রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কেন লেখা কী লেখা কীভাবে লেখা

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৫৫

লব্ধ প্রমাণাদি থেকে জানা যায় যে, খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের আগে কোনো এক সময় দক্ষিণ ইরাকে লেখা আবিষ্কার হয়, তবে আবিষ্কারক নিয়ে বিতর্ক রয়ে যায় রেনেসাঁ পর্যন্ত। প্রত্নতত্ত্ব ও কালপঞ্জি ধরে চিন্তকগণকে মূলত হিব্রু বাইবেল ও গ্রেকো-রোমান লেখকগণের কাছে যেতে হয়। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের ইতিহাসবিদ ফ্লাভিয়াস জোসেফাস বাইবেলে বর্ণিত বড় বন্যার আগেই লেখা আবিষ্কারের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন আলোচক বিশ্বাস-অবিশ্বাস-খণ্ডন বা সজ্ঞানে উপেক্ষা করলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে ভাষা শিখতে জোসেফাসের বিবরণ প্রায়শই চলে আসে। তবে কঠিন হলেও সত্য যে, মানুষের ইতিহাস জুড়ে দেখা যায় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই পড়তে বা লিখতে পারতেন না।

এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, অধিকাংশ মানবসমাজকে সুগঠিত করতে লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। লেখা জ্ঞান-হস্তান্তরের প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রথা বা রীতি। মানুষ সবসময় একে অপর থেকে শিখে এসেছে—ধর্মীয় মনীষীগণের ব্যাখ্যায় মানুষ নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা তথা জীবনদর্শনের ক্ষেত্রে উপকৃত হয়, শিক্ষার্থীগণ শিক্ষকের কাছ থেকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা নেয়, নিজেদের কর্মজীবনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণের কাছ থেকে পেশাগত দক্ষতা শেখে। অনেক সময় লেখা প্রতিরোধের হাতিয়ার এবং সমাজ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহূত হয়েছে।

লেখাকে প্রধানত দু ভাগে ভাগ করা যায়—ফিকশন ও নন-ফিকশন। প্রথমটিতে রয়েছে গল্প, উপন্যাস, নাটক, কাব্য, রোমান্স কাহিনি ইত্যাদি কল্পিত লেখা, আর দ্বিতীয়টি প্রকৃত তথ্যভিত্তিক লেখা এবং কখনো দৃষ্টিভঙ্গিগত ভিন্নতা থাকলেও কল্পিত কিছু নয় ও যাচাইযোগ্য। এ নিবন্ধে নন-ফিকশন বিষয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। কেমব্রিজ ডিকশনারির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কল্পনাপ্রসূত গল্প নয় বরং সত্যিকার বা প্রকৃত ঘটনার ওপর লেখাকে নন-ফিকশন বলা হয়। নন-ফিকশন এমন একটা শব্দ যা প্রকৃত মানুষ বা সম্প্রদায়, স্থান, বস্তু বা ঘটনা ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করে তথ্য সংবলিত গদ্যরচনা। তবে সংবাদপত্রের রচনা, শিক্ষণসামগ্রী ও এনসাইক্লোপিডিয়ার লেখাও নন-ফিকশনের মধ্যে পড়ে। আবার জীবনচরিত, ইতিহাস গ্রন্থ এমনকি ভ্রমণ নির্দেশিকাকেও নন-ফিকশন বলা যায়, কারণ এগুলি হলো প্রকৃত ঘটনা নিয়ে লেখার একটি জনপ্রিয় রীতি।

দেশের ভূমিকম্পবিষয়ক গবেষণা করতে গিয়ে নন-ফিকশন লেখার গুরুত্বটি আরেকবার উপলব্ধি করি। বিশেষত ভূকম্পনঘটিত দুর্যোগ মূল্যায়নে ভূতাত্ত্বিক ও যান্ত্রিক উপাত্ত ছাড়াও ভূমিকম্পের ঐতিহাসিক তথ্যাদি প্রয়োজন হওয়ায়। জানামতে আমাদের দেশে ১৫৪৮ সালের পূর্বের ঘটনার তথ্য পাওয়া যায় না, এমনকি ৮.৩ মাত্রার ‘আসাম ১৯৫০’ ভূমিকম্পে বাংলাদেশে পড়া প্রভাবের তথ্যও পাওয়া যায় না। অথচ চীনে প্রায় চার হাজার বছর আগের তথ্য পাওয়া যায়। গ্রিসে এমন বিবরণ পাওয়া যায় প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ অব্দ থেকে নানান দার্শনিক, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনির লেখাসমূহে অর্থাত্ আড়াই হাজার বছরের পুরোনো। ইউরোপের কথাও বলা হচ্ছে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮০ অব্দ থেকে। আমাদের জীবদ্দশায় প্রকৃতি ও জীবনে কোভিড-১৯-এর বিস্তৃত ও গভীর প্রভাব আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। নিশ্চয় দেশের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোভিড-১৯-এর প্রভাব বিষয়ে বিস্তর আলোচনা-গবেষণা-লেখালিখি হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলি একদিকে ইতিহাসের মূল্যবান দলিল হয়ে থাকবে অন্যদিকে তেমনই ভবিষ্যতে সংক্রামক রোগের গবেষণায় বা প্রতিরোধে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তবে বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ ও মতামতের বাইরেও প্রকৃতি-জীবন-সমাজ সচেতন মানুষদের পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়নের তথ্যও লিপিবদ্ধ থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। আজ থেকে পঞ্চান্নো-ষাট বছর আগে প্রত্যক্ষ করা দিনাজপুরের ছোট যমুনা নদীর স্ফটিক-স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ও তলদেশে                চকচক করা বালু, সংলগ্ন পরিবেশ, নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন এবং আজকের অবস্থার মধ্যে কী নিদারুণ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, স্বচ্ছ পানি না হলেও এখনো নদীটি প্রবহমান। পরিব্রাজকগণ যেমন খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের হিউয়েন সাং, চতুর্দশ শতকের ইবন্ বতুতা বা ষোড়শ শতকের র্যালফ ফিটচ্-এর লেখাগুলি থেকে আমরা উপকৃত হচ্ছি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত প্রশাসনিক ও পরিসংখ্যান প্রতিবেদন এমনকি ভ্রমণবিষয়ক লেখাগুলি দলিল হয়ে আছে এবং এখনো গবেষণায় সহায়ক হয়। লেখার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, মাত্র কয়েকটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কাজেই কোথাও না কোথাও লিখিত আকারে থাকলে ভবিষ্যতে তার প্রয়োজন হতে পারে, এভাবে নন-ফিকশন বই জ্ঞানচর্চায় অবদান রাখে।

অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ইতিহাস, গবেষণা ইত্যাদি নানা বিষয় নন-ফিকশন লেখায় আনা যেতে পারে। এমনকি কর্মজীবনে একজন মানুষের কাটিয়ে ওঠা চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর লেখা স্মৃতিকথা বা সাফল্য অর্জনের মূলমন্ত্র বিষয়ক লেখা অন্যের কাছে লেখার মাধ্যমে হস্তান্তরের সুযোগ পাওয়া যায়, এতে লেখক ও পাঠক উভয়ই উপকৃত হন—আর পাঠকের কাছে আগ্রহোদ্দীপক হলে লেখকের গ্রহণযোগ্যতাকে শক্তিশালী করে। বিশেষ পেশাগত ক্ষেত্রের একজন বিশেষজ্ঞের লেখা একদিকে লেখকের আত্মবিশ্বাস যেমন বৃদ্ধি করে; অন্যদিকে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা, সাফল্যের নিজস্ব কৌশল, পেশাদার ও সৃজনশীল কাজকে অন্যদের কাছে বিকশিত করার সুযোগ এনে দেয়। কাজেই বলার মতো যদি কোনো কিছু লেখকের কাছে থাকে, অন্যকে ভাগ দেওয়ার মতো মূল্যবান দক্ষতা থাকে যা তাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে—এমন হলে লেখা দরকার।

তবে লেখালিখির ব্যাপারে কিছু নিয়মকানুন তো আছে। লেখালিখির দক্ষতা উন্নয়নে অভিজ্ঞজনগণ নানা পরামর্শ দিয়েছেন, এখানে সাধারণ কয়েকটির কথা বলা হলো—ব্যাপকভাবে ও নিয়মিত পড়াশোনার চর্চা, ব্যাকরণ ও বিরামচিহ্নে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন, নিয়মিত লেখার চর্চা, প্রাতিষ্ঠানিক লেখার পদ্ধতি পাঠ, বক্তব্যকে জোরকলমে কিন্তু সহজ ভাষায় উপস্থাপন, চিন্তাভাবনার সুসংগত পরিবেশন, পুঙ্খানুঙ্খভাবে সম্পাদনা ও মুদ্রণসংশোধন, লেখার সহায়তা চাওয়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অত্যধিক তথ্য পরিবেশন থেকে বিরত থাকা, পাঠকের সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া থেকে শিক্ষণ ইত্যাদি। এগুলির কোনো কোনোটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ পরিশ্রম হ্রাস করছে এবং সুবিধার আরো কী সম্ভাবনা আছে তা ভবিষ্যত্ই বলে দেবে।

লেখায় সৌন্দর্য আসে গঠনশৈলী, সুবিন্যস্ততা, চিন্তার অগ্রগতি থেকে এবং প্রায়শই বিভ্রান্তি পরিহার থেকে। কাজেই এসবের প্রতি মনোযোগ ও সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে লেখার শুরুতে একটি কাঠামো তৈরি করা অতি আবশ্যক। লিখন ধীরগতির চলমান একটি প্রক্রিয়া হওয়ায় দক্ষ লেখক হতে হলে ধৈর্য, সময় ও নিষ্ঠার সঙ্গে এবং লেখার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে অবিচল চর্চা চালিয়ে যাওয়া উচিত।

দেশের, দেশের মানুষের, মানবসভ্যতার কল্যাণে লিখতে হবে, লেখার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের অনন্য ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষের বেঁচে থাকা, জীবনজীবিকা, সমাজ-সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অর্থনীতি, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা ইত্যাদি নানাপ্রকার লেখার বিষয়বস্তু হতে পারে, দরকার শুধু চোখ-কান খোলা রাখা।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন