বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

আহমেদ রুবেল-এর বিদায় এবং...

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:২০

রোগে, শোকে ভুগে করুণ দিনাতিপাত তাকে করতে হয়নি! চিকিত্সা বা কোনো কারণে অর্থ সাহায্যও চাইতে হয়নি তাকে। দিব্যি সুস্থ মানুষ, নিজেরই অভিনীত ‘পেয়ারার সুবাস’ সিনেমার প্রিমিয়ারে যোগ দিতে এসেছিলেন। রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সের লিফটে উঠেই অজ্ঞান হয়ে যান। সঙ্গে থাকা চলচ্চিত্র নির্মাতা নুরুল আলম আতিক ও সঙ্গীরা তড়িঘড়ি করে নিয়ে যান স্কয়ার হাসপাতালে। ততক্ষণে তিনি চলে গেছেন জাগতিক সকল সুবাসের ঊর্ধ্বে। চিকিত্সকরা ঘোষণা দিলেন, আর বেঁচে নেই আহমেদ রুবেল।

মঞ্চ নাটক দিয়ে অভিনয়ে যাত্রা করা জাঁদরেল এক অভিনেতা চলে গেলেন সঙ্গী-সাথীদের ভিড়ে নীরবে, গোপনে চিকিত্সাশাস্ত্রের ভাষায়, হূদযন্ত্র বিকল হয়েছিল ভরাট কণ্ঠের জন্য প্রখ্যাত এই অভিনেতার। তার প্রয়াণ নিমিষেই শোক নামিয়েছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, সারাদেশে অভিনয়প্রেমীদের অন্তরে। চারদিকে আজ আহমেদ রুবেলকে নিয়ে স্মৃতিচারণের সুবাস বইছে। 

গত ৭ ফেব্রুয়ারি বুধবার, সন্ধ্যা ৫টা ৫৮ মিনিটে পরপারে পাড়ি জমান আহমেদ রুবেল। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৫ বছর। ১৯৬৮ সালের ৩ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের রাজারামপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আহমেদ রাজিব রুবেল ওরফে আহমেদ রুবেল। শো মাস্ট গো অন বলে একটা ব্যাপার আছে—ব্যান্ড লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চু ভাই মারা গেলেন যেদিন সেদিন বগুড়ায় ছিল বিশাল কনসার্ট। লোকে যখন ভাবছিলেন বাচ্চুর মৃত্যুর দিনটাতেও গাইতে হবে জেমসকে, তখন গিটার কাঁধে তুলে নিয়ে মঞ্চে উঠে জেমস যা করেছিলেন তা ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা বাংলাদেশ। জেমস আর তার গিটারের কান্নার সেই ভিডিওটি দেখলে আজও হু হু করে কান্না আসে আমার। সেদিন তিনি আইয়ুব বাচ্চুর স্মরণে আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘বাচ্চু ভাই, আপনি সবসময় বলতেন যাই হোক না কেন দ্য শো মাস্ট গো অন। আমরা গাইছি বাচ্চু ভাই, আপনি শান্তিতে শুনুন। একইভাবে যখন আহমেদ রুবেল হাসপাতালে নিথর দেহ নিয়ে শুয়ে আছেন—তখন স্টার সিনেপ্লেক্সে চলেছে ‘পেয়ারার সুবাস’ সিনেমার পূর্ব নির্ধারিত প্রিমিয়ার শো। সেখানে সবাই অশ্রুসিক্ত হয়ে আহমেদ রুবেলকে স্মরণ করেছেন, তাকে হারানোর কাঁচা শোক বুকে নিয়ে চোখ মুছেছেন। পেয়ারার সুবাস ছবিটাও তাকে উত্সর্গ করা হয়েছে। ছবির কর্তৃপক্ষ চাইছিলেন শোটা বাতিল হোক। কিন্তু উপস্থিত দর্শক ও সাংবাদিকদের পরামর্শে তারা সিনেমার প্রদর্শনী করেন। চিরায়ত সেই—দ্য শো মাস্ট গো অন, এটাই প্রমাণ হলো।

প্রিমিয়ার অনুষ্ঠানে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে জয়া বললেন, ‘আমরা শো বাতিল করছি না, আমাদের নির্মাতার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আর আমার মনে হয় রুবেল ভাইও সেটাই চাইছেন, সম্ভবত তিনি এখানেই আছেন! কারণ তার মনটা এখানেই পড়ে আছে। তিনিও চাইবেন যে, ছবিটি সবাই দেখুক। কাজের মাধ্যমেই তো বেঁচে থাকা। আর এভাবেই তাকে স্মরণ করতে চাই। রুবেল ভাই আছেন আমাদের এখানে, নিশ্চয়ই আমাদের সঙ্গে ছবিটি দেখবেন।’

তাকে শিল্পীদের শেষ শ্রদ্ধায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘অত্যন্ত অকালে চলে গেলো রুবেল। অভিনয়শিল্পে তার আরো অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। ঢাকা থিয়েটারের অনেকে অকালে চলে গেছেন, তার মধ্যে হুমায়ুন ফরীদি, সেলিম আলদীনও আছেন। আমরা সবাইকে স্মরণ করি। আমার নির্মিত ‘গেরিলা’ ছবিতে শহীদ আলতাফ মাহমুদের চরিত্রে অভিনয় করেছিল রুবেল। সেই স্মৃতিগুলো আজও মনে ভাসে। এত দারুণ অভিনয় করেছিল যে আলতাফ মাহমুদ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিলেন।’

অকাল প্রয়াণ শব্দটা হয়তো পুরো সত্য না। মৃত্যু অবধারিত। তবে মানুষের বিদায়ের প্রক্রিয়া হয় ভিন্ন ভিন্ন। সেক্ষেত্রে আহমেদ রুবেলের এই কাজের ভেতরে থাকতে থাকতেই চলে যাওয়াটাও তার কলিগদের কাছে হোঁচট খাওয়া দাগের মতো, ক্ষতের মতো!

লেখক: নাট্যকার, গীতিকার ও সংবাদকর্মী।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন