কয়েক দিন আগেই লাল-সবুজের জার্সিতে গোললাইনের নিচে ইয়ারজান বেগমকে দেখেছে বাংলাদেশ। সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে হারানোর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে সে। কিন্তু এই গোলরক্ষক একসময় রক্ষণ ও আক্রমণেও খেলেছে। তবে থিতু হয়েছে গোললাইনের নিচে। পঞ্চগড়ে বেড়ে ওঠা এই ফুটবলকন্যার ঘরে কিছুদিন আগেও ছিল না টিভি। মেয়ের খেলার খবর জানতে বাবাকে রেডিওর ওপরেই ভরসা করতে হতো। এখন প্রেক্ষাপট বদলেছে, বদলেছে বাংলাদেশ ও নিজের ভাগ্যও। এগিয়ে যেতে চায় কেবল সামনের দিকেই।
ইয়ারজান বলেছে, ‘স্কুল পর্যায়ে গোলকিপার হিসেবে খেলতাম। এরপর একাডেমিতে গিয়ে ইচ্ছা হলো স্ট্রাইকার হিসেবে খেলি। তখন দেখি আমাদের ডিফেন্সে সমস্যা। সেখানেও খেলেছি। এর পরে আমাদের কোচ আমাকে গোলকিপারে খেলতে বললেন। এরপর থেকেই সেখানে খেলা শুরু করি।’
নিজের পথচলা নিয়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলের এই গোলরক্ষক বলেছে, ‘বলতে গেলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ফুটবলে আমার যাত্রা শুরু হয়েছে। ফুটবলের প্রতি ভালো লাগা ও ভালোবাসা থাকলেও সেভাবে খেলার সুযোগ হতো না। স্কুলের যে টুর্নামেন্টগুলো হতো, সেখানে খেলতাম। তাতে সব সময় ফুটবলটা চর্চায় রাখা হয়নি। যখন টুর্নামেন্ট থাকত, তখনই খেলতাম।’
স্কুলের টুর্নামেন্টে খেলে ফুটবলের প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট হয় ইয়ারজান। এরপর কোচ আবু তালেবের পরামর্শে যোগ দেয় পঞ্চগড়ের একটি ফুটবল একাডেমিতে। সেখান থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু হয়েছিল। ইয়ারজান বলেছে, ‘কোচ প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তুমি একাডেমিতে আসো, অনেক ভালো কিছু হবে। পরে বাবার সহায়তায় সেখানে ভর্তি হই। বাবা খেলা পছন্দ করেন। আসলে বাবা পাশে থাকার কারণে আজ আমি এত দূর আসতে পেরেছি।’
ইয়ারজান আরও বলেছে, ‘কোচের পরামর্শে আমি নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি। একপর্যায়ে তিনি আমাকে বলেছেন, তুমি একটু কষ্ট করতে পারলে ঢাকা লিগ, ক্লাব লিগগুলোতে খেলতে পারবা। আমি সেখান থেকে আরো বেশি কষ্ট করা শুরু করি। আমাকে সেভাবে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। আমি ক্লাব লিগগুলো খেলা শুরু করলে কোচও আমাকে নিয়ে আশাবাদী হন। আমাকে উত্সাহ দিতেন। বলতেন, তুমি যদি আরো মনোযোগী হও, তাহলে জাতীয় দলের বয়সভিত্তিক ফুটবলে খেলতে পারবে।’
পঞ্চগড়ের কন্যা জানত, কষ্ট করলে তার ফল পাওয়া যাবে। বাস্তবে সেটি পেয়েছেও। ইয়ারজান সে বিষয়ে বলেছে, ‘একদিন ঢাকায় ট্রায়ালের সুযোগ পাই। ট্রায়াল থেকে ক্যাম্পে সুযোগ পেলাম। সেজন্য বাফুফের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আর তার পরে তিন মাস সময় পাই। এর পরেই সফলতা আসছে। আমাদের দল একসঙ্গে হয়ে খেলেছে। আমাদের বন্ধন অনেক দৃঢ় ছিল।’
আমাদের সমাজে একজন নারী ফুটবলার বা ক্রীড়াবিদকে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সহ্য করে মাঠে নামতে হয়। এর আগেও সফল তারকারা সেই সব অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। ইয়ারজানের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে বাবা সামলেছেন সব এক হাতে। সেই সব অভিজ্ঞতার কথা মনে করে বলে, ‘যেহেতু গ্রামে বসবাস করি, সেহেতু অনেকেই অনেক কথা বলেনে। আমাদের বাড়িতে যেতে হলে বাজারের ওপর দিয়ে যেতে হয়। সেখানে অনেক কথা বলত। বাবা যখন বাজার দিয়ে যেতেন, তখন সবাই বলতেন, এটা তো তোর মেয়ে না, তোর ছেলে। বাবাও তাদের মুখের ওপরে বলে দিতেন, ‘হ্যাঁ ইয়ারজান আমার ছেলেই। বাবা ঐভাবে পাশে ছিলেন বলে আজ এখানে আসতে পেরেছি।’
বাবা আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে উদীয়মান এই গোলরক্ষক বলেছে, ‘আমার খেলা যেদিন থাকে, সেদিন বাবা খাবেনও না, বাজারেও যাবেন না। টিভির কাছে থাকবেন। এক বছর হলো টিভি কেনা হয়েছে। এর আগে যখন টিভি ছিল না, তখন বাবা এফএম রেডিওতে খেলা শুনতেন।’
ইয়ারজান অনুসরণ করে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে। তাকেই অনুসরণ করে সাফের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে গোল ঠেকিয়েছে বলে জানায়। নিজেকে জাতীয় দলের জার্সিতে দেখতে চায় বলেও জানিয়েছে। সেই লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে অনূর্ধ্ব-১৬ দলের এই তারকা। ইচ্ছা রয়েছে দেশের হয়ে আরও অনেক শিরোপা জিতবে। সেজন্য সবার সমর্থন চেয়েছে ইয়ারজান।
