পশ্চিমের সঙ্গে দূরত্বই কি সংঘাত দীর্ঘায়িত করছে?

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩০

আন্তর্জাতিক হুমকির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার প্রশ্নে দেশগুলো সচরাচর একটা মৌলিক পথ ধরেই হেঁটে থাকে। এই পথ মূলত এরকম, ‘যুদ্ধ করো এবং এর মাধ্যমেই শান্তির সন্ধান করো’। সত্যি বলতে, এই প্রবণতা আজকের দিনে ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাতের মধ্য দিয়েই শান্তির অন্বেষণ করতে দেখছি আমরা।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন, গাজাযুদ্ধ, দেশে দেশে অভ্যুত্থান, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ এবং পূর্ব এশিয়ায় সামরিক শক্তির ঝনঝনানি—এসব ওপরের দাবির পক্ষে একেকটা জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর কিংবা কোরীয় উপদ্বীপ জুড়ে যা চলছে, তা-ও এই প্রবণতার বাইরে নয়।

বাস্তবতা হলো, বৈদেশিক নীতিই শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কূটনীতি, বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, কৌশলগত জোট বা অস্ত্রের মজুতের চেয়ে ফরেন পলিসিই এখন পর্যন্ত অন্যতম ও সঠিক পথ। এই অর্থে বলতে হয়, সমস্যার উত্তরণে ফরেন পলিসির ওপরই বেশি জোর দেওয়া উচিত। জলবায়ুসংকট, খাদ্যনিরাপত্তা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সব ক্ষেত্রেই আসল মাধ্যম হলো বৈদেশিক নীতি। সদ্য সমাপ্ত মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এক দশকেরও বেশি আগে থেকে মিউনিখ ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে আসছি আমি। পানি থেকে তুলে নিলে মাছের যে দশা হয়, প্রথম দিকে নিজেকে সেরকম মনে হতো। কনফারেন্সে নারীর উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা। স্যুট পরা বৃদ্ধ বা ইউনিফরম পরা সামরিক ব্যক্তিবর্গকেই সম্মেলনে বেশি দেখা যেত। তবে সেই দিন পালটে গেছে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে। মিউনিখ সম্মেলনে বর্তমানে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, যা বেশ চিত্তাকর্ষক ও অনুপ্রেরণামূলক। এবারের সম্মেলনেও উপস্থিত ছিলেন কয়েক ডজন নারী রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রী।

এসব কথা কেন বলছি? বলছি এই কারণে যে, এদের বেশির ভাগই এসেছেন বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো থেকে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, জেনারেলদের পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু-যোদ্ধা, প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকার কর্মীরা অংশ নিয়েছেন এবারের সম্মেলনে। সবার অংশগ্রহণে সম্মেলন যেমন প্রান্তবন্ত হয়ে ওঠে, তেমনিভাবে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেও লক্ষ করা যায় এক ভিন্ন বৈচিত্র্য।

উল্লেখ করার বিষয়, জলবায়ুসংকট, জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অভিবাসন, বহুপাক্ষিকতা ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন) মিউনিখ সম্মেলনের বিভিন্ন প্রোগ্রামে বিশেষভাবে জায়গা করে নেয়। এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর।

এবারের সম্মেলনে স্বভাবতই ইউক্রেন আলোচনায় আসে ঘুরেফিরে। অবশ্য রাশিয়ার বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির মৃত্যুর সংবাদে থমথমে ভাব নেমে এসেছিল। এসবের মধ্যেই রুশ বাহিনীর কাছে ইউক্রেনের অ্যাভদিভকা শহর হারানো, ইউক্রেনে মার্কিন কংগ্রেসের সামরিক সহায়তা বন্ধ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিরে আসার মতো নানা বিষয় উঁকি মেরেছে আলোচনার টেবিলে।

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আলোচনা হয়নি, তেমন নয়। তবে এ নিয়ে খুব বেশি কথা হয়নি। দুঃখজনকভাবে ইসরাইলি সরকারের তরফ থেকে সংযমের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কাতারি, মিশরীয় ও সৌদি সরকারও এ নিয়ে বেশি কিছু বলছে না। যদিও বাইডেন প্রশাসন রাফা সীমান্তে ইসরাইলি আক্রমণের বিরোধিতার কথা শুনিয়ে আসছে কথায় কথায়।

আমরা জানি, মার্কিন কংগ্রেসের স্থগিতাদেশের কারণে ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এদিকে চরম মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছে গাজা। বর্তমান বিশ্বে কেবল ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়েই বিতর্ক হচ্ছে না, বরং বিশ্বব্যাপী আলোচনায় থাকা অন্যান্য ইস্যুর ক্ষেত্রেও যুতসই সমাধান টানা যাচ্ছে না।

এ তো গেল এক দিকের গল্প। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কী অবস্থা? জলবায়ুসংকট, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ব্যাপক হারে বাস্তুচ্যুতি প্রভৃতি কারণে মহা সংকটে নিপতিত উন্নয়নশীল বিশ্ব। এসব দেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ, খাদ্যনিরাপত্তার পথে আসল কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধ-সংঘাত। এ বিষয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। তবে সমাধানের কোনো কার্যকর পথ বের হয় না।

আমরা দেখেছি, ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও জ্বালানির সংকট তীব্র্র হয়ে ওঠে। এরপর গাজাযুদ্ধ শুরু হলে তা হয়ে ওঠে আরো প্রকটতর। হামাসকে সমর্থনের প্রশ্নে লোহিতসাগরে হুতিবিদ্রোহীদের হামলার কারণে বিশ্ববাণিজ্য ও অর্থনীতির অবস্থা কতটা কাহিল হয়ে উঠেছে, তা এখন জানে গোটা বিশ্ব।

লোহিতসাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য রুট কার্যত অচল করে দিয়েছে হুতিরা। গাজাযুদ্ধ বন্ধ হওয়া না হওয়া নিয়ে যখন কথা হচ্ছিল, সেই সময়ে এ ধরনের হামলা-আক্রমণের কারণে আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে পড়ে! বর্তমান বিশ্ব যেন ‘বিভক্ত এবং খণ্ড-বিখণ্ড’ হয়ে পড়েছে। সত্যিকারের সংলাপ, সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

মিউনিখ সম্মেলনের কথা কেন বারবার বলছি? বলছি এই কারণে যে, কনফারেন্সে আমি ভিন্ন কিছু লক্ষ করেছি! ইউরোপীয় প্রতিরক্ষার বিষয়ে কথা হতে শুনেছি। দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যসংকট নিয়ে আলোচনা হতে। হতবাক হয়ে লক্ষ করেছি, প্রথম অধিবেশনের পর যখন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিশ্বনেতারা উড়ে আসছিলেন, বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যু আলোচনার টেবিলে তোলার চেষ্টায় সরব ছিলেন, তখন একটি শ্রেণি তড়িঘড়ি করে চলে যায় সম্মেলন থেকে! অংশগ্রহণকারী নেতারা যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ঠিক সে সময় প্রস্থান করেন পশ্চিমা বিশ্বের কোনো কোনো নেতা।

মনে রাখার বিষয়, সম্মেলনে সাইড বেঞ্চে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। কথা চলে বিভিন্ন আঞ্চলিক বিষয় নিয়েও। তবে অংশগ্রহণকারী নেতারা যেন নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েই আলোচনা করতে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন। অথচ আঞ্চলিক ইস্যুগুলোও সমান গুরুত্ব বহন করে।

আজকের বিশ্ব যুদ্ধের দামামায় ক্লান্ত। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়াও চোখে পড়ার মতো। যদিও সংঘাত বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ব জুড়ে যেন অবিশ্বাস, ভুল বোঝাবুঝিই জেঁকে বসেছে। সব থেকে বড় কথা, বিশ্বব্যাপী যেন একধরনের ঠান্ডা লড়াই চলছে। এই লড়াই যে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাকি বিশ্বের, সে কথা কে না বলবে!

দেশে দেশে এই যে যুদ্ধ, সংঘর্ষ এবং এর হাত ধরে সৃষ্ট সংকট—এর শেষ কোথায়? এর যুতসই সমাধানের পথই-বা কতদূর? এর ফলে বড় বড় ট্রান্সন্যাশনাল চ্যালেঞ্জ সমাধানের পথ যে ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে পড়ছে, তা কবে বুঝবে পক্ষগুলো?

ইউক্রেন-যুদ্ধের কথাই বলি কিংবা গাজাযুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই সমাধান জটিলতর হয়ে উঠছে। গাজায় প্রাণ ঝরছে। হতাহত বন্ধ করা যাচ্ছে না ইউক্রেনেও। অন্য আরো বেশ কিছু অঞ্চলে সংঘাত চলছে। এসব বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। আর এর জন্য সবার আগে দরকার বিশ্বের সমস্ত কোণ থেকে আওয়াজ তোলা, কণ্ঠস্বর উঁচু করা; সংঘাত-হানাহানি বন্ধের আহ্বান জানানো। সর্বদা মনে রাখা উচিত, অচিরেই সংঘাত বন্ধ করা না গেলে বৈশ্বিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে একটা সময়ে এসে। তখন হয়তো হানাহানির বিশ্বই হয়ে উঠবে আমাদের বাসস্থান।

লেখক: রোমের ইস্টিটুটো আফারি ইন্টারনাজিওনালির ডিরেক্টর, ফ্লোরেন্সের ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের স্কুল অব ট্রান্সন্যাশনাল গভর্নমেন্টের খন্ডকালীন অধ্যাপক ও ভিয়েনার ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান সায়েন্সের ইউরোপস ফিউচার ফেলো

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এএইচপি