গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে শুরু হইয়াছে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ ৫৭তম বিশ্ব ইজতেমা। প্রথম পর্বে চলা এই বিশ্ব ইজতেমা আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে সম্পন্ন হইবে। দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হইবে ৯ হইতে ১১ ফেব্রুয়ারি। ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের পদচারণায় মুখরিত হইতে শুরু করিয়াছে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রতি বত্সরই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় তবলিগ জামাতের এই বিশ্ব ইজতেমা। আরবি ইজতেমা অর্থ সমাবেশ বা সম্মেলন। বিশ্ব ইজতেমার মূল উদ্দেশ্য হইল দিন ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার লক্ষ্যে আল্লাহর রাস্তায় বাহির হওয়া। জামাতে গিয়া যখন কেহ একনাগাড়ে কিছুটা সময় দিনি পরিবেশে থাকেন; তখন তাহার জন্য ইসলামের হুকুম-আহকাম মানা অনেকটা সহজ হইয়া যায়। ইহা আসলে একধরনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র বা কর্মশালা। বিশ্ব ইজতেমায় ইসলামের দাওয়াতের গুরুত্ব এবং ইমান-আমলসংক্রান্ত বয়ান করা হয়।
আমরা জানি, আরবি শব্দ তবলিগ অর্থ পৌঁছানো, প্রচার করা, প্রসার করা, বয়ান করা, চেষ্টা করা, দান করা ইত্যাদি। একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে কোনো স্বার্থ ছাড়াই অন্যের নিকট পৌঁছানোকে তবলিগ বলে। তবলিগের আদর্শ যিনি পৌঁছান, তাহাকে বলা হয় মুবাল্লিগ। বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও সাধক হজরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভি (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) বর্তমান পদ্ধতির দাওয়াতে তবলিগের প্রচলন করেন। তত্কালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণ পাশে অবস্থিত এক জনবিরল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন অঞ্চল মেওয়াতে তিনি তবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। ঘরসংসার ছাড়িয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে মাদ্রাসায় গিয়া দিন শেখা অসম্ভব। ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে সামগ্রিক জীবন পালটে দেওয়া বা জাহেলি বিশ্বাসকে পরিবর্তন করাও সম্ভব নহে। তাই ক্ষুদ্র দল বা ছোট জামাত আকারে ইলমি ও দিনি প্রতিষ্ঠানগুলিতে গিয়া সময় কাটানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করিতেই তবলিগ জামাতের প্রবর্তন করা হয়। মানুষ দিনদার পরহেজগার লোকদের জীবনযাপন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চালচলন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করিয়া সংশোধনের অপূর্ব সুযোগ লাভ করে।
উল্লেখ্য, তবলিগ জামাতের দ্বিতীয় আমির মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভি (রহ.)-এর যুগে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এই আন্দোলন সবচাইতে অধিক ও শক্তিশালী ছিল। প্রথম ইজতেমা ১৯৪১ সালে দিল্লির নিজামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়াতের নুহ মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত হইলেও ১৯৪৬ সালে তাহা ঢাকার রমনা পার্কসংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। ইহার পর বিশ্ব ইজতেমার সহিত বাংলাদেশের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়াইয়া পড়ে। ১৯৬৭ সাল হইতে অদ্যাবধি ‘বিশ্ব ইজতেমা’ অনুষ্ঠিত হইতেছে টঙ্গীর কহরদরিয়া খ্যাত তুরাগ নদের পাড়ে। সুতরাং এই দেশে বিশ্ব ইজতেমা একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যও তৈরি করিয়াছে। বিশ্বের প্রায় ৫০ হইতে ৫৫টি দেশের তবলিগি দিনদার মুসলমান জামাতসহ ২৫ হইতে ৩০ লক্ষাধিক মুসল্লি এই বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেন। আখেরি মুনাজাতের দিন রেডিও-টেলিভিশন, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সমগ্র বিশ্বে ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়।
এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বত্সর ১ হাজার ৫০০ হইতে ১ হাজার ৭০০ জামাত বিশ্ব ইজতেমা হইতে দেশে-বিদেশে এক চিল্লা (৪০ দিন), তিন চিল্লা (চার মাস), ছয় মাস ও এক বছরের জন্য আল্লাহর দিনের তবলীগ ও দাওয়াতের জন্য মুসল্লিরা বাহির হন। অন্যদিকে প্রতিটি মসজিদে গাশত, মাশওয়ারা, তালিমসহ পাঁচ আমল পরিপূর্ণ চালু করাও ইজতেমার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে তবলিগ জামাতের সদস্যদের মধ্যে যে মতপার্থক্য ও মনোমালিন্য দেখা দিয়াছে, ইহা অবিলম্বে দূর করিতে না পারিলে বিশ্ব ইজতেমা পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি মুসলিম দেশে স্থানান্তরিত হইয়া যাইতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ব তবলিগ জামাতের বর্তমান আমিরকে বাংলাদেশে আনয়নের ব্যাপারে মানবন্ধনও করিতে হইয়াছে। যেহেতু বিশ্ব ইজতেমার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হইয়াছে, তাই এই সম্মান ও মর্যাদা ধরিয়া রাখিতে বিবদমান দুই গ্রুপের ঐক্য একান্তভাবে প্রত্যাশিত। পরিশেষে আমরা চলমান ৫৭তম বিশ্ব ইজতেমার সাফল্য কামনা করি।
