অন্যান্য মুসলিম প ্রধান দেশে রমজানে দ্রব্যমূল্য কমলেও বাংলাদেশে রোজার সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়তে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য। ফলে সীমিত ও নিম্ন-আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। রমজানে পণ্যের দাম আরো বাড়বে—এমন শঙ্কায় দিশেহারা সাধারণ মানুষ। হঠাত্ করে দামের এমন ঊর্ধ্বগতিতে বিপাকে পড়ছেন খেটে খাওয়া লোকজন। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সরকার-সিন্ডিকেটের পালটাপালটি দোষারোপে পিষ্ট হচ্ছে জনগণ।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ (বুধবার) সরকারের বিপণন সংস্থা ‘ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)’-এর প্রকাশিত পণ্যতালিকায় দেখা যায়, গত এক মাসের ব্যবধানে গরুর মাংস, ব্রয়লার মুরগি, ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, শুকনা মরিচ, হলুদ, দারুচিনি, তেজপাতা ইত্যাদি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সিন্ডিকেটের কারণে ব্রয়লার ও গরুর মাংসের দাম কমছে না। এছাড়া উচ্চ শুল্কের কারণে আকাশচুম্বী হয়েছে চিনি ও খেজুরের দাম। চলতি অর্থবছর থেকে এনবিআর খেজুরকে বিলাসী পণ্য হিসেবে মূল্য ধরছে। ফলে আমদানি করা ১২০ টাকা কেজি দরের খেজুরে ২১০ টাকা শুল্ক দিয়ে বর্তমানে ৩৩০ টাকা কেজি দরে বাজারে বিক্রি কর হয়।
‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)-এর তথ্য মতে, রমজান উপলক্ষ্যে যেন নতুন করে এসব পণ্যের দাম আর না বাড়ে, সেজন্য চলতি মাসের শুরুতে চাল, ভোজ্য তেল, চিনি ও খেজুরের আমদানি কর কমিয়ে দেয় সরকার। এছাড়া রোজার উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। একইভাবে, ভোজ্য তেল ও চিনি আমদানিতেও কর কমিয়ে দিয়েছে, রমজান উপলক্ষ্যে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং পাম তেল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে কোনো সংকট নেই। কিন্তু কিছু ‘অসাধু আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ’ বাড়তি মুনাফা পেতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে রমজান মাসে বাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে। পক্ষান্তরে ব্যবসায়ীদের মতে ডলারের মূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণপত্র (এলসি) খোলা নিয়ে নানান জটিলতার কারণে সার্বিকভাবে পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের বাজারে ইতিমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিসেরই দাম বেড়ে গেছে।
মোদ্দা কথা, দ্রব্যমূল্যের দাম অতিরিক্ত পরিমাণে বাড়ানোর পর লোক দেখানোর জন্য কিছু পরিমাণ কমিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে বেড়ানোই বর্তমান রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সরকার ব্যাবসায়ী ও সিন্ডিকেটদের ওপর দোষারোপ করে। আর তারা উলটোভাবে সরকারকে দোষারোপ করে। মাঝখানে চ্যাপটা হয় খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণ।
রমজানে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রথাগত সরবরাহ প্রক্রিয়া অর্থাত্ অতিরিক্ত মজুতের মাধ্যমে পণ্যের কৃত্রিম সংকট দূর করার জন্য বাজার পর্যাপ্ত মনিটরিং করতে হবে। রমজানে বিভিন্ন পণ্যের বাড়তি চাহিদা সামনে রেখে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যাতে বাজার অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে তত্পর থাকতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির বিষয়টি নতুন না হওয়ায় কর্তৃপক্ষের জোরালো নজরদারি অব্যাহত রাখা জরুরি। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে আইন সংস্কার করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উত্পাদন এবং পণ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সরকার, সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়ী একে অপরকে দোষারূপ না করে সমন্বিতভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
