তাহারা সমাজ ও রাজনীতির জন্য ধ্বংস ডাকিয়া আনিতেছে

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৩০

কথায় বলে, অর্থই অনর্থের মূল। অর্থের জন্য মানুষ কী না করিতে পারে? অনেকেই এমন নিচে নামিয়া যায় যে, মনুষ্যত্ব বলিয়া আর কিছু থাকে না। অর্থলোভী সেই মানুষ তখন পশুতে পরিণত হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন—‘এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি—/ রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’ অর্থাৎ অর্থলোভী মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তাহার মধ্যে ন্যায়-অন্যায়বোধ কাজ করে না। প্রথমে হয়তো সে নিরীহ থাকে। নিজের চাহিদাও থাকে সীমিত; কিন্তু সে যতই অর্থমোহে নিমজ্জিত হয়, ততই সে বেপরোয়া হইয়া উঠে। অর্থলাভে সে তখন খুনখারাবি হইতে শুরু করিয়া হেন কোনো অপরাধ নাই যাহা  করে না।

ইদানীং আমাদের দেশে অগাধ অর্থ উপার্জনের অন্যতম এক সহজ পথ মাদক কারবার। বাংলাদেশ মাদকের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের অন্তর্ভুক্ত  থাইল্যান্ড, লাওস ও মিয়ানমারের নিকটবর্তী বা প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় এখানে মাদক সহজলভ্য হইয়া উঠিয়াছে। বলিতে গেলে মাদক কারবারিদের মাদক পাচার ও বিস্তারের টার্গেটে রহিয়াছে বাংলাদেশ। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, রাজধানী ঢাকার পাঁচ শতাধিক স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রয় করা হয়। ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, এক বত্সরে কেবল রাজধানীতেই ১২ হাজার মাদকের মামলা হইয়াছে। মামলা হইবার পর গ্রেফতারও হইতেছে কেহ কেহ। তাহার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হইতেছে না। কেননা মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করিয়া এক অদৃশ্য ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়িয়া উঠিয়াছে। এই সিন্ডিকেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্মকর্তা এমনকি স্পর্শকাতর বিভাগের লোকজনও জড়িত বলিয়া জানা যায়। মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশে আমরা মাদক সম্রাটদের শক্তিমত্তার খবর পাই। আমাদের দেশেও মাদক কারবারকে ঘিরিয়া এক শক্তিশালী চক্র গড়িয়া উঠিয়াছে।

এই চক্র দেশের পরিবার, সমাজ এমনকি রাজনীতিকেও নষ্ট করিয়া দিতেছে। মাদকের জন্য পরিবারে অশান্তি, সমাজে অস্থিরতা ইত্যাদির খবর প্রায়শ আমরা পত্রপত্রিকায় দেখিতে পাই; কিন্তু এবার জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া মাদকের গড ফাদারদের দৌরাত্ম্য দেখিয়া যে কেহ বিস্মিত না হইয়া পারেন নাই। যেইভাবে তাহারা দুই হস্তে অর্থ খরচ করিয়াছেন, তাহাতে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের লোক বিচলিত বোধ না করিয়াও পারেন না। যাহারা এইভাবে মাদক কারবারের আশ্রয় লইয়া অর্থের পিছনে ছুটিতে থাকে, তাহারা শেষ পর্যন্ত নিজের, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধ্বংস ডাকিয়া আনে। উল্লেখ্য, মাকদের বিরুদ্ধে একদা ব্যাপক অভিযান চালানো হইয়াছিল এবং এই ব্যাপারে গ্রহণ করা হইয়াছিল জিরো টলারেন্স নীতি। তাহার পরও এই সমস্যা কেন দূর হয় নাই। বরং বর্তমানে মাদক কারবারি ও মাদকাসক্তির সংখ্যা পূর্বের তুলনায় বাড়িয়া গিয়াছে। শুধু খুচরা মাদক ব্যবসায়ী কিংবা নিরীহ মাদকাসক্তিদের গ্রেফতার করিলে চলিবে না, মাদকের রাঘববোয়াল তথা গডফাদারদের পাকড়াও করিয়া আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। প্রয়োজনে এই সংক্রান্ত আইনের সংশোধনী আনিয়া তাহা যুগোপযোগী করিতে হইবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিকট মাদক কারবারিদের যে তালিকা রহিয়াছে, সেই অনুযায়ী নূতন করিয়া ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়াছে। মাদক সম্রাটদের নিয়ন্ত্রণে না আনিতে পারিলে একসময় রাষ্ট্রের সকল কিছু স্থবির হইয়া পড়িলেও আমাদের কিছুই করিবার থাকিবে না।

মাদক আমাদের সমাজে কিশোর গ্যাং তৈরিসহ নানা অপরাধীর জন্ম দিয়াছে। ইহাকে কেন্দ্র করিয়া বহুমুখী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হইতেছে। মাদক কারবারি চক্র সমাজ ও রাজনীতিকে যেইভাবে নষ্ট করিতেছে তাহা উদ্বেগজনক। তাহারা আজ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। যদি তাহাদের এখনই প্রতিরোধ না করা যায়, তাহা হইলে তাহারা ক্ষমতাসীনদের জন্যও সমূহ বিপর্যয় ডাকিয়া আনিতে পারে।

ইত্তেফাক/এসটিএম