বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মানবঘড়ি

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:০০

দেয়ালের ঘড়িটা আর টিকটিক শব্দ করে না। বেশ কয়েকদিন হলো। বাড়ির অন্য কেউ টের পায়নি। টের পাওয়ার কথাও নয়। কারণ দেয়ালের ঘড়ির প্রতি কারো মনোযোগ নেই। প্রয়োজন পড়ে না, তাই। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকালেই চলমান সময় দেখা যায়। কিন্তু বাড়ির বড়কর্তা বৃদ্ধ সফিউদ্দিন আহমেদের মোবাইল ফোন থাকলেও চোখে মোবাইল ফোনে সময়ের সংখ্যাগুলো ঠিকমতো দেখতে পান না। শুধু কল রিসিভ করে কথা বলতে পারেন। ছেলেকে বলে তিনি এই দেয়ালঘড়িটা লাগিয়েছেন। সময় দেখার জন্য। কয়েকদিন হলো বন্ধ হয়ে আছে ঘড়িটা। ঘড়িটার কী সমস্যা হয়েছে, ছেলে ও বউমাকে দেখতে বলেছিলেন। কিন্তু কেউই সময় করে দেখার সময় পায়নি।

আজ সফিউদ্দিন আহমেদ ঘড়িটা নিজ হাতে নামালেন। ঘড়ির ময়লা পরিষ্কার করলেন। ঘড়ির কাঁটাগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবতে লাগলেন—সেকেন্ড, মিনিট ও ঘণ্টার কাঁটাগুলোর মতো জীবন ঘুরতে ঘুরতে থেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে সেকেন্ড ও মিনিটের কাঁটার মতো নয়, জীবন এখন ঘণ্টার কাঁটার মতো ধীরগতিতে চলছে। ঘড়ি কি তার পূর্বাভাস দিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত ঘড়ির কাঁটাগুলোর মতো যে কোনো মুহূর্তে কি তিনিও থেমে যাবেন! থেমে গেলে দুই পা দিয়ে আর চলতে হবে না, হাত দিয়ে আর খেতে হবে না। মুখ দিয়ে আর ফরমালিনযুক্ত খাবার খাওয়া হবে না। চোখ দিয়ে অন্যায় দেখতে হবে না। কান দিয়ে কটুকথা শ্রবণ করতে হবে না। নাক দিয়ে আর দূষিত অক্সিজেন গ্রহণ করতে হবে না। অন্যদের কাছে আর বোঝা হয়ে থাকতে হবে না।

সফিউদ্দিন আহমেদ এতকিছু ভাবার পর হঠাত্ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার লাইনগুলো গুনগুন করে গাইতে লাগলেন—আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে...।

এর মধ্যে সফিউদ্দিনের নাতনি নাদিমা এসে বলল, ‘দাদাভাই, তুমি গুনগুন করে যে গান গাইছ। গানটা আমার খুবই প্রিয়। আমিও গাইতে পারি। তুমি কি শুনবে আমার কণ্ঠে?’

সফিউদ্দিন নাতনির কথা শুনে বললেন, ‘গানটা এখন তোমার কণ্ঠ থেকে শুনব না। ঘড়িটা পরিষ্কার করি। তার পর আরাম করে তোমার কণ্ঠে এই গান শুনব।’

‘ঠিক আছে দাদাভাই।’ এই বলে নাদিমা চলে গেল অন্য রুমে। তার পর সফিউদ্দিন ভাবছেন, এই বয়সে এখন এই কণ্ঠে এ গান প্রিয় হওয়ার কথা নয়। গানটা ওর কেন প্রিয় হলো! নাদিমা কি তাহলে আমার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। আর আমি দুঃখ-কষ্ট-বেদনা আর অবহেলায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাব। না না এসব আমি কী ভাবছি, এমন চিন্তাভাবনা করাও তো পাপ। পাপের কথা মনে পড়তেই জীবনে যত অন্যায় করেছেন, সে অন্যায়ের কথা মনে পড়তে লাগল। অন্যায়ের কথা মনে করে নিজের মনকে কষ্ট না দিয়ে জীবনে পরোপকার ও ভালো কাজও যে করেছেন তা মনে করার চেষ্টা করলেন। আকাশে অসংখ্য তারার মতো ভালো কাজ করেছেন, সে কথাগুলো মনে করে মানসিকভাবে নিজেকে শরীরের ভেতর মনটাকে শক্ত করে নিলেন।

আমরা অনেকেই রাস্তাঘাটে ফকিরকে পাঁচ-দশ টাকা দিই, সে রকমের কোনো পরোপকার করেননি সফিউদ্দিন আহমেদ। তিনি পরোপকার করেছেন। গ্রাম থেকে একটা কাজের মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন। কয়েক বছর বাড়িতে রেখে বিয়ে দিয়েছেন। যার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন তাকে নিউমার্কেটে নিজে টাকা দিয়ে একটা কাপড়ের দোকান করে দিয়েছেন। এছাড়া গ্রামের একটা ডিভোর্স হওয়া মেয়ে ও স্বামী মারা যাওয়া মেয়েকে টাকা-পয়সা দিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। শহরে সুখে আছে তারা। নিজের গ্রামের এলাকায় গরিব-দুঃখী ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ দিতেন। এলাকার দুই ভিক্ষুককে টাকা-পয়সা দিয়ে বাজারে সবজি বিক্রির দোকান করে দিয়েছেন। তারা এখন ব্যবসা করে ভালো আছে। এতজনের এতকিছু করে দিয়েছেন। কিন্তু আজ এই অন্তিমবেলায় কেউ তার খোঁজ নিতে আসে না। তাতে অবশ্য সফিউদ্দিন কিছু মনে করেন না।

সফিউদ্দিন আহমেদ আজ টাকা থেকেও নিজেকে অসহায় মনে করেন। তার স্ত্রী আমেনা বেগম জীবিত থাকলে হয়তো এত একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গ থাকতেন না। কিন্তু তার নাতনিকে নিয়ে মৃত্যুর কথা চিন্তাভাবনায় নিয়ে এসে এমন অপরাধবোধ ভীষণভাবে তাকে পীড়া দিচ্ছে। একটু পর নাতনি নাদিমা বাবা-মায়ের সঙ্গে              বের হয়ে যেতে যেতে বলল, ‘দাদাভাই, আমরা মায়ের বান্ধবীর বিবাহবার্ষিকীতে যাচ্ছি। তুমি বাসায় থাক। আসার সময় তোমার জন্য নতুন ঘড়ি কিনে নিয়ে আসব। তুমি এই ঘড়ির মায়া ত্যাগ কর।’

নতুন ঘড়ির কথা শুনে সফিউদ্দিন আহমেদের মন একটু পুলকিত হলো। মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, ‘কিছু কিছু মায়া কখনো ত্যাগ করা যায় না। তোমরা যাও। ভালোভাবে ঘুরে এস। নতুন ঘড়ির জন্য অপেক্ষা করব না। অপেক্ষায় থাকব তোমাদের।’

‘ঠিক আছে।’ এই বলে ওরা বাসা থেকে বের হয়ে গেল। ঘড়িটা হাতে নিয়ে বেসিনের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আয়নায় নিজের ছবিকে প্রশ্ন করলেন, ‘সফিউদ্দিন বলো, আমার দেহের যন্ত্রপাতি নষ্ট নাকি ঘড়ির যন্ত্রপাতি নষ্ট?’

‘তোমাদের দুজনের যন্ত্রপাতি নষ্ট।’

‘তাহলে কি আমাদের আয়ু খুবই কম।’

‘তাই তো মনে হচ্ছে।’

‘এখন কী করতে হবে।’

‘মৃত্যুচিন্তা বাদ দিয়ে নিজে ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবে সব সময়।’

‘ভালো তো থাকতে পারি না। চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

আয়নায় নিজের সঙ্গে কথা বলে সফিউদ্দিন আহমেদ মনে করছেন তার মস্তিষ্কের কোনো কোনায় ঘড়ির মতো টিকটিক করে ডাকছে যমদূত।

হঠাত্ বিদ্যুত্ চলে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল বাসা। আর আয়নার সামনে কথা বলা হলো না সফিউদ্দিনের। ঘড়িটা বিছানায় রেখে একটু বিশ্রাম করতে লাগলেন। একটু পর তার মোবাইল ফোনে কল এলো। হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে বললেন, ‘নাদিমা আপনার কী হয়?’

‘নাতনি হয়। কেন কী হয়েছে।’

‘ওর মুখ থেকেই শুনুন।’

নাদিমা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘দাদাভাই, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছি। আমি হাসপাতালে। বাবা-মা কোথায় আছে, জানি না। তুমি দ্রুত সদর হাসপাতালে এসো।’

‘তুমি থাক দাদাভাই। আমি আসছি।’

সফিউদ্দিন আহমেদ হাসপাতালে যেতে যেতে ভাবছেন, আমার ছেলে আর বউমা জীবিত নেই নিশ্চয়। থাকলে তারা একসঙ্গে এক হাসপাতালে থাকত। আমিও নাদিমার এই বয়সে এতিম হয়েছিলাম। এতিম হয়ে গেল কি নাদিমাও!

ইত্তেফাক/এসকে