সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

‘বাকশাল ২.০’ প্রতিষ্ঠার পর সাধারণ মানুষ এখন উদ্বাস্তু: রিজভী

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬:৫৪

‘একদলীয় বাকশাল ২.০ প্রতিষ্ঠার পর দেশের সাধারণ মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, দৃষ্টান্তহীন নতুন মডেলের একদলীয় ‘বাকশাল ২.০’ প্রতিষ্ঠার পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও উচ্ছিষ্টভোগী-দালাল ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষ যেন উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। বিরোধীদল নিষ্পেষণ-দলন-গ্রেপ্তার-হত্যা আর সাধারণ জনগণের রক্ত চুষে খাওয়াই এখন সরকারের ব্রত। জনজীবনকে তারা দুর্বিষহ করে তুলেছে। মানুষের জীবনে নেমে এসেছে নাভিশ্বাস দশা।

সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, সম্পূর্ণ একদলীয়-একতরফা ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মসনদের অবৈধ মেয়াদ প্রলম্বিত করে আরও বেপরোয়া হয়ে জনগণের ওপর নতুন মাত্রায় জুলুম চালাচ্ছে ডামি সরকার। মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, জান-মাল, মানবাধিকার, জননিরাপত্তা লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। তাদের অনঢ়তা, একগুঁয়েমি ও বৈরিতার আঘাতে গণতন্ত্র কবরে শাফিত। রাষ্ট্রের পেশীশক্তি দিয়ে বিরোধী দল দমনের অভিনব সব পন্থা বিগত দেড় দশক ধরে অব্যাহত আছে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবেলা করতে গিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বাড়াবাড়ি বলপ্রয়োগ, একই সময় ক্ষমতাসীন দলের পাল্টা কর্মসূচি সংঘাতময় বিভিষিকার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

দেশে স্বস্তিকর জীবন যাপন বলে কিছু নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের ভেতরে বাংলাদেশকে নিপতিত করা হয়েছে। মানুষ আর সইতে পারছে না। অসহায় মানুষের বুকফাটা কান্নার শব্দ এই লুটপাট টাকা পাচারে ব্যস্ত সরকার শুনতে পাচ্ছে না। গ্যাস নাই, চুলা ঠাণ্ডা, রাস্তায় যানজট, বিদ্যুতের সীমাহীন লোডশেডিং, দুর্গন্ধময় ওয়াসার ময়লা পানি, বাজারে আগুন। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সড়কে মৃত্যু, খুন, ডায়রিয়াসহ নিত্যপণ্যের দাম আওয়ামী সিন্ডিকেট লাগামহীন ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে দিয়েছে।

বিএনপি নেতা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ছাত্রলীগ গড়ে তুলেছে নারীর শ্লীলতাহানিসহ সন্ত্রাস আর নৈরাজ্যের অভয়ারণ্য। সকল বিশ্ববিদ্যালয় এখন রক্তাক্ত এবং নারীদের জন্য বিপজ্জনক স্থান। সরকারি দলের প্রশ্রয়ে শহর-নগর-বন্দর-জনপদে দাপিয়ে বেড়ানো কিশোর গ্যাংয়ের ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, হামলা ও খুনাখুনিতে মানুষ আতঙ্কিত। দেশকে পরিণত করা হয়েছে পৃথিবীর এক নাম্বার শব্দ আর বায়ুদূষণের ভাগাড়ে। সব মিলিয়ে কেবল এই রাজধানী ঢাকা নয়, পুরো দেশটাকেই যাতনাময়-বিষাদলোকে পরিণত করেছে ভোট ডাকাতির সরকার।

নিত্যপণ্যের বাজার লুটেরা মাফিয়া-সিন্ডিকেটের হাতে বর্গা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে জনগণ। মাহে রমজানকে সামনে রেখে এখন থেকেই সরকারের সিন্ডিকেট চক্র জনগণের পকেট কাটতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব তো পড়েইনি, উল্টো গত ১০ দিনে রমজানসংশ্লিষ্ট কয়েকটি পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। শুল্ক কমানোর পরে ওই ৪টি পণ্যের দাম কেজিতে ৪০ টাকা কমার কথা, কিন্তু কমেনি তো বটেই বরং এই চারটি পণ্যের দাম কেজিতে ১০/২০ টাকা বেড়ে গেছে। পাইকারি পর্যায়ে প্রতিকেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৩৪ টাকা দরে, যা এক সপ্তাহ আগে ১৩২ টাকায় বিক্রি হতো। এখন খুচরা বাজারে খোলা চিনির কেজি ১৪০ থেকে ১৪৫ এবং প্যাকেটজাত চিনি ১৪৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এখনও সেই দরে কিনতে হচ্ছে চিনি।

রিজভী উল্লেখ করেন, গত সপ্তাহে পাইকারিতে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৬১ টাকা, পাম অয়েল ১৩১ টাকা ও সুপার পাম অয়েল ১৩৪ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন সয়াবিন তেল ১৫৫ টাকা, পাম অয়েল ১৩৪ টাকা ও সুপার পাম অয়েল ১৩৭ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। আর খুচরা বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৭০ থেকে ১৭৩ এবং খোলা তেল ১৫৮ থেকে ১৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পাম অয়েলের লিটার কিনতে হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা দরে। চালের দাম এক আনাও কমেনি, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৭৫ থেকে ৮০, মাঝারি চাল ৫৫ থেকে ৬৫ ও মোটা চালের কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শুল্ক ছাড়ের পর দাম কমার বদলে লাফিয়ে বাড়ছে ছোলার দাম। মাসখানেক আগেও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ছোলার কেজি ছিল ৯০ থেকে ৯৫ টাকা। গত শনিবার মালিবাগ, সেগুনবাগিচা, শান্তিনগর ও কারওয়ান বাজারে ছোলার কেজি বিক্রি হয়েছে ১০৫ থেকে ১১৫ টাকায়। ছোলার মতো অ্যাংকর ডালের চাহিদাও বেশি থাকে রমজানে। এক—দেড় মাসের ব্যবধানে এ জাতের ডালের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। তবে সারা বছরই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় মসুর ডাল। বাজারে এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে আমদানি করা বড় দানার মসুর ডাল এখন ১০০ থেকে ১১০ এবং দেশি মসুর ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উল্লেখ করে বিএনপি নেতা বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বছরের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। কোনো কোনো পণ্যের দাম দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। যেমন গত বছর এই সময়ে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। অর্থাৎ দাম বেড়েছে তিন গুণের বেশি। একই অবস্থা মাংস ও মাছের বাজারেও। কেজি প্রতি ব্রয়লার ও সোনালী মুরগির দাম বেড়েছে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ২১০ থেকে ২২০ টাকা। সোনালি জাতের মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩১০ থেকে ৩৩০ টাকায়। অথচ দুই মাস আগে ব্রয়লারের কেজি ১৮০ ও সোনালি মুরগি ২৮০ থেকে ২৯০ টাকার মধ্যে ছিল। একই সঙ্গে চড়া দামে আদা ও রসুন দুই পদই বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা দরে।

নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেট সরাসরি শেখ হাসিনা নিয়ন্ত্রিত উল্লেখ করে রিজভী বলেন, বিষয়টি বিভিন্ন সময় ইশারা-ইঙ্গিতে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-নেতারা প্রকাশ্যে বলেছেন। ডামি সরকারের বাজার লুটের কারণে আজ জনগণ সর্বশান্ত। বাজারে দ্রব্যমূল্যের আগুনে পুড়ছে সাধারণ মানুষ আর অর্থ বিত্তের পুকুরে সাঁতার কাটছে সরকারের লোকজন।

ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের জড়পদার্থে পরিণত হয়েছেন উল্লেখ করে রিজভী আরও বলেন, যেভাবে চালানো হয় তিনি সেভাবেই চলেন। যে দেশে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের অস্তিত্ব থাকে, সে দেশে উগ্রবাদ খুঁজতে যাওয়া মূর্খের স্বর্গে বাস করা।

ইত্তেফাক/এসকে