ই-বুক ও ই-ভার্শনের কদর কি বাড়ছে?

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:০০

করোনা মহামারির পর একুশের বইমেলায় যে ভাটা পড়েছিল, এখন সেখান থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই উন্নত হচ্ছে। সাধারণত শেষের দিনগুলোতে বইমেলায় বিক্রি বেশি হয়। গত কয়েক দিনে বিশেষত দুপুরের পর থেকে ক্রেতাদের উপস্থিতি আর বিক্রি বেড়েছে বলে জানা যায়। সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় বইমেলা আবার করোনাপূর্ব অবস্থায় চলে যাবে বলে আমরা আশা করি।

একসময় ‘বই দেখা’ বলতে সিনেমা হলে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখাকে বোঝানো হতো। সিনেমা ভালো লাগলে মানুষ বলত—‘বইটা খুব ভালো, কাহিনিটা বড়ই চমত্কার। এরপর কাহিনির ধারাবাহিকতা ছেড়ে সিনেমার পর্দায় নাচ-গান, মারপিট, যুদ্ধ, খুন-খারাবি সবকিছুই শুরু হয়ে যায়। কালের আবহে সিনেমার পর্দা থেকে মানুষের গোপনীয়তা ভঙ্গ করে টেলিভিশন, ভিসিআর, ভিসিপি ইত্যাদি এসে ঘরে ঘরে সিনেমার প্রদর্শন চালু করে দেয়। সেখান থেকে ইন্টারনেট যুগে প্রবেশের পর আজ মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে মানুষের হাতে হাতে মিনি সিনেমার পর্দা ঠাঁই করে নিয়েছে। সেখানে সবকিছুই সিনেমার আদলে চোখের মণিকোঠায় ভেসে ওঠে। ‘বইয়ের কাহিনি’ তাই হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে।

তবে বই পড়া ও কেনা কিন্তু এখনো থেমে নেই। আধুনিক ডিজিটাল যুগের ব্যস্ততার মধ্যেও বই পড়া বন্ধ হয়নি। শুধু বদলে গেছে পড়ার মাধ্যম ও ধরন। কমে গেছে পড়ার সময়। এখন দেখার যুগ শুরু হওয়ায় এবং দেখার সরঞ্জাম ও বিষয়াবলির পরিমাণ অতি বেশি হওয়ায় দেখার মধ্যে গভীরতা কমে গেছে। একই সঙ্গে দেখবে, না পড়বে —তা বুঝে উঠতে অনেক মানুষের ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হয়েছে।

কয়েক যুগ আগে বই পড়া ছিল বড় আকর্ষণের বিষয়। আমাদের স্কুল-ছাত্রজীবনে একটি গল্পের বই বহু হাত ঘুরে পড়তে পড়তে আসল মলাট ময়লা হয়ে ছিঁড়ে যেত। সোভিয়েত ইউনিয়নের তেল চকচকে বাংলা পত্রিকার পাতা দিয়ে মলাট বেঁধে বই ও লেখকের নাম হাতে লিখে দেওয়া হতো। তবু বইটি বারোজনের হাত ঘুরে পড়া হতে থাকত। পরিচিত সবার পড়া হয়ে গেলে সংরক্ষণের অভাবে বুট-বাদাম বা কটকটিওয়ালার কাছে সমাদরে বিক্রিও হয়ে যেত।

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বই পড়ার পরিমাণ, ধরন ও কদর আরো বেড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে, রেফারেন্স বইগুলো স্যারদের নামে তোলা থাকত বিধায় সেগুলোর জন্য স্যারদের কাছে বারবার অনুরোধ করে লাইব্রেরিতে জমা দিতে বলা হতো। অনেক সময় দামি বইগুলোর সংখ্যা অনেক কম থাকায় তা বাজারে কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। পাবলিক লাইব্রেরি, বাংলাদেশ ব্যাংক লাইব্রেরি, এশিয়াটিক সোসাইটি, ইউসিস লাইব্রেরি প্রভৃতি খুঁজেও রেফারেন্স বই পড়ার সুযোগ মিলত না। তখনকার দিনে বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলায় পাঠ্য বইয়ের চেয়ে গল্প-উপন্যাস বেশি বের হতো, বিক্রিও হতো প্রচুর। উপন্যাসের পাঠক ছিল অনেক বেশি। এছাড়া প্রেমিক-প্রেমিকারা পরস্পরকে উপহার দেওয়ার জন্য নতুন গল্প-উপন্যাসের বই কেনার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকতেন।

আজকাল উপহার সামগ্রীর ধরন বৈষয়িকতার আড়ালে দারুণভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে বিধায় কেউ বই উপহার দিতে চায় না। তবে উপহার হিসেবে বইয়ের মর্যাদা কখনো কমেনি এবং ভবিষ্যতে কখনো কমবেও না।

বছরে একবার বইমেলা নিয়ে হাজির হয় একুশের বইমেলা। আমাদের বাংলা একাডেমির বইমেলাকে বলা হয় ‘পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘদিনব্যাপী চলা বইমেলা।’ ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার আকার-আয়তন আমাদের চেয়ে ছাড়িয়ে গেলেও তার স্থায়িত্ব হয় মাত্র ১৫ দিন। একুশে বইমেলার দীর্ঘদিনব্যাপী বেচাকেনা ও জনপ্রিয়তার কাছে পৃথিবীর আর অন্য কোনো বইমেলা আজ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারেনি।

আমাদের একুশে বইমেলা হলো লেখক, পাঠক, ক্রেতা-বিক্রেতা, শিশু-কিশোর, বয়োজ্যেষ্ঠ সবার কাছে সমান আকর্ষণের, সমান গর্বের বিষয়। সবাই এই বইমেলার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন। তবে দিনে দিনে মেলার বৈশিষ্ট্য বদলে গেছে। মেলায় এসে সবাই বইয়ের রাজ্যে হারিয়ে যায় না। মেলায় বসে কোথাও বই নেড়েচেড়ে দেখার পর নীরবে বসে সেই বইটি পড়ার ফুরসত নেই। এখানকার বই পড়তে হলে আগে কিনতে হবে। বাড়িতে নিয়ে তারপর পড়তে হবে। অর্থাত্, বই পড়তে চাইলে সেটাকে কিনে পড়তে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশের বইমেলায় বই দেখার পর পড়ার স্থান বা কর্নার থাকে। সেখানে বসে বই পড়ে ফেরত দিয়ে যাওয়া যায়। আমাদের সেই সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি। কারণ, আমাদের একুশে বইমেলার মতো এত বেশি লোক সমাগম অন্যত্র কোথাও হতে দেখা যায় না। শুধু কলকাতা বইমেলাতে আমাদের মতো অনেক মানুষের সমাগম হয়ে থাকে।

আজকাল মেলায় বইক্রেতার চেয়ে বই দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। বাচ্চারা হালুম, টুকটুকি দেখার জন্য জেদ করলে অভিভাবকরা তাদের সঙ্গে নিয়ে আসেন। তবে এর সঙ্গে বাচ্চাদের কিছু কার্টুন, ছড়া, গল্পের বই কেনা হয়ে যায়। আজকাল বাচ্চাদের জন্য প্রিয় বায়নার বিষয় ই-বুক। ই-বুকের ছড়া-কবিতার সঙ্গে থাকে মিউজিক। বাড়িতে মোবাইল ফোন বা ট্যাবে অ্যানিমেটেড কার্টুন দেখতে অভ্যস্ত বাচ্চারা ডিজিটাল বইয়ের মধ্যে অদ্ভুত আকর্ষণ খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। সেজন্য ই-বুক নির্মাতারা বাচ্চাদের আকর্ষণ করার জন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। যেগুলো মেলার মধ্যে স্বাভাবিক বইয়ের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। সেজন্য এবারের ‘মেলায় বাজে বই বেশি’ বলে ইতিমধ্যে সংবাদ বের হয়েছে।

এবারে দেখা যাচ্ছে, মেলার দর্শনার্থীরা এক স্টলে দীর্ঘক্ষণ বই নেড়েচেড়ে দেখে চলে যাচ্ছেন আরেকটি স্টলে। শেষমেশ খালি হাতে বাড়ি চলে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করা হলে এমন একজন বললেন, ‘বইয়ের দাম অতি বেশি। আমি বই কিনতে চাই, কিন্তু দামটা আমার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।’ আরেক জন জানালেন, ‘মেলায় যে বইগুলো দেখলাম সেগুলোর ছাপানোর মান ভালো। তবে নেটওয়ার্ক সার্চ করে ওয়েব ভার্শন পেলে পড়ে নেব। কাগজের বই পড়তে সময় বেশি লাগে। তাই ওয়েব ভার্শন পেলে দ্রুত পড়ে নেব।

আরেক জন শিক্ষার্থী জানালেন, ‘বইয়ের দাম বেশি। তাই পড়ার জন্য নেট সার্চ করি, কপি করি। নোট করি না। এআই দিয়ে প্রশ্নোত্তর তৈরি করে পরীক্ষা দিই। এআইয়ের যুগে কেন পাঠ্যবই কিনে পড়তে হবে?

এক চাকরিজীবী বলেন, ‘আজ বই কিনতে আসিনি। আজ দেখতে এসেছি মেলায় কী কী নতুন বই এসেছে। এবারের মেলায় বইয়ের দাম বেশি চাইছে। মেলার একেবারে শেষের দিকে মূল্যহ্রাস ঘোষণা করলে তখন আবার এসে পছন্দনীয় অনেকগুলো বই কিনব ভাবছি।’

লেখকরা ভালো ভালো মানসম্পন্ন বই লিখলেও প্রকাশকরা বলেন, ‘আমাদের অর্থসংকট। এই বলে তারা সারা বছর দেরি করে শেষ সময়ে বই ছাপানোর কাজে হাত দেন। মেলার শেষ দিতে তাড়াহুড়ো করে বই বের করতে থাকলে ভুলভ্রান্তি বেশি হয়। এতে বইয়ের মান কমে যায়।

কোনো দেশের মাতৃভাষা হলো সেই দেশের জাতিসত্তার ভিত্তিস্বরূপ। ভাষা যত বেশি শক্তিশালী হবে, জাতির মধ্যে জ্ঞানপিপাসার ইচ্ছে তত বেশি বেড়ে যাবে। মাতৃভাষার মাধ্যমে গবেষণার বিস্তৃতি ঘটাতে পারলে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের দেশজকরণ সহজ হবে।

ইন্টারনেটের অতি ব্যবহারের এই যুগে শিশু-কিশোরদের নিজস্ব চিন্তাধারার স্বকীয়তায় বেড়ে ওঠার জন্য একুশে বইমেলার মতো এত সুযোগ কোথায়? বৃহত্ কলেবরে ঘরের ঘুপচি থেকে মুক্ত বাতাসে তাদেরকে বের করার জন্য বইমেলার মতো অন্য কোনো উত্কৃষ্ট উপায় আছে বলে মনে হয় না। একুশে বইমেলায় এসে আমাদের সোনামণিরা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির ওপর লেখা বইয়ের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। তাই বিদেশি সংস্কৃতির ওপর ভর করে লেখা বাজে, নিকৃষ্টমানের ই-বুক যাতে মেলায় ঢুকতে না পারে, বিক্রি হতে না পারে, সেজন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা জরুরি। তবে ই-বুকের খরচ বেশি। বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না। ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ত পরিবর্তনশীল হওয়ায় ই-বুক দ্রুত অচল হয়ে যেতে পারে। তাই ছাপানো বইয়ের দিকে আরো বেশি নজর দিতে হবে।

আমাদের শিশু, কিশোর, তরুণরা একা একা ঘরে বসে ডিভাইসকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে এসে একুশে বইমেলার বৃহত্ চত্বর থেকে দেশজ কৃষ্টি, সংস্কৃতির পসরা খুঁজুক, আর খুঁজুক আবহমান বাংলার জ্ঞান-বিজ্ঞান ঐতিহ্যের ধারাকে। তারা বইয়ের ওয়েব ভার্শন খোঁজার পাশাপাশি অনর্থক কাজে মোবাইল ডিভাইসের এমবি কেনার টাকা বাঁচিয়ে নেড়েচেড়ে দেখা কাগজে ছাপানো কয়েকটা নতুন বই কিনে বাড়ি ফিরুক। বই তাদের মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ই-গেম, অহেতুক চ্যাটিং, পর্নোগ্রাফি ইত্যাদির আসক্তি থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে। নিয়মিত ঘুম, মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করা ও স্কুলের পড়াশোনা তৈরি করার জন্য সময় বাঁচাবে।

কারণ, চারদিকে মুহুর্মুহু যুদ্ধের ঘনঘটায় যখন প্রয়োজনীয় বিদ্যুত্ থাকবে না, অচল হয়ে পড়বে সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস, তখন কাগজে ছাপানো বইটি হবে সময়ের সঙ্গী। আর সেই নিকষ অন্ধকারে সবকিছু বিলীন হয়ে গেলেও কাগজের লেখাগুলো জেগে উঠে আবার সবাইকে জ্ঞানের কথা বলার সুযোগ করে দেবে। জাগিয়ে তুলবে হারিয়ে যাওয়া বিশ্বমানবতাকে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন