‘জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেহ দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হইলে দল হইতে সরাসরি বহিষ্কার হইবেন এবং যাহারা দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করিবেন, তাহারা তদন্ত-সাপেক্ষ মূল দল বা সহযোগী সংগঠন হইতে বহিষ্কৃত হইবেন।’
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ৪৭(ঠ) ধারায় বলা আছে একথা। ‘প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা’ শিরোনামের এই ধারামতে, জাতীয় নির্বাচনে দলের কোনো সদস্য দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হলে তিনি দল থেকে সরাসরি বহিষ্কার হবেন। এক্ষেত্রে, সংশ্লিষ্টকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। আর দলের কেউ দল মনোনীত প্রার্থীর বিরোধিতা করলে সেক্ষেত্রে তদন্ত্র সাপেক্ষে মূল দল বা সহযোগী সংগঠন থেকে বহিষ্কারের কথা বলা হয়েছে।
৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রায় দেড়শ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত ‘নৌকা’ প্রতীকের প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দলটির বিভিন্ন স্তরের পদধারী নেতারা, যারা ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাদের মধ্যে ৫৭জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এই ৫৭ জন ছাড়াও আওয়ামী লীগের যারা এবারের নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে দলের গঠনতন্ত্রের ৪৭ (ঠ) ধারাটি প্রযোজ্য কি-না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। আবার দলের কেউ কেউ প্রার্থী না হলেও দল মনোনীত প্রার্থীর সরাসরি বা প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছেন বলে খোদ দলীয় প্রার্থীরাই অভিযোগ তুলেছেন। তাদের ক্ষেত্রেও এই ধারাটি প্রযোজ্য কি-না, সেই প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ। কারণ, এর আগে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমসহ অনেকেই এমন অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। যদিও, পরবর্তীতে কারও কারও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারও করা হয়েছে।
এব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ গতকাল শুক্রবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘এবার তো আমরাই (আওয়ামী লীগ) বিষয়টা উন্মুক্ত করে দিয়েছি, আমরাই বলেছি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারবে। সেজন্য, এখানে গঠনন্ত্রের এই ধারাটি প্রযোজ্য হবে না।’
এবারের সংসদ নির্বাচনে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ৬২টি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তাদের মধ্যে ৫৯ জন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ৫৯ জনের মধ্যে ৫৭ জনেরই আওয়ামী লীগের কোনো না কোনো স্তরের দলীয় পদ রয়েছে। এর বাইরে নীলফামারী-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন জেলা জাতীয় পার্টির (জাপা) সহ-সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার হওয়া সিদ্দিকুল আলম। মোট ৬২জন স্বতন্ত্র এমপির অপরজন হলেন সিলেট-৫ আসনের মোহাম্মদ হুছামউদ্দিন চৌধুরী, যিনি ফুলতলীর হুজুরের ছেলে ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আঞ্জুমানে আল ইসলাহ্র সভাপতি। হুছামউদ্দিনও অবশ্য আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবেই পরিচিত।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখানোর লক্ষ্যে দলীয় নেতা-সদস্যদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও তাতে দলীয় গঠনতন্ত্র উপেক্ষিত হয়েছে। তাদের মতে, বিএনপিসহ তাদের মিত্র দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় এবং এবারের নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি এক ধরনের চাপ থাকার কারণে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোও ছিল দলীয়-স্বতন্ত্র প্রার্থী করার অন্যতম কারণ।
নির্বাচনের আগে, ১২ ডিসেম্বর দলীয়-স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘জোটের (১৪ দল) শরিকদের আপত্তি ও দলীয় প্রার্থীদের অস্বস্তি থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো বিকল্প নেই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনের সুযোগ নেই।’
এর আগে ২৭ নভেম্বর সংবাদ ব্রিফিংয়ে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘দলীয় নেতারা চাইলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতেই পারেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দলের প্রয়োজনেই কৌশলগত সিদ্ধান্ত। আমাদের মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি শেখ হাসিনা গণভবনে (২৬ নভেম্বর) প্রার্থীদের উদ্দেশে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে কোনো কিছু অপরিষ্কার, অস্পষ্ট নেই। সবকিছু খোলামেলা বলে দিয়েছেন। সবকিছু স্পষ্ট করেছেন। তার যে গাইডলাইন সেই গাইডলাইন অনুযায়ী যারা প্রার্থী হতে চান, তিনিই ডামি প্রার্থীর কথা বলেছেন। কাজেই এই গাইডলাইন অনুসরণ করে প্রার্থী হতে বাধা আছে বলে আমার জানা নেই। স্বয়ং সভাপতি গাইডলাইন দিয়েছেন।’
জাতীয় পার্টি (জাপা)সহ বিভিন্ন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে দলীয় প্রধানকে একচ্ছত্র কিংবা বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ২৫(১)(ক) ধারায় দলীয় সভাপতির ‘কার্যাবলী ও ক্ষমতা’ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সভাপতি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে গণ্য হইবেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল, জাতীয় কমিটির সকল অধিবেশন, কার্যনির্বাহী সংসদ ও সভাপতিমণ্ডলীর সভায় সভাপতিত্ব করিবেন এবং প্রয়োজনবোধে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের যে কোনো ধারা ব্যাখা করিয়া রুলিং দিতে পারিবেন।’
মাদারীপুর-৩ আসনে এবার দলীয়-স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে পরাজিত হওয়া আওয়ামী লীগ মনোনীত ‘নৌকা’ প্রতীকের প্রার্থী ড. আবদুস সোবহান গোলাপ নির্বাচনের পর সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেছেন, ‘এক অদৃশ্য শক্তি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। সূক্ষ্ম কারচুপি করে নৌকাকে হারানো হয়েছে। একটি পক্ষ নৌকাকে হারানোর জন্য কাজ করেছে, এটা প্রমাণিত। নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র থেকে নৌকার এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পরে ভেতরে বসে নিজেদের মতো ভোট নেওয়া হয়।’
মানিকগঞ্জ-২ আসনে পরাজিত ‘নৌকা’র প্রার্থী কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমও নির্বাচনের পর বলেছেন, ‘নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী (আওয়ামী লীগের) দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলুর লোকজন অনিয়মে জড়িত ছিলেন। একারণে আমি পরাজিত হয়েছি।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনে ‘নৌকা’ প্রতীকের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয়-জোট শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এবারের নির্বাচনে রাজশাহী-২ আসনে ‘নৌকা’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ‘কাঁচি’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা শফিকুর রহমান বাদশা। ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, ‘তিনি (মেয়র লিটন) নিজের দলীয় প্রতীকের বাইরে গিয়ে কাঁচি প্রতীকের পক্ষে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন, যার প্রভূত প্রমাণ হাতে রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী যেগুলো উপস্থাপন করা সম্ভব।’
এমন প্রেক্ষাপটে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদেরকে নিয়ে আগামীকাল রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গণভবনে বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দ্বাদশ সংসদে স্বতন্ত্র এমপিদের ভূমিকা কী হবে, সেবিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও স্বতন্ত্র এমপিদের আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা বা পরামর্শ দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
