জাতীয় পতাকা দিবস যেন ভুলে না যাই

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৪, ০৭:০৫

একাত্তর সালে আমরা একটি নাম, একটি পতাকা অর্জন করলাম। পৃথিবীতে আবির্ভূত হলো বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র। স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য ভূমির মালিকানা, নাম, পতাকা অনস্বীকার্য। এর মধ্যে পতাকার গুরুত্ব অনন্য।

স্বাধীনতাসংগ্রামের যে কতগুলো ঐতিহাসিক দিন রয়েছে, তার মধ্যে ২ মার্চ স্মরণীয়-বরণীয় দিন। এ দিনটি বাঙালি জাতির চেতনার মূল উত্স, যুদ্ধে বিজয়ের এক মহাশক্তি। এ উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ‘লাল সবুজের’ ভারতীয় পতাকা ‘ত্রিরঙা’, পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ‘চাঁদ তারা’। ভারতীয় দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের বাঁকে বাঁকে অনেক বার পতাকার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর প্রস্তাবে ভারতীয় পতাকার নকশা অনুমোদন করা হয়। ১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে লাহুরে রাভি নদীর তীরে জওহরলাল নেহেরু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে অবিভক্ত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে প্রথম সত্য ও অহিংস পন্থায় ‘স্বরাজ’ পতাকা উত্তোলন করেন। সরাজ পতাকা উত্তোলনের ১৭ বছর পর ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে আদেশানুসারে (ADOPTION ORDER) ভারতের স্বাধীনতা গ্রহণ করা হয়। ১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট চাঁদ তারা পতাকা গ্রহণ করা হয়। (CONSTITUENT ASSEMBLY-তে) পাকিস্তানের পতাকার ডিজাইনার হচ্ছেন, সৈয়দ আমির উদ্দিন কিদওয়াই। ১৯০৬ সালের পাকিস্তানের মুসলিম লীগের পতাকা ভিত্তি করে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশের পতাকার পরিকল্পনার করা হয় সিরাজুল আলম খানের নির্দেশনা ও অনুমোদনে। ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের (ইকবাল হল) ১১৮ নম্বর কক্ষে ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আব্দুর রব, শাহ জাহান সিরাজ, কাজী আরিফ আহমদ, মার্শাল মনিরুল ইসলাম, হাসানুল হক ইনু ও শিবনারায়ণ দাস পতাকার নকশা করার পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সভায় কাজী আরিফের প্রাথমিক প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে আলোচনা শেষে ‘গাঢ় সবুজ’ জমিনের ওপর লাল সূর্যের মাঝে হলুদ রঙের বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত করা হয়। তারপর ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের  ১১৬ নম্বর কক্ষে রাত ১১টার পর বাংলাদেশের পতাকার পরিকল্পনামতে, ‘লাল সূর্যের’ বৃত্তের ওপর পূর্ব বাংলার মানচিত্র (বর্তমান বাংলাদেশ) আঁকেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্ম শিবনারায়ণ দাস। পুরো পতাকার ডিজাইন সম্পন্ন করার পর সে রাতেই ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকার বলাকা ভবনের তিন তলায় ছাত্রলীগের কার্যালয়ের পাশে ‘নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্স’-এর দর্জি খালেক মোহাম্মদী পতাকার নকশা বুঝে নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং তারা ভোরের মধ্যেই কয়েকটি পতাকা তৈরি করে দেন।

শিবনারায়ণ দাস কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের ছবি পা দিয়ে অবমাননার দায়ে মাথায় হুলিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন পালিয়ে ছিলেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কুমিল্লায় হানা দিয়ে তার বাড়িতে তাকে না পেয়ে পিতা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক সতিস চন্দ্র দাসকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, মাইংকিং করে শিবনারায়ণ দাসের মাথার দাম ১০ হাজার টাকা ঘোষণা করে পাকবাহিনী। ৬৯-এর শিক্ষা আন্দোলনে জেল খেটেছেন শিবনারায়ণ এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১৭ নম্বর আসামি ছিলেন তিনি। শিবনারায়ণ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্র দত্তের হাত ধরে রাজনীতিতে এসেছিলেন।

পহেলা মার্চ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে নিউক্লিয়ার্সের নিদের্েশ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর ২ মার্চ দুপুর ১১টায় ছাত্রলীগ ও ডাকসুর আহ্বানে আয়োজিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় লাখ লাখ ছাত্র-জনতার সমাবেশ ঘটে। এই সমাবেশে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ সময় লাখ লাখ হাতের করতালি ও মুখে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগ্র ঢাকা ভূমিকম্পের মতো প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক ও স্বাধীনতার মরণপণ লড়াইয়ে বাঙালির এ ছাত্র সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নুরে আলম সিদ্দিকী। তত্কালীন ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব, স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীন আবাসভূমি অর্থাত্ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় অনিবার্য করে তোলেন। ২ মার্চ পতাকা উত্তোলন ছিল, ঔপনিবেশিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মৃত্যুর পরওয়ানা। পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আব্দুর রব তার ভাষণে বলেছিলেন, আজ থেকে এটাই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সেদিন লাখ লাখ ছাত্র-জনতা মনেপ্রাণে স্বাধীনতার পতাকাকে সম্মান প্রদর্শন করে সালাম জানিয়ে হূদয়ে গ্রহণ করেছিল। পরদিন ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঢাকাসহ পূর্ব বাংলায় হরতাল পালিত হয়। ২ ও ৩ মার্চ হরতাল দমনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে অনেক মানুষ হত্যা করে। ৪ মার্চ সকালে নিহতদের লাশ সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া সরকারকে উৎখাতের আহ্বান জানান।

৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সামনে ইশতেহার ঘোষণা করা হয় এবং তা পাঠ করেন শাহজাহান সিরাজ। ঐতিহাসিক এই ইশতেহারে বলা হয় ৫৫ হাজার ৫০৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকার  কোটি মানুষের আবাসভূমি হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাম ‘বাংলাদেশ’। এ সমাবেশে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। সভায় পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা ব্যবহার ও নির্দেশনা দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে স্বীকৃতি ও নির্দিষ্ট করা হয়। ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এলে বঙ্গবন্ধু গাড়িতে কালো পতাকা লাগিয়ে বৈঠকে যোগদান করেন। ইয়াহিয়া খান কালো পতাকা দেখে বুঝতে পারলেন বঙ্গবন্ধু কী চাচ্ছেন? ২৩ মার্চ জয় বাংলা বাহিনী সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা আ স ম আব্দুর রব সবাইকে নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন এবং বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ও গাড়িতে সেই পতাকা লাগিয়ে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার এই পতাকা হাতে নিয়ে বাঙালি ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে শ্রদ্ধা জানান।  সময়ের ব্যবধানে আমরা যেন ২ মার্চ পতাকা উত্তোলন দিবসকে ভুলে না যাই। ২ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক দিন। এ পতাকা দিবস যুগযুগান্তরে বাঙালির নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় আগ্রহী করে তুলবে। বাঙালির প্রতিটি রক্তের ফোঁটা পতাকার লাল বৃত্তের অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক ‘লাল সবুজের’ পতাকার প্রতি আমরা যেন শ্রদ্ধাশীল হই। যেখানে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’, গানটি গেয়ে পতাকা উত্তোলন করা হয়, সেখানেই এদেশের সব নাগরিকে দাঁড়িয়ে পতাকার প্রতি সম্মান জানাতে হয়। আমরা যেন কখনো এ কথাটি ভুলে না যাই। এ পতাকায় জড়িয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের করুণ ইতিহাস।

লেখক: কলামিস্ট ও সমাজবিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন