বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১১ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

সাকিব-তামিমরা কতটুকু ভুয়া?

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:৪১

ক্রিকেটকে বলা হয় ভদ্রলোকের খেলা। এই খেলায় অংশ নেন ভদ্রলোকেরা। আবার যারা এই খেলা দেখতে আসেন, তারাও ঐ ভদ্রলোক শ্রেণির আওতায় পড়েন। এমন ভাবনা নিয়েই ক্রিকেট তার রূপ-রস দিয়ে সারা বিশ্বকে বিমুগ্ধ করছে। তবে সেখানে পট পরিবর্তনও হয়েছে। যেখানে দগদগে হয়ে আছে সাকিব আল হাসান-তামিম ইকবালের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, মাঠের খেলা থেকে সাকিব-তামিম ইস্যু বড় হয়ে উঠছে! বড় করা হচ্ছে। অথচ মাঠের ক্রিকেট সেই দ্বন্দ্বের আড়ালে যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে।

বিপিএলের দশম আসরে সাকিব যখনই বল বা ব্যাট হাতে ২২ গজে এসেছেন, তখনই গ্যালারি থেকে ‘ভুয়া, সাকিব, ভুয়া’ স্লোগান ভেসে এসেছে। তামিমের ব্যাটিং কিংবা আউটের সময়েও এমনটি দেখা গেছে। বাংলাদেশি এই ওপেনারকেও ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানের কবলে পড়তে হয়েছে। সিলেটে খেলাকালীন এমন এক দর্শককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেন তিনি সাকিবকে ভুয়া বলছেন। জবাবে তিনি বলেছেন, সেটি তার ইচ্ছা। মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু খেলার মাঠে, যেটিকে ভদ্রলোকের খেলা বলা হচ্ছে, সেখানে ইচ্ছামাফিক কাউকে হেয় করাটা ঠিক কতটুকু ভদ্রোচিত—এমন বিষয়কে অবশ্যই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো যায়।

বাংলাদেশের ক্রীড়ামোদি দর্শকদের প্রশংসা রয়েছে সারা বিশ্বে। ক্রিকেট কিংবা ফুটবল—সব জায়গায় এ দেশের দর্শক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। কাতারে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের সময়ে ফিফা এমনকি বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনার নজরে এসেছিল এখানকার মানুষের উত্সাহ-উদ্দীপনা-উল্লাসের ছবি। নেট দুনিয়ার কল্যাণে সেটি খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে নিজেদের ঘরে যখন নিজেদেরেই ‘ভুয়া’ শব্দে ভাসতে হয়, তখন সেই সমাদরকেও মলিনতায় গ্রাস করে।

খেলাকে বিনোদনের একটি অংশ বলা হয়। মানুষকে আনন্দ দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য। অথচ সেই খেলাঙ্গনে টেনে আনা হচ্ছে কারো কারো ব্যক্তিগত জীবন কিংবা দ্বন্দ্বকে। উদ্দেশ্যের জায়গা থেকে সরে গিয়ে আলোচনার টেবিলে তোলা হচ্ছে ভিন্ন ঘটনা। বিপিএলের ৩৮তম ম্যাচে ফরচুন বরিশাল ও রংপুর রাইডার্সের ম্যাচ ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল সাকিব-তামিম ইস্যু। সেটি এতটাই বড় ছিল যে, শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটিও ঢাকা পড়ে গেছে তার ছায়ায়। সেই ছায়া মুশফিকুর রহিমের সংবাদ সম্মেলনেও উঠে এসেছিল। ক্ষোভ প্রকাশ করা ছাড়া আর কোনো উত্তর মেলেনি ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবলের’ কণ্ঠে। বলেছেন, ‘এর আগে কি তামিম সাকিবের বলে আউট হয় নাই বা তামিম সাকিবের বলে ছক্কা মারে নাই? এটা কিছুই না।’

যাদের নিয়ে এত কথা, সেই সাকিব-তামিমও বাংলাদেশের জার্সিতে যখন খেলেছেন, তখন ভুলে গেছেন সব ভেদাভেদ। একসঙ্গে উইকেটে থেকে রানও তুলেছেন। দলের জন্য তারা এক হয়েছেন। অথচ ক্ষণে ক্ষণে তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে দ্বন্দ্বের কথা। এঁকে দেওয়া হয়েছে ছেদরেখা। আর সেটিতেই বারবার মলিন হচ্ছে দেশের ক্রীড়াঙ্গন। দুজনেই এই মুহূর্তে ক্রিকেটকেই তুলে ধরছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর উপলক্ষ্য হয়েছেন। তাদের নামে পরিচিত হয়েছে বাংলাদেশ। অথচ তাদেরই শুনতে হচ্ছে দুয়োধ্বনি।

টানা পাঁচ বছর ওয়ানডে ক্রিকেটের সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে ছিলেন সাকিব। বর্তমানে টি-টোয়েন্টির সেরা অলরাউন্ডার তিনি। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত এই সংস্করণে দেশের জার্সিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক তিনি। তিন সংস্করণে রয়েছে ১৪ হাজারের ওপরে রান। তামিমের রান ১৫ হাজারের ওপরে। চলতি বিপিএলে সেরা রান সংগ্রাহদের তালিকায় রয়েছেন তামিম। বেশি পিছিয়ে নেই সাকিবও। আর বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার উইকেট সংগ্রাহকের সেরা তালিকায়ও রয়েছেন। তবু একটি ‘ভুয়া’ শব্দ দিয়েই তাদের বিশেষায়িত করা হচ্ছে। সাকিব এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমি যখন ভুয়া ভুয়া বলি, তখন গ্যালারি থেকে সাকিব সাকিব বলে।’ কেবল হাসি কিংবা আনন্দের মাধ্যমেই সেটি উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তিনি। গ্যালারিতেও এমনটি হলে জন্ম নেওয়া ক্ষুদ্র মলিনতাও দূর হয়ে যাবে পলকেই।

 

ইত্তেফাক/এএম