চুলবিভ্রাট

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ০৪:২৫

মুন্সীগঞ্জে সিরাজদিখানের সৈয়দপুর আব্দুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজে হিজাব পরে না আসায় সপ্তম শ্রেণির ছয় শিক্ষার্থীর চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ-সমালোচনা-প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। উল্লিখিত ঘটনাটির ভালোমন্দ, উচিত-অনুচিতের আলোচনায় আমরা যাব না। আমরা বরং চুল নিয়ে বা চুল কেটে দেওয়ার ইস্যুটি নিয়ে একটু কথা বলতে পারি। আমাদের দেশে অনেকেই শাস্তি হিসেবে ‘চুল কেটে দেওয়া’, ‘মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া’র কাজটি করে থাকেন। চুল কেটে দেওয়া ‘শাস্তি’ হিসেবে বিবেচিত হয় কীভাবে, তা মোটেও বোধগম্য নয়। চুল তো আমরা নিয়মিতই কেটে থাকি। হ্যাঁ, চুলের গোছা ধরে টানলে, কিংবা চুল ওঠানোর চেষ্টা করলে আমরা ব্যথা পাই। সেটা একটা শাস্তি হতে পারে। কিন্তু কারোর চুল কেটে দিলে কী এমন ক্ষতিবৃদ্ধি হয়? কয়েক দিন পর তো সেই চুল গজাবেই! তাহলে কেন চুল নিয়ে এমন আহাম্মুকি কাণ্ড?

চুল দুই অক্ষরের একটা ছোট্ট শব্দ হলেও এর গুরুত্ব উপেক্ষণীয় নয়। চুল নিয়ে ছেলেমেয়ে উভয়ের মধ্যেই একটা আদিখ্যেতা কাজ করে। একটা সময় ছিল যখন চুল নিয়ে মেয়েরা মাথা ঘামাত বেশি। এখন অবশ্য আধুনিক মানুষের কাছে চুল তার জেন্ডার পরিচয়কে বড় বেশি তুলে ধরতে পারে না। এখন মেয়েরা যেমন ছোট চুলে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, আবার ছেলেরাও বাবরি রাখছে, অনেকে বেণিও বাঁধছে। আজকাল শ্যাম্পু, জেল, ডাই, কন্ডিশনার ইত্যাদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক কমে এসেছে। আমাদের যুগে এসব তো দূরের কথা, টয়লেট সাবান না থাকলে কাপড় কাচার বল সাবান দিয়ে মাথার চুল পরিষ্কার করেও আমরা ক্লাসে গেছি। এখনকার ছেলেমেয়েরা এ কথা শুনলে নির্ঘাত আঁতকে উঠবে।

আজকাল পৃথিবীর কমবেশি সব দেশেই মানুষ তাদের চুলের সৌন্দর্য সম্পর্কে অতি সচেতন। নামিদামি কসমেটিকস উত্পাদনকারী কোম্পানিগুলি প্রতি বছর লক্ষকোটি ডলার উপার্জন করে শুধু তাদের শ্যাম্পু, কন্ডিশনার ও নানা রকম হেয়ার প্রডাক্ট বিক্রি করে। বস্তুত, আধুনিক যুগে মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি অন্যতম বড় অংশ হলো তাদের মাথার চুল এবং চুলের স্টাইল; এবং সেটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। ক্রাউনিং গ্লোরি বলে কথা! পৃথিবী জুড়ে এই চুল নিয়ে চুলোচুলি বা অবসেশন আছে। আবার ন্যাড়া মাথাও ইদানীং ফ্যাশন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গত শতকের আশির দশকে আমরা যখন নাইন-টেনে পড়েছি, তখন চুলে জবজব করে সরিষার তেল মেখে পরিপাটি করে আঁচড়ে ক্লাসে যেতাম। আমাদের দুই চিপ গড়িয়ে সরিষার তেল চুঁইয়ে গালের ওপর এসে পড়ত। আমাদের স্কুলের অঙ্ক স্যারের একটা বদভ্যাস ছিল। ক্লাসের কোনো ছাত্র অঙ্ক না পারলে শাস্তি হিসেবে তার চিপ ধরে তিনি টেনে তুলতেন। অনেকের বেলায় তার হাতের আঙুল বারবার পিছলে যেত। এরপর সময় যত এগোতে থাকল, সমাজের মানুষের রুচি-পছন্দ-ফ্যাশনও খুব দ্রুত বদলাতে থাকল।

অনেকের কাছে চুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে চুল উঠে টাক পড়ে যাওয়ার মতো দুঃখের কিছু নেই। আমার এক পরিচিতজন চুল উঠে যাওয়ার চিন্তায় একেবারে রোগা হয়ে যায়। সে প্রতিদিন চিরুনিতে বিচ্যুত চুলের গুচ্ছ দেখে আর বিভিন্ন গোপন সূত্র থেকে প্রাপ্ত কোম্পানিতে দৌড় লাগায়। অনলাইনে প্রতিদিনই তার নামে বিভিন্ন হেয়ার টনিক, হেয়ার ভাইটালাইজার, হেয়ার সেরাম ইত্যাদি আসে। তার বিছানা টেবিল সর্বত্র অ্যান্টি হেয়ারফল প্রোডাক্টে ভর্তি। তবুও চুল পড়া আটকানো যায়নি।

যে চুল মানুষের এত প্রিয়, আবার সেই চুল খাবারে দেখতে পেলে অনেকেই চটে যান। এখানে কবুল করা ভালো, আমার কাছেও ব্যাপারটি সুখকর মনে হয় না। পরিহাস হলো, খাবারে চুল থাকার ঘটনা আমার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি ঘটে। যদিও আমি এর কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ বের করতে পারিনি। নামজাদা হোটেল থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধবের বাড়ি, বড় বড় ভোজসভা, সর্বত্র আমার খাবারে চুল থাকাটা অতি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে ঘনিষ্ঠজনরা এখন মেনে নিয়েছে।

একবার এক পাঁচতারা হোটেলেও বিস্মিত হয়ে দেখেছি আমার মাটন-কারিতে একটি সুদীর্ঘ চুল। হোটেল বয়কে ডেকে অভিযোগ করায় সে উত্তর দেয়, ‘তাহলে এইমাত্র পড়েছে। আমাদের খাবারে কখনো চুল পড়ার কমপ্লেন কেউ করেনি।’

আমার লেনিনীয় টাক থেকে এমন সুদীর্ঘ চুল কীভাবে এইমাত্র পড়বে, সে আলোচনায় আর যাইনি। হোটেল বয়ের বাক্স্বাধীনতার অধিকার মেনে নিয়ে তার দৃঢ়তার কাছে নতি স্বীকার করে অগত্যা সেই চুল সরিয়ে মাংসখণ্ড খেতে হয়েছিল।

আমাদের সমাজে অবশ্য ভদ্রলোকের পছন্দ-অপছন্দ কিংবা মতামতের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। ঘরে খেতে বসে সম্প্রতি পাঁচমিশালি তরকারিতে একটা দশাসই চুল পেয়েছিলাম, যেটা ফুলকপি হয়ে কাঁচকলাকে জড়িয়ে কুমড়োতে পাক খেয়ে আলুকে গিয়ে আলিঙ্গন করেছে। বউয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা মাত্র সে বলে, ‘আমার একটা চুল যদি তরকারিতে পড়েই থাকে, তাহলে এমন তুলে দেখানোর কী আছে? ফেলে দিয়ে খেয়ে নাও। আমার চুলে তোমার চুলের মতো খুশকি নেই। রীতিমতো পরিষ্কার থাকে, একদিন পরপর শ্যাম্পু দিই, কন্ডিশনার দিই, ইন্ডিয়ান অ্যামন্ড মাখি রোজ, বুঝলে?’

আমাকে বুঝতেই হয়!

পরিশেষে চুল নিয়ে একটা প্রচলিত কৌতুক। গ্রামের একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুল। উপজেলা সদর থেকে খবর এসেছে আগামী রোববার স্কুল ইন্সপেক্টর স্কুল পরিদর্শনে আসবেন। স্কুল ইন্সপেক্টর আসার খবর পাওয়ার পর স্কুলের হেডমাস্টারসহ সব টিচারই ব্যস্ত সময় কাটাতে লাগলেন স্কুলের ক্লাসরুম, বারান্দা, পায়খানা-প্রস্রাবখানা সব ঝকঝকে পরিষ্কারের কাজে। গাছ থেকে একটি ঝরা পাতা উড়ে এসে বারান্দায় পড়লে হেডমাস্টার কাউকে কিছু না বলে নিজেই ঝট করে পাতাটা তুলে ফেলছেন। দুই সপ্তাহ আগেই ছাত্রছাত্রীদের বলে দেওয়া হয়েছে, সেদিন যেন সবাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোশাক পরে স্কুলে হাজির হয়। কারণ ঐ দিন স্কুল ইন্সপেক্টর আসবেন স্কুল পরিদর্শনে।

গত মাসে ইন্সপেক্টর যখন এসেছিলেন, তখন ছাত্রদের জিগ্যেস করেছিলেন দেশের রাষ্ট্রপতির নাম। জবাবে সবাই রাষ্ট্রপতির নাম না বলে বলেছিল প্রধানমন্ত্রীর নাম। তাতে স্কুলের সম্মানহানি হয়েছে।

যদিও সেই ইন্সপেক্টর বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। নতুন ইন্সপেক্টরের এই প্রথম পরিদর্শন। এবারও ছাত্রছাত্রীরা যদি একই ভুল করে, তাই রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সবার নামই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের ঠোঁটস্থ করানো হয়েছে, যাতে জিগ্যেস করার আগেই সঠিক জবাব দিতে পারে।

রোববার যথারীতি ইন্সপেক্টর স্কুলে এসে পৌঁছালেন। হেডমাস্টার থেকে শুরু করে সব টিচারের মধ্যেই একটা নীরব আতঙ্ক। নতুন ইন্সপেক্টর কাকে কী জিগ্যেস করেন, যদি সঠিক জবাব দিতে না পারে? স্কুলের টিচারদের সঙ্গে নিয়ে তিনি পদচারী করতে করতে ক্লাস ফাইভের রুমে গিয়ে ঢুকলেন। ছাত্রছাত্রীরা সমস্বরে স্কুল ইন্সপেক্টরকে অভিবাদন জানিয়ে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনি হাত নেড়ে অভিবাদন গ্রহণ করে সবাইকে বসতে বললেন।

নিজের পরিচয় দিয়ে নাতিদীর্ঘ শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখলেন ইন্সপেক্টর। এরপর তিনি ছাত্রছাত্রীদের পর্যায়ক্রমে পরিচয় নিলেন। পরিচয়পর্ব শেষে তিনি জিগ্যেস করলেন, একই বস্তু স্থান-কালভেদে বিভিন্ন নাম ধারণ করে, এমন একটি বস্তুর উদাহরণ দিতে পারো? ক্লাসের ফার্স্ট বয় রাকিব উঠে জবাব দিল, হ্যাঁ, আমি পারব, স্যার। পানি।

পানি স্থান-কালভেদে বিভিন্ন নাম ধারণ করে, যেমন সাধারণত এটি যখন নদী বা খাল-বিলে থাকে, তখন একে আমরা পানিই বলি। এই পানি যখন ফ্রিজে রাখা হয়, তখন জমে আইস বা বরফ হয়। যখন ফুটিয়ে রান্নার কাজে ব্যবহার হয়, পানি তখন ফুটে উপরের দিকে উড়ে যায়, তখন এর নাম হয় বাষ্প। সেই বাষ্প যখন আকাশ থেকে কিউব আকারে নিচে পড়ে, তখন আমরা তাকে বলি শিলা। ছাত্রের জবাবে ইন্সপেক্টর খুশি হয়ে বললেন, ধন্যবাদ।

ইন্সপেক্টর আবারও জিগ্যেস করলেন আর কেউ বলবে? এবার ক্লাসের দুষ্ট ছেলেটা উঠে দাঁড়াল, যার নাম পিন্টু। সে উঠে দাঁড়াতেই ইন্সপেক্টরের সঙ্গে থাকা হেডমাস্টারের কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়—না জানি পিন্টু কী উলটাপালটা বলে? এই ছেলেটা বাঁকা ছাড়া সোজা কথা কখনো বলে না। ইন্সপেক্টরের অনুমতি পেয়ে পিন্টু বলে, চুল স্যার। এরপর সে নিজ মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে শুরু করল, এই যে আমি স্পর্শ করছি, এখানে অর্থাত্ মাথায় গজালে এটার নাম চুল। চোখের ওপর গজালে ভ্রু, ঠোঁটের ওপর গজালে গোঁফ, ঠোঁটের নিচে গজালে দাড়ি। বুকে গজালে লোম। এবার হেডমাস্টার চিত্কার দিয়ে তাকে থামিয়ে বললেন, আর নিচে নামিস না রে পাগলা, নিচে নামিস না!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন