সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ট্রেনে নাশকতাকারীদের খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ

বেনাপোল ও মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে আগুনের ঘটনায় কাউকেই শনাক্ত করা যায়নি

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:১৫

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুদিন আগে ৫ জানুয়ারি রাজধানীর গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে চার জনের মৃত্যু হয়। দেড় মাস পার হলেও নাশকতার ঐ ঘটনায় সরাসরি জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো বাহিনী। এর আগে ১৯ ডিসেম্বর ভোরে নেত্রকোনা থেকে ছেড়ে আসা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি বিমানবন্দর স্টেশনের পরেই আগুন দেওয়া হয়। এতে পুরোপুরি পুড়ে যায় তিনটি বগি। এই আগুনেও চার জনের মৃত্যু হলেও কাউকে গ্রেফতার বা শনাক্ত করতে পারেনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।

বেনাপোল এক্সপ্রেসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলাটির তদন্তভার যাচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। দুই-এক দিনের মধ্যে মামলাটি সিআইডির কাছে বুঝিয়ে দেবে রেলওয়ে পুলিশ। অন্যদিকে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের মামলাটি গত বুধবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। পিবিআই এখন মামলার ডকেট পর্যালোচনা করছে। মূল তদন্তে এখন হাত দেয়নি। 

ট্রেনে নাশকতার মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশের এসপি আনোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, মামলার তদন্তে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা এখন পর্যন্ত চাঞ্চল্যকর ঐ দুটি নাশকতার ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করতে পারিনি। আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। শত শত সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে, স্পষ্টত কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। নিহত চার জনের মরদেহ ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে শনাক্তের পর স্ব-স্ব পরিবারের কাছে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার তদন্তভারও আমাদের কাছে থাকছে না। মামলা চলে যাচ্ছে সিআইডিতে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে দু-এক দিনের মধ্যেই মামলার নথি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হবে। 

বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ঐ দিন রাতেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ নবী উল্লাহ নবীসহ ছয় জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পুলিশ। পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রেফতারকৃতরা সরাসরি বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত। পরদিন ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন-অর রশীদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুনের পরিকল্পনা হিসেবে বিএনপির হাইপ্রোফাইল ১০/১১ জন নেতা ভিডিও কনফারেন্স করেন। কনফারেন্সে প্রথমে আসেন মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক খন্দকার এনাম। এরপর আসেন সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, যুগ্ম-আহ্বায়ক এম এ গাফফার, ইকবাল হোসেন বাবলু, একজন দপ্তর সম্পাদক (নাম জানা যায়নি) ও কাজী মনসুর। সেখানে তারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুর পরিকল্পনা করেন। গ্রেফতারকৃতরা এই ঘটনায় জড়িত।

বিভিন্ন সময় জড়িত থাকার সন্দেহে গ্রেফতার বেশ কয়েক জন বিএনপির নেতাকর্মীসহ দুই ডজন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু মেলেনি সরাসরি কারো সংশ্লিষ্টতার তথ্য। রেলওয়ের প্রাথমিক তদন্তে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি বলে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। নাশকতাকারীদের ধরিয়ে দেওয়া আগুনেই সেদিন সকালে পুড়েছিল বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনটির চারটি বগি। পুড়ে মৃত্যু হয়েছিল চার যাত্রীর। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করে ঘটনার ৪০ দিন পর পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে মরদেহ।

র্যাবের পক্ষ থেকেও বেশ কয়েক জনকে আটক করা হয়। তবে তাদের কেউ বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে নাশকতার ঘটনায় জড়িত হিসেবে তথ্য পায়নি র্যাব। র্যাব বলছে, পেট্রোল বোমা ও রেলে নাশকতার চেষ্টায় তারা বেশ কয়েক জনকে আটক করেছে। যারা বিভিন্ন নাশকতার চেষ্টায় জড়িত এবং পেট্রোল বোমা তৈরি করে সরবরাহ করত। তবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে নাশকতার সংশ্লিষ্টতা পাইনি।

এদিকে নেত্রকোনা থেকে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে। পরদিন অর্থাত্ ১৯ ডিসেম্বর ভোর পৌনে ৫টার দিকে ট্রেনটি যখন ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশন এলাকায়, তখনই সেটিতে আগুন দেওয়া হয়। এতে পুরোপুরি পুড়ে যায় তিনটি বগি। যাত্রীদের একাংশ বিমানবন্দর রেলস্টেশনে নেমে গিয়েছিলেন। বাকিদের বেশির ভাগ ছিলেন ঘুমিয়ে। ট্রেনে নারীরা ছিলেন, শিশুরা ছিল, ছিলেন প্রবীণেরাও। সবাই দেখলেন, আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে পুরো বগি। এর মধ্যে চিত্কার, কান্না। যাত্রীরা জানিয়েছেন, বিমানবন্দর স্টেশন এলাকায় আগুন দেওয়ার পর ট্রেনটি থামে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে এসে ঢাকার তেজগাঁও রেলস্টেশন এলাকায়। তখন হুড়োহুড়ি করে যাত্রীরা নেমে যান। কেউ কেউ লাফিয়ে পড়েন। ট্রেনটি তেজগাঁওয়ে থামার কিছুক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নেভাতে শুরু করে। পরে একটি বগি থেকে চার জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার পরপর আইনশৃঙ্খল বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাথমিক তদন্তে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এটি একটি নাশকতামূলক কাজ। এতে জড়িত থাকতে পারে তিন ব্যক্তি। তারা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে ট্রেনের তিনটি বগিতে উঠেছিলেন। পুলিশ বিমানবন্দর স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ট্রেনে কারা উঠেছিলেন, তেজগাঁও স্টেশন থেকে কারা নেমেছেন তা জানার চেষ্টা করেছে। তাদের ধারণা, ট্রেনটি ভোর রাতে ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশনে থেমেছিল। এরপর সেখানেই ট্রেনের বগিতে আগুন দিয়ে দুর্বৃত্তরা নেমে যায়।

মামলাটির তদন্ত তদারক কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, গতকালই (বুধবার) আমরা মামলার তদন্তভার বুঝে পেয়েছি। তদন্ত কর্মকর্তা এখন ডকেটে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করছেন। যদিও এর আগে আমরা একাধিকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে পিবিআই এখন পর্যন্ত এই মামলায় কাউকে গ্রেফতার করেনি। তদন্ত শুরু হলে বোঝা যাবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি