সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

শুল্ক কমলেও বাড়ছে চিনি, খেজুরের দাম

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:০০

আসন্ন রমজানে বাজারে পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে চিনি, খেজুরসহ চার পণ্যের শুল্ক কর কমিয়েছে সরকার। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই। উলটো দফায় দফায় চিনি ও খেজুরের দাম বাড়ছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর শান্তিনগর, নিউমার্কেট ও কাওরান বাজারসহ কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে দাম বাড়ার এ চিত্র পাওয়া যায়।

ভোক্তাদের অভিযোগ, রমজান শুরু হতে এখনো দুই সপ্তাহের কিছু সময় বাকি থাকলেও এখনই বাজারে চিনি ও খেজুরের দাম বাড়তে শুরু করেছে। তাহলে সরকারের এসব পণ্যে আমদানি শুল্ক কমিয়ে কি লাভ হলো? উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রজ্ঞাপনে চিনি, খেজুর, তেল ও চালের শুল্ক কর কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। তবে ঘোষণার আগে থেকেই এসব পণ্যের দাম বাড়তি। ভোক্তারা আশা করেছিলেন, আমদানি শুল্ক কমানোর ঘোষণার পর দাম কমবে। কিন্তু উলটো দাম আরো বাড়ছে। বিশেষ করে গত কয়েক দিনে চিনি ও খেজুরের দাম দফায় দফায় বেড়েছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকা ও প্যাকেট চিনি ১৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে আরো বেশি দামেও বিক্রি হচ্ছে। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) গতকাল তাদের বাজারদরের প্রতিবেদনেও এ দরে চিনি বিক্রির তথ্য তুলে ধরেছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, গত বছর এই সময়ে রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি চিনিতে দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে প্রতি টনে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগে যা ছিল দেড় হাজার টাকা। আর পরিশোধিত চিনি আমদানিতে টনপ্রতি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার টাকা। যা আগে ছিল ৩ হাজার টাকা। আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ সুবিধা পাওয়া যাবে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের জানুয়ারির শুল্কায়নের তথ্য বলছে, প্রতি কেজি চিনিতে আমদানিকারকেরা গড়ে শুল্ক দিয়েছে ৪০ টাকা ৩৫ পয়সা। এখন আমদানি শুল্কে ছাড় দেওয়া হয়েছে কেজিতে ৭৫ পয়সা। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সরকার প্রতি কেজি চিনি আমদানি শুল্কে যে ছাড় দিয়েছে তাতে চিনির দামে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, সরকার ভোগ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় করে অপরিশোধিত চিনি আমদানি থেকে। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৮ লাখ ৪৮ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়। তাতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৪ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা। এই রাজস্ব আয়ে যাতে বড় ধরনের প্রভাব না পড়ে তাই চিনিতে আমদানি শুল্ক খুব বেশি কমানো হয়নি।

চিনির পাশাপাশি আমদানি শুল্কে ছাড় পাওয়া আরেক পণ্য খেজুরের দামও দফায় দফায় বাড়ছে। অথচ খেজুর আমদানিতে সবচেয়ে বেশি শুল্ক কমানো হয়েছে। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি খেজুর মানভেদে ২৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। যা এক মাসের ব্যবধানে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজি খেজুরে মানভেদে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরনের খেজুরের মধ্যে সাধারণ মানের খেজুর ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা, দাবাস খেজুর ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা, ভালো মানের মরিয়ম খেজুর ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা,  মাবরুম খেজুর ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, আজওয়া খেজুর মানভেদে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, সুফরি মরিয়ম ৭৫০ থেকে ৮০০, আম্বার ও সাফাভি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ও সুক্কারি খেজুর ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে মানভেদে এসব খেজুর আরো বেশি দামেও বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফআইএ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগে প্যাকিংভেদে প্রতি টন খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য ছিল ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলার, কিন্তু বর্তমানে শুল্কায়ন মূল্য বেড়ে হয়েছে প্রতি টন ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৭৫০ ডলার। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি ৩  ও ভ্যাট ১৫ শতাংশ।

খেজুর আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, খেজুর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে আগে সব মিলিয়ে ১৬৪ টাকা কর বাবদ দিতে হতো। এখন তা ৩৩ টাকা কমবে। আমদানিকারকরা জানান, গত বছর রোজার আগে খেজুর আমদানিতে করভার ছিল ১০ শতাংশ। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেটে খেজুরকে লাক্সারি পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খেজুর আমদানিতে করভার ও শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে দুবাই, আরব আমিরাত, ইরাক থেকে যে খেজুর আমদানি করছি তার দাম পড়ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে বেশি। এছাড়া ডলারের দামও বেড়েছে। তিনি বলেন, খেজুরের এলসি যে মূল্যে খুলছি সে অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণ হলে খেজুরের দাম কম পড়ত। কিন্তু বিলাসি পণ্যের তালিকায় খেজুরকে অন্তর্ভুক্ত করায় বাড়তি শুল্ক দিতে হচ্ছে। ফলে খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানো হলেও দেশের বাজারে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আসন্ন রমজানে চিনি, খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে আমদানি শুল্ক কমিয়েছে সরকার। কিন্তু এর প্রভাব বাজারে পড়েনি। উলটো পণ্যগুলোর দাম আরো বাড়ছে। এ ব্যাপারে বাজারে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

ইত্তেফাক/এএইচপি