বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

রিজার্ভ চুরির আট বছর

এখনো উদ্ধার হয়নি ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় করা মামলার তদন্ত আট বছরেও শেষ হয়নি। এখনো উদ্ধার হয়নি চুরি হওয়া ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) তেমন সাড়া না দেওয়ায় অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে গেছে। যদিও তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

রিজার্ভ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরি। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা সুইফট পেমেন্ট পদ্ধতিতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। এই অর্থ ম্যানিলাভিত্তিক আরসিবিসির অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এরপর সেখান থেকে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলোতে ঐ অর্থ ব্যয় হয়। ফিলিপাইনে নেওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে দেশটির আদালতের নির্দেশে ক্যাসিনো মালিক কিম অং ২০১৬ সালের নভেম্বরে প্রায় দেড় কোটি ডলার ফেরত দেন। এই দেড় কোটি ডলারই এখন পর্যন্ত ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার আজও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। অন্যদিকে এ ঘটনায় ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতেও মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই মামলায় আদালতের বাইরে সমঝোতার জন্য বিবাদীদের সুযোগ দিয়েছেন নিউ ইয়র্ক সুপ্রিম কোর্ট। এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সর্বশেষ ধার্য তারিখ ৩১ ডিসেম্বর হলেও তদন্ত সংস্থা সিআইডি প্রতিবেদন দাখিল না করায় আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছে আদালত। এ নিয়ে ৭৫ বারের মতো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য সময় পেল পুলিশের বিশেষায়িত এ বিভাগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় করা একটি মামলায় সাক্ষ্য দিতে একাধিকবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় গিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগের দুজন এবং সিআইডির আরও দুজন কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেন। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসির সঙ্গে দেশটির একজন মন্ত্রীর এ বিষয়ে বৈঠক হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এখন সমঝোতার বিষয়টি স্থগিত আছে। কারণ মামলায় জড়িত একজন ব্যক্তি সহযোগিতা করছেন না। তবে চেষ্টা করা হচ্ছে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য।

মামলার বিষয়ে বাংলাদেশের আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান কোজেন ও’কনর বিবাদীদের নোটিশ দেয়। এরপর আরসিবিসি, অভিযুক্ত ব্যক্তি লরেঞ্জ ভি টান, রাউল টান, সোলায়ের ক্যাসিনো, ইস্টার্ন হাওয়ায়ে এবং কিম অং যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ‘মোশন টু ডিসমিস’ বা মামলাটি না চালানোর অনুরোধ জানিয়ে আবেদন করে। গত বছরের ১৩ জানুয়ারি ছয় বিবাদীর ‘মোশন টু ডিসমিস’ বা মামলা না চালানোর আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন নিউ ইয়র্ক সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আরসিবিসিসহ অন্য বিবাদীদের মধ্যস্থতার নির্দেশ দেন স্টেট কোর্ট। তবে সমঝোতায় সাড়া দেয়নি ফিলিপাইন। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতেও পরে কোনো শুনানি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে অর্থ ফেরত পাওয়া অনেক জটিল। যে কারণে শুরু থেকেই সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের চেষ্টা ছিল। তবে তাতে ফিলিপাইনের দিক থেকে সাড়া মিলছে না। আবার যুক্তরাষ্ট্রের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়া অনেক সময়সাপেক্ষ। ফলে বাংলাদেশের অর্থ ফেরত পাওয়ায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১২ কর্মকর্তার দায় চিহ্নিত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তৎকালীন গভর্নরসহ ১২ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অবহেলা ও অসতর্কতাকে চিহ্নিত করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এই কর্মকর্তারা হলেন, একজন নির্বাহী পরিচালক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), একজন মহাব্যবস্থাপক (বর্তমানে ডেপুটি গভর্নর), চারজন যুগ্ম পরিচালক (এদের মধ্যে দুজন বর্তমানে উপ-মহাব্যবস্থাপক, একজন যুগ্ম পরিচালক এবং অন্যজন অবসরে আছেন), তিন জন উপ-মহাব্যবস্থাপক (তাদের মধ্যে দুজন এখন মহাব্যবস্থাপক) এবং দুই জন উপপরিচালক। সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে যে ১২ জন কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে মেজবাউল হকও রয়েছেন।

সেই সময়ে গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালক ছাড়া বাকি কর্মকর্তারা ফরেক্স রিজার্ভ এবং ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং, আইটি অপারেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগ, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ এবং ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিংস রুমের কর্মকর্তা ছিলেন। তারা ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে, সার্ভার রুম খোলা রেখে এবং অনুপস্থিত থাকার মাধ্যমে হ্যাকারদের একটি সুযোগ দিয়েছিলেন। সিআইডির তদন্তে বলা হয়েছে, তত্কালীন ডেপুটি গভর্নর-৪ আবদুল কাশেম সুইফটের মাধ্যমে আরটিজিএস সেবা দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। ফলে আরটিজিএস সেবা দেওয়ার ফাইলে আতিউর রহমান নিজেই স্বাক্ষর করেন।

এ বিষয়ে গতকাল সোমবার ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

ইত্তেফাক/এমএএম