বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১১ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

তবলিগ ও আল-কুরআন

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০৬

পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলোর প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করলে আমরা দাওয়াত ও তবলিগের গুরুত্ব ও তাত্পর্য উপলব্ধি করতে পারব। উদাহরণস্বরূপ :(১) আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সত্ কাজের নির্দেশ দান করবে, অসত্ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখবে। (০৩:১১০) (২) তিনি আরো ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একদল থাকতে হবে, যারা ভালো কাজের দিকে আহ্বান করবে এবং সত্কর্মের নির্দেশ দেবে ও অসত্কর্মে নিষেধ করবে; আর এরাই সফলকাম। (০৩:১০৪) (৩) মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কে উত্তম, যে (মানুষকে) আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, নেক আমল করে এবং বলে, আমি তো অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।’ (৪১:৩৩) (৪) তিনি আরও বলেন, ‘আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, কারণ উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে।’ (৫১:৫৫) (৫) তিনি আরো বলেন, ‘আর আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে নামাজের আদেশ দিন এবং তাতে নিজেও অবিচল থাকুন।’ (২০:১৩২)

উপরিউক্ত সব আয়াত থেকেই আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, কল্যাণের দিকে ডাকা, সত্ কাজে আদেশদান, অসত্ কাজে নিষেধ করা, নামাজের নির্দেশদান ইত্যাদি যা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—এ সবই প্রকারান্তরে ‘দাওয়াত ও তবলিগ’-এর অন্তর্গত। উল্লেখ্য, ব্যক্তি ও অবস্থাভেদে ‘সত্ কাজের আদেশ ও অসত্ কাজে নিষেধ’-এর দায়িত্ব অর্থাত্ ‘তবলিগ’ করা ফরজ। (আহসানুল ফাতাওয়া:খ-১, পৃ-৫১২) এ ‘ফরজ’ মৌলিক বিবেচনায়, অর্থাত্ সত্য-সঠিক ধর্ম ‘ইসলাম’, বিশ্বমানবতার জন্য বিশ্বপ্রভুর একমাত্র মনোনীত জীবনব্যবস্থা, তিনি তা মহাপ্রলয় পর্যন্ত বাকি রাখবেন, অক্ষুণ্ন রাখবেন এই তবলিগের মাধ্যমেই। সুতরাং তা ফরজ হওয়াই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। তবে অবস্থাভেদে উক্ত দায়িত্ব পালনে তারতম্য হতে পারে যেমন—ফরজের তবলিগ ফরজ, ওয়াজিবের তবলিগ ওয়াজিব, সুন্নাতের তবলিগ সুন্নাত ও নফলের তবলিগ নফল। একইভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে যিনি যতটুকুর সহীহ জ্ঞান রাখেন, তার ওপর ততটুকুর তবালগ করা জরুরি; এবং সামর্থ্য অনুসারে নিজের অধীনস্থ, আওতাভুক্ত বা আওতা-বহির্ভূত ক্ষেত্রে ও পরিবেশের বিবেচনায় ‘তবলিগ’ ফরজও হতে পারে, ওয়াজিবও হতে পারে, সুন্নাত-মুস্তাহাবও হতে পারে। আবার সহিহ জ্ঞান না থাকলে বা যথাযথ পন্থা-পদ্ধতি অজ্ঞাত হলে কিংবা স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনা করার মতো যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা না থাকলে কিংবা হিতে বিপরীত হওয়ার মতো পরিবেশ হলে; সেক্ষেত্রে বরং তবলিগ না করাই বিধেয় হবে।

‘ফরজ তবলিগ’ দুই প্রকার। যথা : (১) ‘ফরজে আইন’ ও (২) ‘ফরজে কিফায়া’। ‘ফরজে আইন তবলিগ’ হচ্ছে ঐ তবলিগ, যা প্রত্যেক মুসলমানকে করতে হয়। আর তা প্রযোজ্য হয়ে থাকে নিজ অধীনস্থ ও পরিবারস্থদের ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা প্রমুখ অথবা পরিবার-সমাজ, অফিস-আদালত, দেশ-জাতি-রাষ্ট্রের যে যে ক্ষেত্রে তার দায়দায়িত্ব আছে; এবং যেখানে যারা তার অধীনস্থ আছে বা তার নিজের সংশ্লিষ্টতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ‘ফরজে আইন’ প্রযোজ্য হয়ে থাকে। অন্যদিকে ‘ফরজে কিফায়া তবলিগ’ হচ্ছে ঐ তবলিগ, যা সরাসরি উপরিউক্তভাবে ব্যক্তির নিজের ওপর বর্তায় না বটে; তবে পরোক্ষভাবে প্রতিবেশী হিসেবে, সমাজ হিসেবে, স্বজন হিসেবে; দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে সত্ কাজে আদেশ ও অসত্ কাজে নিষেধ তথা তবলিগ করা ‘ফরজে কিফায়া’ হিসেবে প্রযোজ্য ও  দায়িত্বভুক্ত হয়ে যায়; এবং তার প্রয়োজনীয় শক্তি-সামর্থ্যও বিদ্যমান থাকে। গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাচ্ছে, কুরআন ও হাদিসের প্রায় সর্বত্রই ‘সত্ কাজের আদেশের পাশাপাশি অসত্ কাজে নিষেধের নির্দেশ সমান্তরালে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং, ‘অসত্ কাজে নিষেধ’ বাদ দিয়ে কেবল সত্ কাজে আদেশদানের তবলিগ করলেই উক্ত পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ফরজ দায়িত্ব পালিত হয়েছে বলে গণ্য হবে না। দুটি দায়িত্বই পাশাপাশি চালিয়ে যেতে হবে। অবশ্য অসত্ কাজে নিষেধের তবলিগকালীন—‘আপনি মানুষকে আপনার প্রতিপালকের পথে প্রজ্ঞা-কৌশলের মাধ্যমে এবং উত্তম উপদেশ দ্বারা আহ্বান করুন’ (১৬:১২৫)— আয়াতখানার আলোকে নম্রভাবে, দয়াদ্র হয়ে, সংশ্লিষ্টদের কল্যাণ চিন্তায়, কৌশলী পন্থা অবলম্বন করে তবলিগ করতে হবে।

লেখক: মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন