বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

মেঘ কী বিচার দেখে যেতে পারবে? 

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২২:২৫

মালিবাগের কলেজ ছাত্রী রুশদানিয়া ইসলাম বুশরা হত্যার ১৬ বছর পর ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত থেকে সব আসামি খালাস পেয়েছিল। ওই রায়ের পর তার মা লায়লা ইসলাম তখন বলেছিলেন, ‌‘এখন মনে হয়, বুশরা বলতে কেউ জন্মগ্রহণই করেনি। বুশরা নামে কেউ ছিল না, কেউ খুনও হয়নি।’ 

আর এই সময়ে এক দশক পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যখন বলেন, ‘সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রয়োজনে ৫০ বছর সময় দিতে হবে।’ এর প্রতিক্রিয়ায় সাগরের মা সালেহা মুনির বলেন, ‘৫০ বছর পর তো আমরা, হত্যাকারীরা—কেউই বেঁচে থাকবো না। তখন এই বিচার কার হবে? কার জন্য হবে? কে দেখবে?’

৪৮ ঘণ্টা থেকে ৫০ বছর 

৪৮ ঘণ্টা থেকে এক সপ্তাহ। এক সপ্তাহ থেকে এক দশক। তারপর এখন ৫০ বছরের তাগিদ। আমরা জানি না, তারপর শতাব্দির প্রশ্ন আসে কি-না। তাহলে বিচার আর ন্যায়বিচার এই দেশে কি এক অধরা বিষয়ে পরিণত হলো?

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি সাংবাদিক দম্পতি খুন হয়েছিলেন ঢাকায় তাদের পূর্ব রাজাবাজারের বাসায়। তখন তাদের সঙ্গে ছিলেন—তাদের একমাত্র শিশুপুত্র মেঘ। হত্যার পর তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাগর-রুনির হত্যাকারীরা আইনের আওতায় আসবে।’

এর কয়েকদিন পর সে সময়ের পুলিশ প্রধান হাসান মাহমুদ খন্দকার মামলার তদন্তে অগ্রগতির কথা বলেন। হত্যাকাণ্ড মামলার তদন্তের কয়েকদিন পরই তেজগাঁ থানা পুলিশ থেকে ডিবিতে চলে যায়। আর ওই বছরের ১৮ এপ্রিল ডিবির তখনকার উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম হাইকোর্টে হাজির হয়ে এক মাসের মাথায় তদন্তে ব্যর্থতা স্বীকার করে তদন্তের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। আর ওইদিনই আদালত তদন্তের দায়িত্ব দেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব)। র‌্যাব এক যুগ ধরে এই মামলার শুধু তদন্তই করছে।

দশক কেটে গেছে র‌্যাবের তদন্তের নামে

তদন্তে র‌্যাব ১০৭ বার সময় নিয়েছে এ পর্যন্ত। কিন্তু তদন্তে তারা কিছু পেলো কি পেলো না—তা জানাচ্ছেন না আদালতকে। আদালতও খুশি মনে সময় দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মনেও কি তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন জাগে না? তারা যেন বসেই থাকেন নতুন তারিখে র‌্যাবকে সময় বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এখন র‌্যাবের সময় চাওয়া আর আদালতের সময় দেওয়া—এটাই হলো এখন সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত উপাখ্যান। মাঝে মাঝে তদন্ত কর্মকর্তা অবশ্য বদল হয়। সেটা আরো ভালো তদন্তের জন্য এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। সেটা হয় তদন্ত কর্মকর্তা বদলির কারণে। নিয়মমতে আরেকজনকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে হয়, তাই দেওয়া হয়।

এখন তদন্ত কর্মকর্তা কে তা জানাও দুষ্কর। তদন্ত অগ্রগতি জানতে চাইলে প্রতিবছরই তোতা পাখির মতো একই কথা বলে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখা সাংবাদিকদের। তদন্ত কর্মকর্তা কোনো কথা বলেন না।

র‌্যাব এ পর্যন্ত আটজনকে সন্দেহজনকভাবে আটক করলেও তারা সাগর-রুনি হত্যার সঙ্গে জড়িত—তা কিন্তু বলছে না। তাদের সবাই ওই কারণে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ছে। র‌্যাব আবার মাঝে দুই বছর কাটিয়েছে ডিএনএ টেস্ট নিয়ে। আর এই কাজে তারা যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত গিয়েছে। কিন্তু তার ফলাফলও শূন্য। কারণ তারা আলামত থেকে দুইজনের ডিএনএ প্রোফাইল পেয়েছে। আর তার সঙ্গে তারা আটক করা আটজনসহ ২৫ জনের ডিএনএ ম্যাচ করে কারুর সঙ্গে মিল পায়নি। এখন মনে হচ্ছে—সেটা পেতে র‌্যাবকে ১৭ কোটি মানুষের ডিএনএ টেস্ট করতে হবে।

এই সব দেখে মনে হচ্ছে—এই হত্যা মামলাটির তদন্ত আসলেই তারা করছে কি-না?

কেউ কেউ তদন্ত সংস্থা পরিবর্তনের দাবি করছেন। এরমধ্যে সাংবাদিক নেতারাও আছেন। কিন্তু সাগর-রুনির পরিবারের সদস্যরা সেটা বলছেন না। দুই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছ যে, তারা সন্দিহান যে সরকার এই মামলার তদন্ত আদৌ চান কি-না। তারা মনে করেন, সরকার চাইলে এই মামলার তদন্ত হবে, খুনিরা চিহ্নিত হবে। আইনের আওতায় আসবে। সরকার না চাইলে হবে না। তাই সরকার সঠিক তদন্ত না চাইলে তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করে কোনো লাভ নাই।

সাগরের মা সালেহা মুনির গত সপ্তাহেই আমাকে বলেছেন, ‘তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করে কোনো লাভ হবে না। কারণ, সরকার চায় না এর তদন্ত হোক। চাইলে এতদিনে খুনিরা ধরা পড়তো, বিচারের মুখোমুখি হতো। আমি এখন আল্লাহর কাছে বিচার চাই। এখানে বিচার কার কাছে চাইবো? এই সরকার বিচার করবে না।’

দায়িত্ব কি সময় পার করা?

সাগর-রুনি দুইজনের সঙ্গেই আমি একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। শুরু থেকেই এই মামলা নিয়ে আমি বেশ কিছু প্রতিবেদন করেছি। মামলার তদন্তের গতিপ্রকৃতি খেয়াল করেছি। তাতে আমার মনে হয়েছে যে, এটা জটিল প্রকৃতির কোনো মামলা নয়। এই মামলায় অপরাধীদের চিহ্নিত করা জটিল কোনো কাজ নয়। আমাদের পুলিশ, র‌্যাব বা অন্য কোনো তদন্ত সংস্থার এটা তদন্ত করে অপরাধীদের চিহ্নত করার যথেষ্ট যোগ্যতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আছে। তারা শুরুতে সঠিক পথেই তদন্ত নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দ্রুতই তারা কোনো ইশারায় বিরত হয়ে গেছেন।

পুলিশেরই একটি তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ভিন্ন খাতে তদন্ত প্রবাহিত হয়ে যাওয়া একটি মামলার তদন্ত সঠিকভাবে করে আসামীদের আইনের আওতায় এনেছে। ৩৫ বছর পর আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি সেই সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার রায়। ১৯৮৯ সালে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত একজন আবাসন ব্যবসায়ী মারুফ রেজা ছিলেন তখনকার এরশাদ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হসানের ভাগ্নে। ফলে তখন ওই মামলার সঠিক তদন্ত করা যায়নি। মারুফ রেজাকে আসামিও করা যায়নি। কিন্তু এরশাদ জামানার অবসানের পর সময় লাগলেও পুলিশই আবার সঠিক তদন্ত করেছে। মারুফ রেজাসহ জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করেছে।

কেন ব্যর্থতা স্বীকার করে না?

সাগর-রুনি হত্যার এক মাসের মাথায় ডিবি আদালতে হাজির হয়ে তদন্তে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে তদন্ত থেকে অব্যাহতি নেয়। কিন্তু র‌্যাব ১০ বছর ধরে তদন্ত করে, ১০৭ বার সময় নিয়েও ব্যর্থতা স্বীকার করছে না। তারা তদন্ত প্রতিবেদনও দিচ্ছে না, আবার ব্যর্থতা স্বীকার করে তদন্ত থেকে নিজেদের সরিয়েও নিচ্ছে না। এটা আমার কাছে খুবই রহস্যময় মনে হয়। তারা কি তাহলে তদন্তের নামে সময় কাটানোর দায়িত্ব পেয়েছেন? তাদের এই সময় কাটানোর দায়িত্ব কে দিয়েছে? তাদের এই এক যুগ সময় পার করার জন্য আদালত কোনো ভর্ৎসনা করেছেন বলেও শুনিনি। আর তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। উল্টো আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এখন তাদের প্রয়োজনে ৫০ বছর সময় দিতে চাইছেন। কিন্তু আইনে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ করার বাধ্যবাধকতা আছে।

আমার মাথায় তাই কিছু প্রশ্ন জাগছে-

ক. ১০ বছর আগে হত্যাকাণ্ডের পরদিন সকালেই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার কথা তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলোছিলেন কিসের ভিত্তিতে?

খ. এক সপ্তাহের মধ্যে তখনকার আইজিপি তদন্তে অগ্রগতির যে খবর দিয়েছিলেন। তা কি সান্ত্বনামূলক ছিলো?

গ. ডিবি রেওয়াজ ভেঙে আদালতে গিয়ে এক মাসের মাথায় কেন ব্যর্থতা স্বীকার করেছিলো?

ঘ. র‌্যাব ১০ বছরেও কেন ব্যর্থতা স্বীকার করে না?

আমার বিবেচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন আন্দাজে কোনো কথা বলেননি। আর তখনকার আইজিপি সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যও কেনো কথা বলেননি। ওই পর্যায়ের মানুষ তথ্যপ্রমাণ হাতে নিয়েই তখন কথা বলেছেন। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে তখন কোনো কারণে সম্ভব হয়নি সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার। তাই তারা ডিবিকে দিয়ে ব্যর্থতা স্বীকার করিয়ে মামলার তদন্ত পাঠিয়ে দেন র‌্যাবের কাছে। তারা দম নেন। পরিস্থতি বুঝতে চেষ্টা করেন। পুরো যখন বুঝে ফেলেন, তখন উল্টো রথ শুরু হয়ে যায়। আর সেই ‘র‌্যাব রথে’ মামলা এখন ঘুমের দেশে।

মেঘ কি বিচার দেখে যেতে পারবে?

এই মামলার অনেক আলামত আছে। অনেক ক্লু আছে। পারসেপশন আছে। এই মামলা নিয়ে কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আছে। একজন প্রভাবশালীর দেশের বাইরে ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত স্বেচ্ছা স্বীকারোক্তি আছে। যেন তিনি পুরো হত্যাকাণ্ড দেখেছেন। তারপরও সহজ মামলাটি দিনে দিনে কেন জটিল করা হলো? এর নেপথ্যে কী কারণ?

আর আমার মনে হয় আরও জটিল করতে করতে এক সময় মামলাটি ‘তদন্ত অযোগ্য’ হয়ে যেতে পারে। কারণ এটা বাঘা বাঘা তদন্তকারীরই কথা যে, মামলার তদন্তে সময় যত বেশি লাগবে, মামলা ততো দুর্বল হবে। আলামত নষ্ট হবে। সাক্ষী পাওয়া যাবে না। আসামিরা সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাবে। মামলার তদন্তে দেরী করা মানে হলো, আসামিদের সুবিধা করে দেওয়া। আর শেষ পর্যন্ত যদি আসামিদের বিচারের মুখোমুখিও করা হয়, তখন মামলা প্রমাণ কঠিন হয়। আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।

সাগর-রুনির সন্তান মেঘের বয়স এখন ১৭ বছর ছয় মাস। বাবা-মা নিহত হওয়ার সময় তার বয়স ছিলো সাড়ে চার বছর। রুনির মা নুরুন্নাহার মির্জা মারা গেছেন ২০২২ সালে। সাগরের মা সালহা মুনির অসুস্থ। সাগরের মা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তার কথা, ‘এই জীবনে আমার ছেলে আর ছেলের বউ হত্যার বিচার হয়তো আর দেখে যেতে পারবো না।’

কিন্ত এখন প্রশ্ন সাগর-রুনির সন্তান মেঘ কি বিচার দেখে যেতে পারবে? 

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের। 

ইত্তেফাক/ডিডি