সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

হেরোইনের ১১ মামলায় জামিন দেওয়া সেই জজকে বদলি

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:৪৭

হেরোইনের ১১ মামলায় জামিন দেওয়া রাজশাহীর জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ জিয়া উদ্দিন মাহমুদকে বিচার কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে প্রত্যাহার করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারি) এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়।

এতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জুডিসিয়াল সার্ভিসের এই সদস্যকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে বদলি করে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত কর্মকর্তা হিসাবে বদলি করা হলো। সংশ্লিষ্ট বিচারককে জেলা ও দায়রা জজ কর্তৃক মনোনীত কর্মকর্তার নিকট ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে বর্তমান পদের দায়িত্বভার অর্পণ করে অবিলম্বে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ দিতে নির্দেশ প্রদান করা হলো।

গত ১ বছরে মাদক হেরোইনের ১১ মামলার আসামিদের জামিন দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন বিচারক জিয়া উদ্দিন মাহমুদ। এসব মামলায় জব্দকৃত হেরোইনের পরিমাণ ছিল সর্বনিম্ন ৫০ গ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত। এই ১১ মামলার মধ্যে এক মামলায় এক আসামির জামিন না মঞ্জুর করেন তিনি। সেই নামঞ্জুরের ৫ সপ্তাহের মধ্যে দিন ধার্য ছাড়াই ওই আসামিকে জামিন দিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি গড়ায় উচ্চ আদালতে।

সেখানে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এফিডেভিট দিয়ে বলা হয়, বিচারক জিয়া উদ্দিন মাহমুদ গোদাগাড়ীর থানার নয় মামলা এবং চারখালী এবং চারঘাটা থানার দুই মামলাসহ হেরোইনের মোট এগারো মামলায় গত এক বছরে আসামিদের জামিন দিয়েছেন। এসব জামিন দেওয়া নিয়ে বিচারপ্রার্থী জনগণের মাঝে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। কিন্তু এই নীতিকে তোয়াক্কা না করেই এই বিচারক একের পর এক হেরোইনের মত মাদকের মামলায় জামিন দেন। বিচার আসনে বসে বিচারিক মননের সঠিক প্রয়োগ না করে এভাবে জামিন প্রদান কোনভাবেই কাম্য নয়।

‘কেচোঁ খুড়তে বের হল সাপ’

১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেফতার হন সেতাবুর রহমান ওরফে বাবু। এ ঘটনায় রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় গত বছরের ৩ জানুয়ারি তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। মামলায় সেতাবুরের জামিন আবেদন গত ২৬ জুন নামঞ্জুর করেন বিচারক জিয়া উদ্দিন মাহমুদ।

জামিন নামঞ্জুরের আদেশে বিচারক বলেন, নথি পর্যালোচনায় দেখা যায় ঘটনার দিন সাক্ষীদের সামনে আসামির দেহ তল্লাশি করে তার প্যান্টের পকেট থেকে একশত গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এমতাবস্থায় উদ্ধারকৃত মালামালের পরিমাণ, আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ধরণ ও হাজতবাসের মেয়াদ এবং অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় তার জামিন নামঞ্জুর করা হলো। এই আদেশদানের পাঁচ সপ্তাহ পর পহেলা আগস্ট ওই বিচারক আসামির জামিন মঞ্জুর করেন।

আদেশে বিচারক বলেন, আসামির আইনজীবী বলেছেন সেতাবুরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। মানবিক কারণে যে কোন শর্তে জামিন চান। রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ পিপি জামিন বিষয়ে সরাসরি বিরোধিতা করেন নাই। নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, আসামি পুলিশ কর্তৃক ধৃত হয়ে গত বছরের ৩ জানুয়ারি থেকে জেল হাজতে আছে। কেমিক্যাল রিপোর্ট, পিসিপিআর ও আসামির হাজতবাসের মেয়াদসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে জামিন আবেদন মঞ্জুর করা হলো।

বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী। এরপরই ওই জামিন আদেশ বাতিল প্রশ্নে রুল জারি করে হাইকোর্ট। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আসামি সেতাবুরের জামিন বাতিল করে গত ৬ ফেব্রুয়ারি রায় দেয় বিচারপতি এস.এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি মো. আলী রেজার দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ।

রায়ে বিচারপতি কুদ্দুস জামান বলেন, মাদক জাতীয় সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এই মাদকের কারণে ধ্বংস হচ্ছে যুব সমাজ। শুধু ধ্বংসই নয় তারা নানা ধরনের ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। একশত গ্রাম হেরোইনের মামলায় ট্রাইব্যুনালের বিচারক যে প্রক্রিয়ায় আসামিকে জামিন দিয়েছেন তা আইন বহির্ভূত ও অগ্রহণযোগ্য। ভবিষ্যতে মাদকের মামলায় জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে ওই বিচারককে আরও সতর্ক হতে হবে। রায়ে হাইকোর্ট আসামির জামিন বাতিল করে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে ট্রাইব্যুনালের বিচারককে নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ছয় মাসের মধ্যে মামলার বিচার কাজ শেষ করতে বলা হয়। যদি এই সময়ের মধ্যে বিচার কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হন তাহলে কেন উনি ব্যর্থ হয়েছেন তার ব্যাখ্যা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে মামলার সাক্ষীদের ধার্যকৃত দিনে যেন আদালতে উপস্থিতি হন তা নিশ্চিত করতেও রাজশাহীর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এই রায়ের পর জেলা জজ জিয়া উদ্দিন মাহমুদকে বিচার কাজ থেকে সরিয়ে দিল আইন মন্ত্রণালয়। 

ইত্তেফাক/এবি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন