মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

কিশোরগঞ্জে নারী খামারিদের টাকা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পকেটে

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৪, ২০:৩৪

বেকার সমস্যা সমাধানের লক্ষে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। সেই প্রকল্পের আওতায় স্কাভেনজিং পোলট্রি সেড ও ভেড়ার পরিবেশবান্ধব ঘর নির্মার্ণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা নুরুল আজীজ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের এলএসপিদের বিরুদ্ধে। 

এদিকে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার কারণে উপকারভোগী খামারিদের নাম কেটে দেওয়াসহ বিভিন্ন হুমকি দিচ্ছেন অভিযুক্তরা। নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ক্ষুদ্র খামারিদের সঙ্গে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) দেশি মুরগী ও ভেড়ার পরিবেশবান্ধব ঘর নির্মাণের জন্য ১১৩টি নারী খামারিদের নামে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের টাকা গত জুনের আগেই খামারিদের নিজ নিজ হিসাব নম্বরে জমা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ওই টাকা উত্তোলন করে খামারিরা নিজেরাই তাদের ঘর নির্মাণ করবেন। কিন্তু উপকারভোগীদের অভিযোগ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নুরুল আজীজের নির্দেশে ইউনিয়ন এলএসপিরা তাদের অফিসে ডেকে এনে চেকে স্বাক্ষর নিয়ে উপকারভোগীদের বাড়ি পাঠিয়ে সমস্ত টাকা উত্তোলন করে নেন। 

উপকারভোগীদের অভিযোগ টাকা উত্তোলন করে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রণচণ্ডি ইউনিয়নের এলএসপি সেলিমের মাধ্যমে দুর্বল ঘুণে ধরা কাটের বাকল, পাতলা টিন, ও কমদানের পিলার ব্যবহার করে ঘরগুলো তৈরি করেছেন। ঘরগুলো তৈরি করতে না করতেই সেগুলো নষ্ট হতে বসেছে। তারা বলেন, ঘরপ্রতি বরাদ্দ ২০ হাজার টাকা থাকলেও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এলএসপিদের দিয়ে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় করে ঘর নির্মাণ করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার কারণে তাদের নাম কেটে দেওয়াসহ বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
 


শনিবার সরেজমিনে গিয়ে উপজেলার রণচণ্ডি ইউনিয়নের বাফলা গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি হামিদা বেগমের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, আমার ভেড়ার ঘরটি তৈরি করার তিন মাসের মতো হল। কে ঘর তৈরি করে দিয়েছেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নের এলএসপি মো. সেলিম হাসান নিজেই তদারকি করে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। আপনার নামে ঘর তৈরির বরাদ্দের টাকা আপনি তুলেছেন কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, সেলিম আমাকেসহ অন্য উপকারভোগীদের উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে ডেকে স্বাক্ষর নিয়ে চেকটি আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। টাকার কথা জানতে চাইলে সে আমার নাম কেটে দেওয়াসহ বিভিন্ন গালমন্দ করেন।

একই গ্রামের উপকারভোগী হোসনেআরা বেগম বলেন, আমাকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে ডেকে চেকে স্বাক্ষর নিয়ে নিজে চেক রেখে আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। পরে আমি শুনেছি আমার নামে ঘর তৈরির জন্য ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ এসেছিল। পরে এলএসপি সেলিম নিজে ঘর তৈরি করে দিয়েছেন। ঘরগুলো তৈরিতে বাজার থেকে কেনা শুধুমাত্র ৬টি ৭ ফিট পিলার, ৯ ফিট ২টি টিন, ৩০ ফিট নেট জালি, ৩০ থেকে ৩৫টি ইট ও একবস্তা সিমেন্ট, দুই সিএফটি কাট ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ঘর প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। শুনেছি ঘরের নিচে প্লাস্টিকের সেটের জন্য আরও ৫ হাজার করে টাকা বরাদ্দ এসেছিল। 

একই অভিযোগ করেছেন উপকারভোগী পারভিন আক্তার বিউটি বেগমসহ আরও অনেকে। তারা সকলেই বলেন, ঘর নির্মাণে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ করে বাকি টাকা অফিসের লোকজন ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রণচণ্ডি ইউনিয়নের এলএসপি মো. সেলিম মিয়া উপকারভোগীদের অফিসে ডেকে এনে চেকে স্বাক্ষর নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, আমি ইউনিয়ন এলএসপি আমাকে যা বলা হবে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তবে সেলিম আরও বলেন, ঘর নির্মাণে যা ব্যয় হয়েছে তারাই সে টাকা দিয়েছে। 

গাড়াগ্রাম দেশি মুরগীর খামারি নারী উপকারভোগী পারভিন, স্বপ্না আক্তার, জরিনাসহ অনেকে বলেন, আমাদের মুরগীর ঘরগুলো নির্মাণে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। ঘরগুলো নির্মাণের সময় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় এখনই ঘরের নিচের পিলার ভেঙে গেছে, নেটগুলো খুলে গেছে। এই ভাঙা ঘরে মুরগী রাখলে শেয়াল কুকুরে নিয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় মুরগী মারা যেতে পারে। 

উপকারভোগীরা আরও বলেন, আমাদের অফিসে ডেকে নিয়ে তারা ব্ল্যাংক চেকে স্বাক্ষর নিয়ে পরে টাকার অংক বসিয়ে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে।
 
উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা নুরল আজিজের সঙ্গে কথা বলার জন্য রোববার সকাল ১০টা ২০মিনিটে তার অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ বিষয়ে কোনো খামারি আমাকে লিখিত অভিযোগ দেয়নি। খামারিরা লিখিতভাবে জানালে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। 

ইত্তেফাক/পিও