বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১১ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

নিজের বিদ্যাপীঠেও ছাত্রীরা অনিরাপদ!

■ একের পর এক ধর্ষণে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা

■ শিক্ষকরাও জড়িত হচ্ছেন যৌন নিপীড়নে

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:০০

দেশে একের পর এক বিদ্যাপীঠে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে ছাত্রীদের অভিভাবক ও সমাজের বিবেকবান নাগরিকদের। একজন পিতা কিংবা মাতা বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে তাদের সন্তানদের শিক্ষাঙ্গনে পাঠায় সুশিক্ষা অর্জন করে দেশের সুনাগরিক হতে। নিজের ও পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে। কিন্তু সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকা অবস্থাতেও তাদের সীমাহীন দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। নিজ প্রতিষ্ঠানেই ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তদের হাতে যৌন নিগ্রহের আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের। এর বাইরে গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও নিজের ছাত্রীদের যৌন হয়রানি করার ঘটনা হরহামেশা ঘটছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাইরে থেকে ঘুরতে আসা নারীরাও ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষকরা পিতার সমতুল্য। কিন্তু বর্তমানে আমরা সব সময় তাদের কাছে ভয়ে থাকি। তারা অনেক সময় অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করে থাকেন। মনের মধ্যে পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়ার ভয় ঢুকিয়ে আকারে-ইঙ্গিতে কিংবা সরাসরি অনৈতিক সম্পর্ক তৈরির প্রস্তাব দেন। কখনো কখনো পীড়াপীড়ি করেন। মোবাইলে উত্ত্যক্ত করেন। কিন্তু আমরা সেগুলো লজ্জায় সবসময় প্রকাশও করতে

পারি না। তার হাতেই আমার পরীক্ষার নম্বর থাকে, ফলাফল থাকে, যেগুলো আমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে। আমি তার বিরুদ্ধে গেলে, মুখ খুলে কারো কাছে প্রকাশ করলে তিনি আমাকে হয়তো নম্বর কম দিবেন, ফেল করিয়ে দিবেন। মনের মধ্যে এমন হয় কাজ করে। তখন এত অসহায় লাগে কাউকে বোঝানো যাবে না

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য একজন শিক্ষার্থী বলেন, গ্রাম থেকে আসা মেয়েরা শহরে এসে অনেক কিছু বুঝতে পারেন না। শিক্ষকদের শুভাকাঙ্ক্ষী ভেবে তারা যেভাবে বলেন, সেভাবেই আমরা কথা শুনি। সেটা শুনতে গিয়েই অনেক সময় বিপদে পড়ি। আমরা চাই শিক্ষকরা আমাদের বিপথে নিয়ে যাবেন না। গ্রামের শিক্ষকদের কাছ থেকে আমার পিতার মতোই স্নেহ পেয়েছি, আমরাও সেভাবে তাদের সম্মান করেছি। শহরে উচ্চশিক্ষার জন্য এসে আমরা এর ব্যতিক্রম দেখতে চাই না। আমরা চাই আমদের নিজের মেয়ের মতোই তারা সবসময় সহযোগিতা করবেন, বিপদে ফেলার চেয়ে বিপদে পড়লে রম করবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর নিরাপত্তাজনিত যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা সবাইকে উদ্বিগ্ন করছে। এই ধরনের পরিস্থিতি কিংবা নারী শিক্ষার্থীর প্রতি সহিংসতা নিরসনে যে ধরনের ভূমিবদ বা ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন তা অপ্রতুল। তিনি বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন ব্যবস্থা বা কমিটি থাকলেও কার্যত তা অকার্যকর। রাজনৈতিক বিবেচনা, সম্পর্কগত বিবেচনা, এলাকাপ্রতি, ভয়ভীতিসহ নানাবিধ কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। ফলে অপরাধীর বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় বাড়ছে এ ধরনের ঘটনা। অর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘটনায় ছাত্রীদের চুপ থাকার সংস্কৃতির কারণে বাড়ছে শিক্ষকদের হাতে যৌন হয়রানির ঘটনা। সাহস করে দুই-একজন মুখ খুললে

একদিন সব যৌন নীপিড়িতদের মুখোশ উন্মোচন হয়ে যাবে। তখন কোনো শিক্ষক আর এমন করতে সাহস পারে না। বিশিষ্টজনেরা বলছেন, প্রশাসন নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনাগুলো হালকা করে দেখছে, নয়তো ক্ষমতাশালীদের কারণেই এসব ঘটনার বিচারকার্যে ধীরগতি থাকে। ফলে এ ধরনের ঘটনা সমাজে ঘটতেই থাকে। যে কারণে কোথাও এখন নিরাপদ নয় নারী। নারী নির্যাতনকারীরা সবসময় ক্ষমতাশীল হয়ে থাকে ফলে দুর্বলরা বিচার পায় না। আমাদের আইনের শাসন আরও স্বচ্ছ ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। অপরাধী কে, এ পরিচয়টা আমাদের ভুলে যেতে হবে। আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে এবং তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে।

অতি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড, নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিযুক্ত অধ্যাপক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঐ শিক্ষার্থীকে অশ্লীল বর্তা পাঠাতেন এবং অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন। এই ঘটনায় ঐ শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ঐ অধ্যাপক ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর দিয়েছেন এমন অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা।

অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বঙ্গবন্ধু ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আখি জামান বলেন, প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো শিক্ষাঙ্গন থেকে ছাত্রী নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ হচ্ছে। এসব শুনে আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি কখন না জানি কেন বিপদে পড়ে। বাড়ির বাইরে তাদের পড়াশোনা করতে পাঠিয়ে এমন ভয়ে থাকতে হবে এটা মোটেও কাম্য নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ছাত্রীর মা বলেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ছাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে না পারে তাহলে ধীরে ধীরে হয়তো অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। কারণ শিক্ষা যেমন একটি মেয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার জীবনের নিরাপত্তা কিংবা সম্ভ্রমও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সিরাজুল ইসলাম নামের আরেক অভিভাবক বলেন, মেয়েকে দূরে পড়তে পাঠিয়ে এসব ঘটনা শুনে চিন্তায় হাইপ্রেসারের রোগী হয়েছি। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যেন ছাত্রীর তাদের নিজ শিক্ষাঙ্গনে নিজের বাড়ির মতোই নিরাপদ বোধ করে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, অনেক প্রতিকূলতা ছাপিয়ে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে, সবক্ষেত্রে সরব পদচারণা, মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব ন্যক্কারজনক ঘটনর প্রভাব পড়ে সব নারী শিক্ষার্থীর ওপর। এ কারণে অনেক সম্ভাবনাময় মেধাবী শিক্ষার্থী পিছিয়ে যাবে বা করে পড়বে উচ্চশিক্ষা থেকে। এই বিষয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুক নাসরীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ উন্নয়নে আরও কাজ করতে হবে। কারো কাছেই যৌন নির্যাতিত হলে চুল থাকা চলবে না। একজন মুখ খুললে তখন অন্যরাও মুখ খুলবে। ধরে ধীরে এই চুপ থাকার সংস্কৃতি' ভেঙে যাবে। কেউ অনৈতিক প্রস্তাব দিলে কিংবা ফাঁদে ফেলতে চাইলে সাহস করে জোরালোভাবেই 'না' বলতে হবে। লজ্জায় গোপন না রেখে নিজের বাবা-মা, কাছের বন্ধুবান্ধব কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে প্রকাশ বদরতে হবে। তাহলে এ ধরনের ঘটনা' একদিন বন্ধ হয়ে যাবে।

ইত্তেফাক/এমএএম