আদব-কায়দা শেখায়নি। মায়ের জাত মেয়েদের নিয়ে আমি কখনো কুরুচিপূর্ণ কথা বলতাম না। নারী জাতিকে শ্রদ্ধা না করলে কখনো সভ্য হওয়া যায় না।’

অন্যান্য অনেকের মতো আবদুর রশীদ হাওলাদারেরও বয়স হয়েছে অবসরের। তার বিদায় উপলক্ষ্যে সহকর্মীরা অফিসে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারা তাঁর চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করে ভাষণ দেয়। তিনি চোখের পানিতে বিদায়-ভাষণ দেন। অল্পবয়সি সহকর্মী নমিতা রায় রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে, ‘তুমি খুশি থাকো আমার পানে চেয়ে চেয়ে’। গান শেষ হবার আগেই এই শোকাবহ পরিবেশে সবাই উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। সহকর্মীদের অকস্মাত্ এই হাসির কারণ হাওলাদার বুঝতে পারেন না।

আবদুর রশীদ হাওলাদারের বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে একটি মাংসের দোকান আছে। কসাই মাংস কেটে কেটে তা ঝুলিয়ে রাখে। একটি কুকুর প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাংস দেখে আর লেজ নাড়ে। কসাই কুকুরটিকে মাংসের টুকরা না দিলেও অপ্রয়োজনীয় মাংসের ছিটেফোঁটা কুকুরটির ভাগ্যে জোটে। কুকুর তাতেই সন্তুষ্ট। মনের আনন্দে কুকুর সেসব টুকরা কুড়িয়ে নিয়ে লেজ নেড়ে পরমানন্দে খায়।

কুকুরের মাংসলোলুপতার দৃশ্য সবসময় হাওলাদারের চোখে পড়ে। মনে মনে ভাবেন, তিনি কসাই হলে কখনো কুকুরের প্রতি এমন নির্দয় আচরণ করতে পারতেন না। তিনি ছোটবেলায় পড়েছেন, ‘জীবে দয়া করে যে জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর’।

অফিসে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরতে মাংসের দোকানের সামনে সেই পুরাতন দৃশ্য আজও হাওলাদারের চোখে পড়ে। কুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মুখ থেকে বের হয়ে আসে, ‘তুমি খুশি থাকো, মাংসের পানে চেয়ে চেয়ে’। তারপর হঠাত্ তার মনে হলো, কুকুরটির চেহারা পালটে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে তা পরিবর্তিত হয়ে মানুষের রূপ ধারণ করছে। সে চেহারা অন্য কারো নয়, অবিকল আবদুর রশীদ হাওলাদারের চেহারা। এ দৃশ্য হাওলাদারের সহ্য হলো না। তিনি কুকুরটির পিঠে সজোরে এক লাথি মারেন।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন