সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

রজব মাস ও মাহে রমজানের প্রস্তুতি

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:১৩

আরবি হিজরি বর্ষের ৭ম মাস রজব। রজব মহিমান্বিত মাস। আমলের বসন্ত মাস, রমজানের প্রস্তুতির মাস। আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব থেকেই শুরু করতেন রমজানের প্রস্তুতি। এ মাস শুরু হলে তিনি এই দোয়া পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রাজাবা ও ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান।’ অর্থাত্, ‘হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন। আর আমাদের রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ (নাসায়ি: ৬৫৯; মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪৬)

প্রসিদ্ধ মতানুসারে এ মাসেই সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম তাত্পর্যবহ ঘটনা ‘মেরাজ’ তথা বিশ্বনবির ঊর্ধ্বজগত্ পরিভ্রমণ। নবুওয়াত লাভের একাদশ বছরে এ মাসের ২৬ তারিখ দিনগত রাতে আল্লাহর বিশেষ মেহমান হিসেবে আরশে আজিমে পরিভ্রমণ করেন তিনি। সেখানে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দিদার লাভ করেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের হুকুম নিয়ে দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। সেখানে অবলোকন করেন সৃষ্টিজগতের অপার রহস্যময় অনেক বিষয়। এসব কারণে মুসলিম উম্মাহর কাছে এ মাসের গুরুত্ব আরো অনেক বেশি।

আরবি যে কয়েকটি মাসের সঙ্গে ইসলামের বিভিন্ন আমলের সম্পৃক্ততা রয়েছে তন্মধ্যে রজব একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। আরবি ১২ মাসের চারটি মাসকে ‘আশহুরুল হুরুম’ তথা সম্মানিত মাস ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয় আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কাছে গণনায় মাস ১২টি, তন্মধ্যে চারটি (সম্মানিত হওয়ার কারণে যুদ্ধবিগ্রহ) নিষিদ্ধ মাস, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান।’ (সুরা তাওবা: ৩৬)। রসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘১২ মাসে এক বছর। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি ধারাবাহিক জিলকদ, জিলহজ, মহররম এবং চতুর্থটি হলো রজব, যা জমাদিউস সানি ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী মাস।’ (বুখারি: ২/৬৭২)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ও হজরত কাতাদা (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে—‘এ মাসগুলোতে আমল করলে অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক সওয়াব লাভ হয় এবং এ মাসগুলোতে কোনো গুনাহের কাজ করলে অন্য মাসের তুলনায় অধিক গুনাহ হয়।’ (তাফসিরে তাবারি :৬/১৪৯-১৫০)। সম্মানিত চারটি মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে হজরত আবু বকর জাসসাস (রহ.) বলেন, ‘এসব মাসে ইবাদতের প্রতি যত্নবান হলে বাকি মাসগুলোতে ইবাদত করা সহজ হয় এবং এ মাসগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে অন্য মাসেও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়।’ (আহকামুল কুরআন: ৩/১৬৩)। হজরত আবু বকর বলখী (রহ.) বলেন, ‘রজব হচ্ছে ফসল রোপণের মাস, শাবান ফসলে পানি সেচ দেওয়ার মাস আর রমজান হলো ফসল তোলার মাস।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘রজব মাস ঠান্ডা বাতাসের মতো, শাবান মাস হলো মেঘমালার মতো। আর রমজান মাস হলো বৃষ্টিতুল্য।’ (লাতায়েফুল মাআরেফ: পৃষ্ঠা ১৪৩)

হাদিসে রজবের আরো একটি আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে। এ সময় অধিক পরিমাণে দোয়া করা। নিজের জন্য, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। রজবের প্রথম রাতে মহান আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুল করেন। হাদিসে রজবের প্রথম রাতে দোয়া কবুলের সুসংবাদ এসেছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত—তিনি বলেন, ‘পাঁচটি রাত এমন রয়েছে, যে রাতে বান্দার দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না। রাতগুলো হলো—জুমার রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শাবানের ১৫ তারিখের রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাত।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৭৯২৭)

তবে এ কথা অবশ্যই স্মরণ রাখা উচিত, আমল করতে গিয়ে যেন আমরা কোনো প্রকার কুসংস্কারে জড়িয়ে না পড়ি। রজব মাসে আলাদা নির্দিষ্ট নামাজ বা রোজা নেই। নফল নামাজ এবং নফল রোজা নিষিদ্ধ সময় ব্যতীত বছরের যে কোনো সময় আদায় করা যায়। আর রজব যেহেতু সম্মানে মাসের অন্তর্ভুক্ত, এ সময় আমল করলে অধিক সওয়াবের আশা করা যায়, তাই অধিক পরিমাণে নফল নামাজ ও রোজা পালনে সচেষ্ট থাকব আমরা।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, পরিচালক, বিএসসিএল ও ইসলামি গবেষক

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন