মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ভাড়া কম, তবু যাত্রী সংকটে বিআরটিসি

  • ১৮০০ বাসের মধ্যে সচল মাত্র ১ হাজার
  • যাত্রীদের অভিযোগ— স্টপেজে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, বেশির ভাগ গাড়িই পুরোনো, ঠিকমতো মেরামত করা হয় না
  • সংকট নিরসনে আনা হচ্ছে ১০০ ইলেকট্রিক বাস
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:০০

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাসের ভাড়া কম হলেও বেশির ভাগ সময়ই এ বাসগুলোতে যাত্রীসংকট  দেখা যায়। নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে না পৌঁছানোই এর অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকে অভিযোগ করেছেন। এ ব্যাপারে একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, বিআরটিসি বাসে ভাড়া কম হলেও গন্তব্যে  যেতে অনেক সময় নেয়। এক-একটা স্টপেজে অনেক সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। এজন্য বিআরটিসি বাসে উঠতে ইচ্ছা করে না। এছাড়া বেশির ভাগ গাড়ি পুরোনো। ঠিকমতো  মেরামত করে না। গাড়ির সিট ভাঙা থাকে। মাথার ওপরের ফ্যান কাজ করে না। আবার পথে বিকল হওয়াসহ নানা ঝামেলা তো আছেই।

যাত্রীদের অভিযোগ, সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি গণপরিবহন খাতে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ধারাবাহিক দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও সড়কে বেসরকারি বাস মালিক-শ্রমিকদের বৈরী আচরণে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বিআরটিসির সেবা কার্যক্রম। বিশ্ব জুড়ে গণপরিবহনে রাষ্ট্রায়ত্ত  সংস্থার  নেতৃত্ব থাকলেও বাংলাদেশ  রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন-বিআরটিসি পিছিয়ে পড়ছে।

নিরাপদ ও আধুনিক সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা  এবং  দেশের আর্থসামাজিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে বিআরটিসি কাজ শুরু করলেও, এখনো তা পুরোপুরি আশার মুখ দেখেনি। বিআরটিসি বহরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাস আছে। এর মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে ১ হাজারের মতো। আর বাকি ৬০০ বাস পড়ে রয়েছে  বিভিন্ন ডিপোতে, যার অধিকাংশই অকেজো। সচল বাসের মধ্যে প্রায় ৪৫০টি ভাড়ায় ব্যবহূত হচ্ছে বিভিন্ন অফিসের স্টাফ এবং বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার কাজে। সিটি সার্ভিসের পাশাপাশি দেশের ১৬৩টি রুটে ৪২০টি বিআরটিসি বাস চলাচল করছে।

বিআরটিসির ওয়েবসাইট  থেকে জানা যায়,  সংস্থার মোট বাস ডিপো ২১টি। ট্রাক ডিপো দুইটি।  মোট বাস সংখ্যা ১ হাজার ৮৩০টি। এরমধ্যে নতুন বাস ৬০০টি এবং পুরোনো ১ হাজার ২৩০টি, চলমান আছে ১ হাজার ১৮২টি। নিবন্ধনের অপেক্ষায় নতুন বাস ৩২৫টি। হালকা ও ভারী  মেরামতের অপেক্ষায় আছে ৭৫টি বাস।

বিআরটিসি বলছে, সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের অফিসে যাতায়াতের সুবিধার্থে ১৬৪টি রুটে তাদের ২০২টি স্টাফ বাস হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ১৮১টি বাস নিয়মিত চলাচল করছে।

সারা দেশে ২২টি বাস ডিপো, দুটি ট্রাক ডিপো, দুটি যানবাহন মেরামত কারখানা, চারটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও ১৯টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিআরটিসির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠার পর মধ্যে কয়েকটি বছর বাদ দিলে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত নিয়মিত  লোকসান গুনেছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি। তবে বিআরটিসির বার্ষিক প্রতিবেদন মতে, গত ২২-২৩ অর্থবছরে বিআরটিসি  লোকসান  থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে । কিন্তু যাত্রীসংকটে প্রশ্ন থেকে যায়,  কীভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ব্যাপারে বিআরটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের বলেন, যাত্রীসংকট আগের তুলনায় অনেক কমেছে। আমরা নতুন নতুন গাড়ি সড়কে ছেড়েছি। পদ্মা  সেতু চালুর পর রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার ২৩টি রুটে ৬০টি বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। আস্তে আস্তে যাত্রীদের আস্থার জায়গা তৈরি করছে বিআরটিসি। আর এজন্যই এখন আমরা লাভজনক প্রতিষ্ঠানের  দিকে অগ্রসর হচ্ছি। 

তিনি আরো বলেন, বিআরটিসির অচল গাড়িগুলো মেরামত করে বাসসংখ্যা ১ হাজার ২১০-এ উন্নীত করা হয়েছে। ৫০টি গাড়িতে ভিডিও ক্যামেরা সংযোজন করা হয়েছে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন  সেবার পাশাপাশি নগর পরিবহন, পর্যটক বাস সার্ভিস, মহিলা বাস সার্ভিস, স্কুল বাস সার্ভিস, বাণিজ্য  মেলা,  মেট্রোরেল শাটল বাস সার্ভিস, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে  শাটল বাস সার্ভিস ইত্যাদি নানামুখী সেবা প্রধানের মাধ্যমে বিআরটিসি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমানে ২০৮টি স্থানীয় রুটে এবং পাঁচটি আন্তর্জাতিক রুটে বিআরটিসির বাস সার্ভিস পরিচালিত হচ্ছে। যে কোনো সময়ের তুলনায় বিআরটিসির কারিগরি সক্ষমতা এখন অনেক বেশি। করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ইনহাউজ প্রশিক্ষণ দক্ষ চালক ও কারিগর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিআরটিসি অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আসছে ১০০ ইলেকট্রিক বাস: প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, শিগিগরই নতুন আরো ১০০টি ডাবল ডেকার আনতে যাচ্ছে বিআরটিসি। ৩৮৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে এজন্য। এগুলো ইলেকট্রিক বাস এবং এতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ সুবিধা থাকবে। সাতটি বৈদ্যুতিক চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হবে বাসগুলোর জন্য। এ দিয়ে কার্বন নিঃসারণ কমানোর নতুন যুগে প্রবেশ করবে বিআরটিসি।

ইত্তেফাক/এএইচপি