বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

মেসির মতো গোল উদযাপনে কী বার্তা দিলেন এনজো

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৭:৩১

এল ক্লাসিকোতে লিওনেল মেসি সেই উদযাপনের কথা মনে আছে? ওই যে, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে শেষ মুহূর্তে গোল করে জার্সি খুলে মেলে ধরার দৃশ্যটা। যে গোলে ৩-২ ব্যবধানে নাটকীয় জয় পেয়েছিল বার্সেলোনা। ২০১৭ সালের সেই দৃশ্যটাই যেন ফিরে এলো ভিলা পার্কে। এবার ফ্রি কিক থেকে দুর্দান্ত গোল করে জার্সি মেলে ধরলেন মেসিরই আর্জেন্টাইন সতীর্থ এনজো ফের্নান্দেজ।

মঞ্চটা এল ক্লাসিকো মহারণের মতো কিছু নয়। এমনকি এফএ কাপের ম্যাচটি শেষ মুহূর্তেও জেতেনি চেলসি। তারপরও কেন এনজোর এমন বুনো উল্লাস? তাছাড়া বার্নাব্যুতে মেসির জার্সি খুলে উদযাপনের আরেকটি কারণও ছিল। শেষ মুহূর্তের লক্ষ্যভেদে বার্সেলোনার জার্সিতে ৫০০তম গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। এনজোর বেলায় তেমন কোনও উপলক্ষও নেই। তাহলে?

প্রথমে ঘটনাটা পরিষ্কার করা যাক। এফএ কাপের চতুর্থ রাউন্ডে মাঠে নেমেছিল অ্যাস্টন ভিলা-চেলসি। অ্যাস্টন ভিলার মাঠ ভিলা পার্কে ১১ মিনিটেই এগিয়ে যায় ব্লুরা। ২১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে সফরকারীরা। ওই ২ গোলের লিড নিয়েই প্রথমার্ধ শেষ করে চেলসি। এরপর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে এনজোর গোল। গোটা ম্যাচেই দুর্দান্ত পারফর্ম করা আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার বক্সের বাইরে থেকে শট নেবেন, এই অবস্থায় পেছন থেকে অ্যাস্টন ভিলার এক খেলোয়াড় ফাউল করেন এনজোকে। রেফারি বাজান বাঁশি।

বক্সের বেশ বাইরে থেকে ফ্রি কিকটি নেন এনজো নিজেই। দুর্দান্ত মাপা শটে জাতীয় দল সতীর্থ এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে ফাঁকি দিয়ে করেন দেখার মতো এক গোল। বল জালে জড়াতেই ভোঁ দৌড় দিতে দিতেই জার্সি খুলে ফেলেন ২৩ বছর বয়সী বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার। এরপর তার জার্সির পেছনের দিকে থাকা নাম ও ‘৮ নম্বর’ লেখা প্রদর্শন করেন গ্যালারির দিকে।

এনজো যখন গোল করলেন, ম্যাচ ঘড়ির সময় ৫৪ মিনিট। চেলসি এগিয়ে যায় ৩-০ ব্যবধানে। এই অবস্থায় কেন এমন উদযাপন আর্জেন্টাইন তরুণের? আসলে তিনি প্রশ্নের জন্ম দেননি, বরং উত্তর দিয়েছেন অনেক কিছুর। এই একটি গোল দিয়েই নিন্দুক-সমালোচকদের দিয়েছেন কড়া জবাব।

প্রথমে দলীয় খেলার দিকে তাকানো যাক। অর্থের ঝনঝনানিতে তারুণ্যনির্ভর দল গড়েছে চেলসি। কিন্তু টাকার অঙ্কের সঙ্গে তাদের মাঠের পারফরম্যান্স মেলানো যাচ্ছে না। প্রিমিয়ার লিগে তাদের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ২৩ ম্যাচ শেষে জয়ের চেয়ে হারের সংখ্যাই বেশি। ৯ জয়ের বিপরীতে হেরেছে ১০ ম্যাচে। সবশেষ দুই ম্যাচে অবস্থা আরও বেশি শোচনীয়। লিভারপুলের কাছে ৪-১ গোলে হারের পর ঘরের মাঠে উলভারহ্যাম্পটনের কাছে ধরাশয়ী ৪-২ গোলে।

স্টামফোর্ড ব্রিজের এই ম্যাচের পর থেকেই সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে চেলসির ওপর দিয়ে। লিগ টেবিলে ১১ নম্বরে থাকায় সামনের মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার সম্ভাবনার নিভু নিভু আলোয় জ্বলছে। ফলে কোচ মাউরিচিও পোচেত্তিনোর পদত্যাগের দাবি তুলেছেন অনেকে। এই অবস্থায় চলতি প্রিমিয়ার লিগে ফর্মের তুঙ্গে থাকা অ্যাস্টন ভিলার মাঠে গিয়ে দাপুটে পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে স্বস্তির হাওয়া নিয়ে এসেছে ব্লুদের জন্য। সেই জয়ের পথে ফ্রি কিক থেকে চোখ ধাঁধানো গোল করার পর এনজোর বাধভাঙা উল্লাস তো স্বাভাবিকই!

এবার ‘ব্যক্তিগত’ এনজোর দিকে নজর দেওয়া যাক। সব বিশ্বকাপেই নতুন তারকার সন্ধান পায় ফুটবল বিশ্ব। ২০২২ বিশ্বকাপের সেই তারকা এনজো। বেনফিকায় খেলা এই মিডফিল্ডারকে তখন কজনই-বা চিনতেন! কিন্তু কাতার বিশ্বকাপ তার জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের নজরে পড়ে। বয়স কম হওয়ায় উঠতে থাকে চড়া দাম। কাতার বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতা এই তারকাকে পাওয়ার দৌড়ে জয়ী হয় চেলসি। ব্রিটিশ ট্রান্সফারের রেকর্ড গড়ে ১০৬.৮ মিলিয়ন পাউন্ডে বেনফিকা থেকে স্টামফোর্ড ব্রিজে ঠিকানা গড়েন এনজো।

মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে নিয়ে আসায় স্বাভাবিকভাবেই তার ওপর প্রত্যাশার চাপ তৈরি হয়। সেই চাপেই কিনা নিজের সেরাটা দিতে পারছিলেন না। মাঝেমধ্যে জ্বলে উঠলেও বেশিরভাগ ম্যাচেই নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন। দলের ব্যর্থতায় আত্মবিশ্বাসও ঠেকেছিল তলানিতে। নিন্দুকেরা সুযোগ পেয়ে যায়। আর্জেন্টাইন তারকা বিদ্ধ হতে থাকেন সমালোচনার তীরে। মুখে নয়, ফ্রি কিক থেকে দুর্দান্ত গোল করে সেই সব নিন্দুকদেরই জবাব দিয়েছেন জার্সি খোলা উদযাপনে।

এই উদযাপনের আরেকটি দিক সামনে আনা যেতে পারে। দলের পারফরম্যান্স খারাপ, নিজেও পারছেন না কিছু করতে, এই অবস্থায় এনজোর চেলসি ছাড়ার গুঞ্জন ছড়ায়। গত বছরই সাড়ে আট বছরের চুক্তিতে তিনি নাম লিখিয়েছেন ইংলিশ ক্লাবটিতে। তারপরও দানা বাঁধতে থাকে তার ক্লাব ছাড়ার গুঞ্জন। যদিও তার এজেন্ট উরিয়েল পেরেজ উড়িয়ে দিয়েছেন গুজব। মাদ্রিদভিত্তিক ক্রীড়া দৈনিক এএস-কে তিনি বলেছেন, ‘তার (এনজো) ছেড়ে যাওয়ার কোনও চিন্তা-ভাবনা নেই। এই প্রজেক্ট সম্পর্কে তার ধারণা পরিষ্কার।’

পেরেজের বক্তব্য আরও স্পষ্ট হয়েছে এনজোর উদযাপনে। ফ্রি কিক থেকে গোল করার পর তার যে উচ্ছ্বাস-উল্লাস, তাতে বুঝে নিয়ে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, চেলসিতে সুখেই আছেন এনজো।

যদিও তার বুনো উল্লাসের মাঝে ক্ষোভ ও রাগের প্রকাশ ছিল। গত কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে হেনস্থার শিকার ও অপমান সহ্য করেছেন, সেটিরই জবাব ছিল তার উদযাপনে। বিষয়টি আরও পরিষ্কার হওয়া যায় চেলসি কোচ পোচেত্তিনোর কথায়, ‘খেলোয়াড়রাও মানুষ, তারা রোবট নয়। তাদেরও অনুভূতি আছে। এখন তো চাইলেই কাউকে অপমান করা যায়। এই সব পরিস্থিতি অবশ্যই আমাদের রাগান্বিত করে। আর এগুলো হওয়াও অন্যায়। এনজো দেখিয়ে দিয়েছে কেন সে এখানে আছে। একইসঙ্গে দেখিয়ে দিয়েছে তার গুণমান। সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।’

এনজো কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা উদযাপন করেছেন মেসির সঙ্গে। সেই মেসির ঢংয়েই এবার করলেন গোল উদযাপন। তাতে দম্ভ যেমন আছে, তেমনি আছে সমালোচনার কড়া জবাব।

ইত্তেফাক/জেডএইচ