বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১১ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ভাষা মহান স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ দান

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:১০

মহান রব্বুল আলামিনের অসংখ্য নেয়ামতের মধ্যে ভাষা উল্লেখযোগ্য। ভাষা ছাড়া মানুষের জীবন অচল। সব জাতির মাতৃভাষা আল্লাহ তাআলার দান। মানুষের যতগুলো জন্মগত অধিকার রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে মাতৃভাষার অধিকার। পৃথিবীতে অসংখ্য জীবজন্তু রয়েছে। তারা নিজ নিজ ভঙ্গিমায় মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে, কিন্তু কেবল মানবজাতিই অর্থবোধক ধ্বনিসমষ্টি বা ভাষার মাধ্যমে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। মানুষকে আল্লাহ সামাজিক জীব করে সৃষ্টি করার কারণে সমাজে পারস্পরিক ভাবের আদান-প্রদানের প্রয়োজন পড়ে এবং এর তাগিদেই ভাষার সৃষ্টি হয়েছে।

কোনো জাতির ভাষা দ্বারা তার সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিচয় মেলে। এজন্য মানব সমাজে ভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আর এ কারণেই মহান রব্বুল আলামিন মানব জাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)কে সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন ভাষার মাধ্যমে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিক্ষা দিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।’ (সুরা আর রহমান :৩-৪)। পৃথিবীতে মানব বংশের বিচিত্রতা এবং মানুষের বৈচিত্র্যময় রং, রূপ, দেহসৌষ্ঠবের পার্থক্য যেমন মেনে নিতে হয়, তেমনি তাদের ভাষার পার্থক্যও মেনে নিতে হয়। ভাষাকে আল্লাহ তাআলার মহান সত্তাকে চেনার, জানার ও তার বিশাল কুদরতকে বোঝার নিদর্শন বলা হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘এবং তার নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। অবশ্যই এতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন।’ (সুরা রুম :২২)। মাতৃভাষা যে আল্লাহ প্রদত্ত জন্মগত অধিকার, এই আয়াত তার প্রমাণ বহন করে। ইসলাম নির্দিষ্ট কোনো এলাকার ভাষাভাষী মানুষের ধর্ম নয়; বরং গোত্র-বর্ণনির্বিশেষে সব ভাষাভাষী মানুষের ধর্ম।

হজরত আদম (আ.)-এর ভাষা কী ছিল—এ বিষয়ে মতদ্বৈধতা ও অস্পষ্টতা থাকলেও তার ভাষা ছিল এক, কিন্তু স্থান-কাল-পাত্রভেদে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভাষার উত্পত্তি ঘটেছে। প্রত্যেক জাতির জন্য আল্লাহ তাআলা স্বীয় পয়গাম বান্দাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য নবি ও রসুলের এক সুমহান ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর নানা দেশে নানা ভাষাভাষী মানুষের কাছে ১ লাখ বা ২ লাখ ২৪ হাজার নবি-রসুলের এক মহাসমারোহ ঘটেছে। আর প্রত্যেক নবি ও রসুলের ওপর ওহি পাঠানো হয়েছে তার স্বগোত্রীয় ভাষার মাধ্যমে। যুগে যুগে বিভিন্ন জাতির কাছে প্রেরিত সব নবি-রসুল নিজ নিজ উম্মতকে যে ওহির বাণী শুনিয়েছেন, তা ছিল তাদের মাতৃভাষা। মহান রব্বুল আলামিন বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যেন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।’ (সুরা ইবরাহিম :০৪)।

আমাদের মহান আদর্শ ও মানব জাতির পথনির্দেশক মহানবি (স.) ছিলেন স্বীয় মাতৃভাষায় অতুলনীয়। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে দান করা হয়েছে সর্বমর্মী বচন।’ (মুসলিম :৫২৩)। কাব্যানুরাগী আরব সমাজে আবির্ভূত রসুল (স.) ছিলেন আরবদের সবচেয়ে সুন্দর এবং বিশুদ্ধভাষী। তিনি মাতৃভাষা শুদ্ধ ও সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতেন। তাই মাতৃভাষা শুদ্ধভাবে বলা আমাদের নবির সুন্নত। সুতরাং যে কোনো জাতির মাতৃভাষা অশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা সুন্নতের পরিপন্থি।

মহানবি (স.) হলেন আরবিভাষী। মাতৃভাষাকে তিনি এত বেশি ভালোবাসতেন যে, তিনি নিজেই বলেছেন, আমি তিনটি কারণে আরবিকে ভালোবাসি। তন্মধ্যে একটি হলো মাতৃভাষার কারণে। রসুল (স.)-এর মাতৃভাষা আরবি বলেই মহান রব্বুল আলামিন কুরআনের ভাষা হিসেবে মনোনীত করেছেন আরবিকে। যেন আরব সমাজের প্রত্যেক মানুষ কুরআনের বাণী সহজেই অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে নবি! কুরআনকে আমি তোমার নিজের ভাষায় সহজ করে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। (আদ দোখান: ৫৮)।

ইসলাম এভাবেই নিজ মাতৃভাষাকে যে কোনো বিদেশি ভাষার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। কোনো ভাষারই একক কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব হলো উক্ত ভাষার উদীয়মান কীর্তিতে। মন্দ ভাবের পরিচয় ভাষার পরিচয় নয়। আরবিতে মন্দ ভাবও প্রকাশ করা সম্ভব। ইসলাম বিজয়ের পূর্বে লাত, মানাত, উজ্জার স্তূতিগান গেয়ে নির্জলা শিরক চর্চা হতো এবং অশ্লীল ভাষায় কবিতার চর্চা হতো আরবিতে। আবার এই আরবিতেই তাওহিদি বিপ্লব ঘটেছিল। এখনো আরবি ভাষায় অনৈসলামিক ভাবধারা চালু আছে। সুতরাং বলা যায়, ভাষার জন্য ইসলাম নয়, বরং ইসলামের জন্যই ভাষা। ইসলাম আরবি ভাষার কাছে ঋণী নয়, রবং আরবি ভাষাই ইসলামের কাছে ঋণী। ইসলামের উদীয়মান কীর্তিতেই আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব বেড়েছে। সুতরাং ভাষার কোনো দোষ নেই, বরং এই বৈচিত্র্যময় বিপুল বিশ্বে বিভিন্ন জানপদে নানান ভাষা, বর্ণ-গোত্রে বিভক্ত মানুষ আল্লাহর অসীম কুদরত ও মহান তাত্পর্যময় শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।

মাতৃভাষা মানুষের জীবনে কত বড় গুরুত্বপূর্ণ, সেই দিকের প্রতি লক্ষ্য রেখে মনীষীরা মহামূল্যবান উক্তি প্রদান করেছেন। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন বলেন, ‘প্রত্যেকেরই শিক্ষার মাধ্যম তার মাতৃভাষা হওয়া উচিত। অপর ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদান অসম্পূর্ণ শিক্ষারই নামান্তর।’ সৈয়দ আবুল হাসান আলি নদভি (রহ.) বলেন, ‘কোনো দেশে দিনি খেদমত করতে অগ্রহী ব্যক্তিকে সে দেশের মানুষের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বোধ পূর্ণ মাত্রায় আয়ত্ত করতে হবে।’ হজরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) তার এক ছাত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘যদি হিন্দুস্তানে দিনি খেদমত করতে চাও, তবে উর্দু ভাষায় যোগ্যতা অর্জন করো।’ এমনি আরো অসংখ্য উক্তি পাওয়া যায় মাতৃভাষার সপক্ষে। সুতরাং, মাতৃভাষার প্রতি আমাদের প্রেম ও ভালোবাসা থাকতে হবে একান্ত করে।

লেখক: প্রিন্সিপাল, শ্যামপুর, কদমতলী রাজউক মাদরাসা, ঢাকা

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন