বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

গৃহশ্রমিক নির্যাতন বন্ধে নেই কার্যকর আইন

প্রচলিত একাধিক আইনে সাংঘর্ষিক ধারা

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০

এই মাসে আলোচিত ঘটনার মধ্যে অন্যতম রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আবাসিক ভবনের নবম তলা থেকে পড়ে গৃহকর্মী প্রীতি উড়ানের মৃত্যু। ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করলেও গৃহশ্রমিক নির্যাতন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে মনে করেন বিজ্ঞজন। ফলে গৃহশ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে। গৃহশ্রমিকদের শ্রমআইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এখনো। তাই শ্রমিক হিসেবে আইনি সুরক্ষার আওতায় নেই তারা। 

সরকার গৃহশ্রমিকদের জন্য ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫’ প্রণয়ন করেছে। ছুটি, বিনোদন, পারিশ্রমিক, কর্মঘণ্টা, চিকিত্সা ও পড়াশুনার কথা উল্লেখ থাকলেও, তার কোনোটিই আদায় হয় না। নীতির বাস্তবায়ন নেই, নেই গৃহশ্রমিকদের সঠিক পরিসংখ্যান। এই অবস্থায় গৃহশ্রমিকের অধিকার আদায়ে শ্রমআইন ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের অন্তর্ভুক্ত করাসহ গৃহশ্রমের জন্য পৃথক আইন করে অধিকার আদায়ের ওপর জোর দেন তারা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র-আসকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে ৩২ জন গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়। এদের মধ্যে ছয় জন নিহত, এক জনের রহস্যজনক মৃত্যু, ১০ জনকে এসিড নিক্ষেপ করা হয়। আসকের পাঁচ বছরে তথ্য মতে, ১০৯ জন গৃহশ্রমিক চরম নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস)-এর প্রতিবেদন মতে—২২ সালে ৩২ জন গৃহকর্মী ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। ২০২১ সালে ৩৮ জন, ২০২০ সালে ৪৪ জন গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়। 

শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ গবেষক শরফুদ্দিন খান ইত্তেফাককে বলেন, গৃহশ্রমিকের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। আইএলও-ইউনিসেফ কর্তৃক ২০০৭ সালে পরিচালিত সর্বশেষ তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে গৃহকাজে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার। ২০২৪ সালে এসে এই সংখ্যাটি বৃদ্ধি পেয়েছে বলেই ধারণা করা হয়। এদের কোনো অধিকার নেই, ঘুমানোর জায়গা নেই, পুষ্টিকর খাবার নেই। নির্যাতনের প্রতিকার নেই, চার দেওয়ালে তাদের সঙ্গে কী হয় তা কারোরই জানা নেই। বিলসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতে—দেশে ২০ লাখের বেশি গৃহশ্রমিক কাজ করছে। তাদের ৯৫ ভাগের বেশি নারী ও কন্যাশিশু। নিয়োগকারীর সঙ্গে ৯৯ শতাংশের বেশি কোনো লিখিত চুক্তি নেই। করোনাকালে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি কমেছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের শিশু অধিকার বিষয়ক কমিটির সদস্য সচিব এম রবিউল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, গৃহশ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় তাদের আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জন্য যেমন আইন নেই। তেমন যে আইনগুলো সহায়ক হিসেবে কাজ করে সেগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। যেমন-শিশু আইনে বলা হচ্ছে ১৮ বছরের আগে কোনো শিশুকে কাজে লাগানো যাবে না। আবার শ্রম আইনে বলা হচ্ছে ১৪ বছরের নিচে কেউ শ্রমে নিযুক্ত হতে পারবে না। আবার গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালায় বলা হচ্ছে ১২ বছরের পর পড়াশুনা অধিকার আদায়সহ শিশুকে হালকাকাজে নিযুক্ত করা যাবে। একই সঙ্গে ১৩৮ আইএলও কনভেনশন মতে—১৩ থেকে ১৫ বছরের শিশুদের হালকা কাজে লাগানো যাবে। আবার শ্রম আইনই বলছে গৃহশ্রমিক শ্রমআইনের আওতায় আসবে না। এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে গৃহশ্রমিক অধিকার আদায়ে আলাদা আইনের কথা বলেন তিনি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, আইনের এমন দ্বন্দ্ব গৃহশ্রমিক শিশুদের সঙ্গে এক প্রকার হঠকারিতা। শিশুদের মানবাধিকার রক্ষায় এ সব হঠকারিতা দূর করা জরুরি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব খোন্দকার মো. নাজমূল হুদা শামিম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম তালিকা নির্ধারণ কমিটি ৬০ জনের সমন্বয়ে গঠিত। তারা অনেকে চান না গৃহশ্রম ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় আসুক। তবে বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় আছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, সরকার নানা প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৫ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে। ইতিমধ্যে চারটি প্রকল্পের আওতায় ৪ লাখ শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএইচপি