কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই) লইয়া আমাদের জীবনে এক নূতন হাওয়া লাগিয়াছে, আর তাহার সহিত পাল্লা দিয়া উঁকি দিতেছে জানা-অজানা একগাদা সম্ভাবনা ও সংশয়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইহা এক নিত্য ও অতি পরিচিত বিড়ম্বনা। অতীতেও দেখা গিয়াছে, আইনস্টাইনের যেই তত্ত্ব মানুষের জ্ঞান উন্মোচনের নূতন দ্বার খুলিয়া দিয়াছিল, সেই একই তত্ত্বকে কাজে লাগাইয়া হইয়াছিল হিরোশিমা-নাগাসাকির মতো বিভীষিকা। যেই মোবাইল ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনকে কিছুটা সহজ করিয়া তুলিয়াছিল, এখন তাহারাই আবার আমাদের সহজ-সরল ও সামাজিক জীবনে যেই স্বাভাবিক বন্ধন, তাহা টিকাইয়া রাখিবার পথে বাধা হইয়া দাঁড়াইতেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই ধারার নূতন এক সংযোজন।
স্পেস-এক্স ও টেসলা মোটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়াম্যান ইলন মাস্ক বলিয়াছেন—‘বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বল্প সময়ে যেমন দ্রুততার সহিত অগ্রগতি লাভ করিতেছে, বিজ্ঞানের অন্য কোনো শাখা এত দ্রুত গতিতে কখনো আগাইতে পারে নাই।’ তবে তিনি এই আশঙ্কাও ব্যক্ত করিয়াছেন যে, ‘মানবজাতির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পারমাণবিক বোমার চাইতে বড় হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হইবে।’ তাহার এমন আশঙ্কার যথেষ্ট কারণও রহিয়াছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক অঘটনঘটনপটীয়সী হিসাবে উপস্থিত হইয়াছে আমাদের জীবনে। আদেশ করামাত্র ইহা আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের মতো অসম্ভবকে সম্ভব করাইয়া দেখাইতেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনপ্রিয় সংস্করণ ‘চ্যাটজিপিটি’, ‘ডাল-ই’, ‘সোরা’ ইত্যাদি সফটওয়্যারের মাধ্যমে এমন সকল কার্য সাধন করা যাইতেছে যাহা কয়েক বত্সর পূর্বেও মানুষের কল্পনার বাহিরে ছিল। একজন ব্যক্তির মুখের অবয়ব ও কণ্ঠ হুবহু নকল করিয়া সম্পূর্ণ নূতন ভিডিও তৈরি করা হইতেছে। আবার এমনও ব্যক্তি, স্থান বা দৃশ্য তৈরি করা যাইতেছে যাহার কোনো অস্তিত্বই নাই এই দুনিয়ায়, অথচ মনে হইতেছে কোথাও বিদ্যমান। জাতীয় নির্বাচন কিংবা বৈশ্বিক সম্মেলন—যাহাই হউক না কেন, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা মারাত্মক হইতে পারে তাহা সহজেই অনুমেয়।
বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতির কল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমানে এক অপরিহার্য বাস্তবতা। এই প্রযুক্তির বহু ইতিবাচক দিকও রহিয়াছে। আশঙ্কা কিংবা সম্ভাবনা, যাহাই বলি না কেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাইবে তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই আসন্ন পরিবর্তনকে মানবজাতির অনুকূলে রাখিবার জন্য ইহার নেতিবাচক দিক নিয়ন্ত্রণ করিতে কাঁটা দিয়া কাঁটা তুলিবার মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেই ব্যবহার করা যাইতে পারে; কিন্তু কোনোভাবেই ইহার নিকট আত্মসমর্পণ করা যাইবে না। দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা রজনীকান্ত অভিনীত ‘রোবট’ চলচ্চিত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আমাদের উদ্দেশে একটা শিক্ষণীয় বার্তা রহিয়াছে। প্রযুক্তি মানুষেরই সৃষ্টি। সৃষ্টি যদি তাহার স্রষ্টার চেয়ে শক্তিমান হইয়া উঠে, তাহা হইলে ভয়ংকর বিপর্যয় নামিয়া আসিবে। প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে ইহার ব্যবহার হিতে বিপরীত হইয়া যাইবে। প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষকে প্রযুক্তির দাস করিয়া তুলিতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আশীর্বাদ ও অভিশাপের মিশ্রণ বিবেচনা করিয়া ইহার ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে কৃত্রিম হইতে পারে; কিন্তু ইহার তৈরি সংকট কৃত্রিম নহে। মেধা ও মননশীলতা ছাড়াও মানুষ স্বতন্ত্র ও অগ্রসর তাহার হূদয়বৃত্তির কারণে। হূদয়বৃত্তিকে উপেক্ষা করিয়া শুষ্ক বুদ্ধিমত্তার জোরে সাময়িক সাফল্য আসিতে পারে; কিন্তু ইহার জন্য মূল্য দিতে হইবে অনেক বেশি। বুদ্ধি ও বিবেক মানুষের অনন্য সম্পদ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব এই অনন্য সম্পদের চাইতে অধিক হওয়া চরম অশনিসংকেতের লক্ষণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অকৃত্রিম সংকটের ঝুঁকি মাথায় রাখিয়া ইহার ব্যবহারে সতর্কতা ও সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন। ইহার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করিতে হইবে।
