বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমানোর লক্ষ্য নতুন মুদ্রানীতির

নীতি সুদহার বেড়ে হলো ৮ শতাংশ

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৪:০০

আবারও নীতি সুদহার বাড়িয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়ে আট শতাংশ করা হয়েছে। মূলত মূল্যস্ফীতির হার ছয় শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য ‘সতর্ক ও সঙ্কুলানমুখী’ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলনকক্ষে এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান। এরপর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

ঘোষিত মুদ্রানীতিতে ২০২৪ সালের জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ; যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল ১১ শতাংশ । একই সময়ের জন্য সরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭.৮ শতাংশ। গত ডিসেম্বর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.২ শতাংশ; সরকারি খাতে ছিল ১৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নীতি সুদহার বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদহার বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণত ঋণের চাহিদা কমে যায়। এর মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কমে গেলে মূল্যস্ফীতির সূচক কমতে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। সে কাজের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে নীতি সুদহার বাড়ানো বা কমানো।

বিনিময় হার নির্ধারণে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি :নতুন মুদ্রানীতিতে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। তবে এ পদ্ধতিতে ডলারের বিনিময় হার কত হবে, তা বলা হয়নি। পরে তা জানানো হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়। গভর্নর বলেন, এক অর্থবছরেই ১৮ বিলিয়ন ডলার কমেছে অবকাঠামো উন্নয়নে। এক বছরে এতটা ব্যয়ের জন্যই রিজার্ভ-সংকট সৃষ্টি হয়েছে। গত তিন বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ২৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। তবে সে অনুযায়ী ডলার আসছে না। ব্যাংকগুলো প্রয়োজনে ডলার কেনার কারণে নগদ সংকটে পড়েছে। এটাও সমাধান হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য, অর্থনীতির ভাষায় ‘ক্রলিং পেগ’ হলো নিজের দেশের মুদ্রার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সমন্বয়ের একটি পদ্ধতি; যেখানে একটি নির্দিষ্ট বিনিময় হারসহ একটি মুদ্রাকে একটি সীমার মধ্যে ওঠানামা করার অনুমতি দেওয়া হয়। এখানে মুদ্রার হারের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করা থাকে। ফলে একবারেই খুব বেশি বাড়তে পারবে না, আবার কমতেও পারবে না।

গতবারের মুদ্রানীতিতে নেওয়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও আগের চেয়ে বৃদ্ধি পায়নি মন্তব্য করে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটু সময়ের প্রয়োজন হয়। আগের চেয়ে না বাড়লেও গত নভেম্বর থেকে ক্রমাগত কমছে মূল্যস্ফীতি। এবারও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অগ্রাধিকারে রেখে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করার কথা বলেন গভর্নর।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার জানান, মূল্যস্ফীতি ছয় শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি তৈরি করা হয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। তবে বছর শেষে মূল্যস্ফীতি ছয় শতাংশে থাকবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আর্থিক খাতের অবস্থা ভালো হবে বলেও জানান আব্দুর রউফ। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোতে শিগগিরই সুশাসন নিশ্চিত হবে। এ বিষয়ে কাজ করা হয়েছে।

আর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের রিজার্ভ ২৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী (বিপিএম৬) রিজার্ভ ২০.৩২ বিলিয়ন ডলার। এর আগে নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের আমদানি বাবদ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১.২৭ বিলিয়ন ডলার দায় পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। এতে ৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ২৫.৫৬ বিলিয়ন ডলারে।

দেশে কোনো ব্যাংক বন্ধ হবে না :সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে  গভর্নর বলেন, ৫২ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশে কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়নি; ভবিষ্যতেও হবে না। ব্যাংকগুলোতে টাকা রাখার ক্ষেত্রে মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনাস্থা তৈরি হওয়ার মতো কোনো কারণ নেই। গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্বল ব্যাংক হিসেবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছিল বর্তমানে তাদের অবস্থা কী, জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, যেসব ব্যাংক দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে সেগুলো আর দুর্বলতার দিকে ফিরে যায়নি।

ইসলামী ব্যাংকগুলো প্রসঙ্গে :সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, যখন কোনোভাবে কোনো ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না, তখন লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট (ঋণের জন্য শেষ আশ্রয়স্থল) হিসেবে ঐ ব্যাংককে সহায়তা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে গভর্নরকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সেই ক্ষমতাবলে ইসলামি ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এটা আইন মেনে করা হয়েছে। আইনের বাইরে কিছু করা হয়নি।

নানা অনিয়মের পরও কেন ইসলামি ধারার এসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না এবং গভর্নর চেয়ার হারানোর ভয় পাচ্ছেন কি না, এই প্রশ্নের জবাবে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, ‘আমি অর্থসচিব ছিলাম। আমি নিয়মিত চাকরি ছেড়ে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে এসেছি। আমি আগেও চলে যেতে পারি বা সরকার আমাকে চলে যেতে বলতে পারে। এখানে চেয়ার হারানোর কোনো ভয় নেই। ভয়টয় পাই না। কেউ ভয় দেখালেও লাভ হবে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান, একেএম সাজেদুর রহমান খান, আবু ফরাহ মো. নাছের ও নুরুন নাহার, নির্বাহী পরিচালক খোরশেদ আলম সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। 

ইত্তেফাক/এমএএম