রোববার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

রাজধানীর সোয়া ৩ লাখ ভবনের অনুমোদন নেই

  • জরিমানার মাধ্যমে বৈধতা দিতে হচ্ছে ‘নীতিমালা’
  • ৯০ শতাংশ ভবনের নেই ব্যবহার সনদ
  • তৃতীয় পক্ষ দিয়ে ফিটনেস যাচাই করতে চায় রাজউক
আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ০৯:৩১

প্রতি বছর রাজধানীতে বাড়ছে অনুমোদনহীন ভবনের সংখ্যা। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন এলাকায় যারা অনুমোদন নিয়েছেন, এর মধ্যে ৯০ ভাগেরই নেই অকুপেন্সি বা ব্যবহারের সনদ। যার কারণে নকশার বিচ্যুতি করে গড়ে ওঠা এসব ভবনে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। রাজউক থেকে নকশার অনুমোদন একরকম নিলেও সেটি মানা হচ্ছে না। রাজউক বলছে, এসব ভবনের বিচ্যুতি নিয়ন্ত্রণে বছরে গড়ে ৫ হাজার নোটিশ দেয় তারা। গত বছর রাজউকের পক্ষ থেকে বিচ্যুতি প্রতিরোধে ১ হাজার ৮৯০টি ভবনে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

২০২২ সালে গেজেটভুক্ত হওয়া রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) জরিপের তথ্যমতে, রাজউক এলাকায় প্রায় ২১ লাখ ৪৫ হাজার ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একতলা থেকে বহুতলা ভবন রয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার। এসব ভবনের মধ্যে মাত্র ২ লাখের অনুমোদন রয়েছে, বাকি প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার ভবনের কোনো অনুমোদন নেই। পাশাপাশি ১৬ লাখের বেশি সেমিপাকা ভবনও অবৈধ। রাজউকের আওতাধীন এলাকা ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৩০৫ বর্গকিলোমিটার, সাভার উপজেলা, কেরানীগঞ্জ উপজেলা, নারায়ণগঞ্জ, ভুলতা ও গাউছিয়া।

রাজউক সূত্র বলছে, দুই সিটির ভেতরে যেসব স্থানে অবৈধ ভবন রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে ডেমরা, বসিলা, ঢাকা উদ্যান, কামরাঙ্গীরচর, সারুলিয়া, নাসিরাবাদ, ডুমনি, উত্তরখান, দক্ষিণখান, হরিরামপুর, ভাটারা, বাড্ডা ও পুরান ঢাকা। আর ঢাকার দুই সিটির বাইরে সাভার, কেরানীগঞ্জ, ভুলতা, গাউছিয়া ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় শত শত ভবন অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। রাজউকের কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই হাউজিং প্রকল্পের নামে কেরানীগঞ্জে অর্ধশত আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ভবনে বসবাস বা ব্যবহারের আগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে ব্যবহার বা বসবাস সনদ নিতে হবে। ২০০৮ সালে এই আইন চালুর পর ১০ ভাগ ভবনও এই সনদ নেয়নি বলে জানা যায়। 

নগরবিদ ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত, অকুপেন্সি সার্টিফিকেট না নেওয়ায় নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মিত হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করা যাচ্ছে না। কোনো ভবন মালিক অনিয়ম করে নকশায় পরিবর্তন আনলেও তা ধরা পড়ছে না। ফলে নির্মিত ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলেও তা চিহ্নিত হচ্ছে না। আর ভবন ব্যবহার সনদ না নিলে রাজউক থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো নজির নেই।

রাজউকের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, হাজার হাজার অবৈধ ভবন ভেঙে ভবন নির্মাণকাজ শৃঙ্খলায় আনা রাজউকের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য অবৈধ ভবনগুলোকে বৈধ করে দিতে চায় রাজউক। এজন্য ড্যাপের প্রস্তাব রয়েছে। তার আলোকে একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।

তারা জানান, অবৈধ ভবনকে বৈধ করতে চারটি ক্যাটাগরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রাজউক। যারা জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ করেছে, তারা স্বল্প পরিমাণ জরিমানা দিয়ে ভবনের অনুমোদন পাবে। আর যাদের বিল্ডিং অনুমোদন ও নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের হার বেশি থাকবে, তাদের জরিমানার পরিমাণ বেশি হবে। পাশাপাশি জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ করা ভবন বা অনেক বেশি নিয়ম লঙ্ঘন করা হলে সেখানে কোনো ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হবে না।

অন্যদিকে ঢাকার ভবনগুলোর দুর্ঘটনা রোধ ও নকশা অনুযায়ী নির্মাণ নিশ্চিত করতে ‘থার্ড পার্টি এন্ট্রি (টিপিই)’ নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব আইন ও বিধি পর্যালোচনা করে গাইডলাইনও তৈরি করবে সংস্থাটি। রাজউক সূত্রে জানা যায়, টিপিইর মাধ্যমে ভবনের ফিটনেস যাচাই করে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ নয়, ঝুঁকিপূর্ণ, রেট্রোফিটিং বা পুনর্নির্মাণ করার সুপারিশ করবে। থার্ড পার্টির পরিদর্শকদের রাজউক পরিচয়পত্র দেবে, যা তাদের ইমারত পরিদর্শনের অধিকার দেবে। তবে অনুমোদনহীন ভবনগুলোর ফিটনেস যাচাই করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত রাজউক গ্রহণ করবে। সূত্র আরো জানায়, ভবনসংক্রান্ত রাজউকের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা অথরাইজড অফিসার ও সহকারী অথরাইজড অফিসারের তত্ত্বাবধানে থাকবে ‘থার্ড পার্টি এন্ট্রি’ (টিপিই)। এই কর্মকর্তারা যেকোনো সময় টিপিইদের কার্যক্রম তদারক করতে পারবেন। এসব কার্যক্রম তদারকি কৌশল শেখাতে তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনবে রাজউক।

এসব বিষয়ে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও মুখপাত্র মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশে নকশার বিচ্যুতি করা হয়েছে। রাজউক এলাকায় মাত্র ২ লাখের মতো ভবন তৈরি হয়েছে নকশা অনুমোদন নিয়ে।

ইত্তেফাক/এসটিএম