মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যা

উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ভেজাল খাদ্য ও পরিবেশ বড় কারণ

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৪, ০২:৩০

মাত্রাতিরিক্ত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কেমিক্যালযুক্ত ভেজাল খাবার ও পরিবেশ দূষণের কারণে দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ রোগে আক্রান্তদের একসময় কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। তখন ডায়ালাইসিস বা কিডনি সংযোজন ছাড়া বাঁচার উপায় থাকে না। এ দুটি চিকিৎসা পদ্ধতিই অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অর্থের অভাবে অনেকে পুরো চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে পারেন না। ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজন করতে না পেরে প্রতি বছর অর্ধ লক্ষাধিক কিডনি রোগীর মৃত্যু হয়। 

এছাড়া হঠাৎ কিডনি বিকল হয়েও প্রতি বছর আরও ২০ হাজার রোগী মৃত্যুবরণ করেন। এসব রোগীদের বাঁচিয়ে রাখতে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মাত্র ২০ ভাগ রোগী কিডনি ডায়ালাইসিসের সুযোগ পান। 
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ঢাকার বাইরে কিডনি চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। নানা কারণে সবাই ঢাকামুখী হয়। শেরে বাংলানগরে কিডনি ইনস্টিটিউটে রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন। তাই সারা দেশে সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৃথক কিডনি পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সাব্যবস্থা থাকা উচিত। যেখানে কিডনি ডায়ালাইসিসের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাহলে সারা দেশ থেকে ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমবে। 

এদিকে কিডনি চিকিৎসায় সরকারের পাশাপাশি সফলতার মুখ দেখাচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্স ইনস্টিটিউট। রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানকে কিডনি রোগীদের উন্নত চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণা করার জন্য আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রোলজি গত ১৮ জানুয়ারি এই স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্স ইনস্টিটিউটকে মর্যাদাপূর্ণ ‘সেরিয়ার অ্যাওয়ার্ডের’ বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি হলেন বিশিষ্ট কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশীদ। তিনি ২০০২ সালে কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসাসেবা আন্তর্জাতিক মানের। কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৩০০। প্রতি মাসে এই হাসপাতালে চার থেকে পাঁচ জন রোগীর ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন করা হয়। এ পর্যন্ত ছয় শতাধিক রোগীর কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে হাসপাতালটি। প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ রোগীর কিডনি ডায়ালাইসিস স্বল্পমূল্যে করা হয় এখানে। কিডনি ফাউন্ডেশন দেশের আপামর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কিডনি রোগ, ডায়াবেটিক্স এবং হাইপারটেনশন রোগ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ এবং চিকিৎসার ওপর বিভিন্ন গবেষণা কর্ম পরিচালনা করে থাকে।

বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, যেসব কারণে কিডনি রোগ হয় তার অন্যতম কারণ হলো ভেজাল খাদ্যসামগ্রী, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়া, কিডনিতে পাথর, ইনফেকশন, অনিয়মিতভাবে ব্যথার ওষুধ সেবন, পরিবেশগত। বর্তমানে ২ কোটি বেশি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পেরে প্রতি বছর অর্থ লক্ষাধিক মানুষ মারা যায়।

জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,  বাংলাদেশে বর্তমানে কিডনি রোগে আক্রান্ত প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। যাদের মধ্যে ডায়াবেটিস জনিত কারণে ১১ ভাগ, উচ্চ রক্তচাপের কারণে ২০ ভাগ ও নেপরাইটিসের কারণে ২৫ ভাগ রোগী কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। এছাড়া খাদ্যে ভেজাল, কেমিক্যাল সংমিশ্রণে উৎপাদিত খাদ্যসামগ্রী, পরিবেশগত, ভেজাল ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, ব্যথা নাশক ওষুধ সেবনসহ নানা কারণে দেশে কিডনি রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশু কিডনি রোগীর সংখ্যাও ব্যাপক হারে বাড়ছে। দেশে আক্রান্ত কিডনি রোগীদের মধ্যে ১০ থেকে ১২ ভাগের কারণ জানা যায়নি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মনে করেন, বিষাক্ত কেমিক্যাল ও খাদ্যে ভেজালের কারণে তাদের কিডনি নষ্ট হয়েছে।

কিডনি রোগের লক্ষণ :আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো বৃক্ক বা কিডনি। কোনো কারণে কিডনি আক্রান্ত হলে বা কিডনিতে কোনো রকম সংক্রমণ হলে শরীরে একের পর এক নানা জটিল সমস্যা বাসা বাঁধতে শুরু করে। তাই কিডনির সমস্যা বা অসুখকে ‘নিঃশব্দ ঘাতক’ বলেই ব্যাখ্যা করে থাকেন অনেক চিকিৎসক। কারণ, কিডনির সমস্যা বা অসুখের নির্দিষ্ট কোনো উপসর্গ হয় না। তবে কয়েকটি উপসর্গ যা দেখলে অত্যন্ত সাধারণ বলে মনে হলেও এগুলো লক্ষ্য করলে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া দরকার। মুখ, চোখের কোল যদি হঠাত অস্বাভাবিক ভাবে ফুলে ওঠে, তাহলে অবশ্যই সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ, কিডনির সমস্যা বা অসুখের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। বারবার প্রস্রাবের বেগ অনুভব করলে সেক্ষেত্রে আগে থেকেই সাবধান হওয়া প্রয়োজন! কিডনি সঠিকভাবে কাজ না করলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। হাত, পা বা পিঠের পেশিতে ঘন ঘন অস্বাভাবিক টান বা খিঁচুনি ধরা। ত্বক অসময় হঠাত শুষ্ক হয়ে যায়। গোড়ালি বা পায়ের পাতা হঠাতই অস্বাভাবিক ফুলে যায়। একাধিকবার মূত্রথলিতে সংক্রমণ হতে পারে। এছাড়াও প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথাও করতে পারে।

ইত্তেফাক/এমএএম