তাহারা আসলে কোথায় নাই—ইহাই বড় প্রশ্ন

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৪, ০৭:৩০

সদ্য অনুষ্ঠিত এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুকৌশলে জয়লাভ করিয়াছে অনুপ্রবেশকারী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এই কথা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি বলাই বাহুল্য; কিন্তু সমস্যা হইল, গণতন্ত্রপন্থিরা সকল কিছুকে হালকাভাবে গ্রহণ করিয়া থাকেন। যেন ‘কুছ নেহি হোয়া’ বা কোনো কিছুই হয় নাই, এমন মনোভাব কাজ করে তাহাদের মধ্যে।

এদিকে যাহারা অপকৌশলের মাধ্যমে বিজয়ী হইয়াছেন, তাহারাও আছেন নির্ভাবনায়। কেননা তাহাদের সহিত রহিয়াছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রহিয়াছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। এমনকি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের উচ্চ ও মধ্যম পর্যায়ের অনেক নেতারও সমর্থন রহিয়াছে তাহাদের অনুকূলে। সুতরাং তাহাদের চিন্তা কীসের?

অনেকে তর্কের খাতিরে বলিতে পারেন, দেশে এখন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বলিতে তেমন কিছু নাই; কিন্তু তাহাদের সন্তানরা কি নাই? নাতি-পুতিরা নাই? রাজাকার, আলবদর, আল-শামসসহ যাহারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, তাহাদের চিন্তা ও আদর্শের উত্তরাধিকারীরা কি নাই? তাহাদের মধ্যে কতজন ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানিভাব মুছিয়া ফেলিতে পারিয়াছেন? এই ব্যাপারে যদি প্রশ্ন থাকে, তাহা হইলে দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নাই—এমন প্রশ্ন ধোপে টিকে না। বরং কেহ কেহ মনে করেন, তাহারা পূর্বপুরুষদের চাইতেও ভয়ংকর। তাহারা আসলে কেউটে সর্প। ইতিপূর্বে সরকারের পক্ষ হইতে বহুবার বলা হইয়াছে যে, তাহাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হইতেছে।

এই ষড়যন্ত্রকারী বলিতে আসলে কাহাদের বোঝানো হইয়া থাকে? তাহারা পূর্বে প্রায়শ এই কথাও বলিতেন যে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে প্রতিহত করিতে হইবে; কিন্তু বর্তমানে লক্ষণীয় যে, তাহাদের গলার স্বর কিছুটা পরিবর্তিত হইয়াছে। এখন তাহারা নির্দিষ্ট করিয়া বিএনপি-জামায়াতের নাম লইয়া বলেন যে, তাহাদের প্রতিরোধ করিতে হইবে। স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিহত করিবার কথা এখন তাহাদের কণ্ঠে শোনা যায় না কেন? তাহা হইলে যাহারা বলিবার চেষ্টা করিতেছেন যে, দেশে স্বাধীনতাবিরোধী বলিয়া কেহ নাই, তাহা হইলে তাহাদের কথাই কি যুক্তিসংগত? এখন কণ্ঠস্বর বদল হওয়ায় কি বলা যায়, তাহাদের কোনো অস্তিত্বই নাই? কিন্তু আমরা যদি পালটা প্রশ্ন করি, তাহারা আসলে কোথায় নাই? প্রকৃতপক্ষে ইহাই আজিকার বড় প্রশ্ন। সরকারি প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ তাহারা সর্বত্র বিরাজমান বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। তাহা না হইলে তাহারা এত অর্থবিত্তের মালিক হন কীভাবে? প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি সেই খবর রাখেন না?

আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। আমরা যদি তাহাদের প্রতিহত করিতে না চাই, তাহা হইলে কথাবার্তায় তাহারই প্রতিফলন থাকা উচিত; কিন্তু আমরা মুখে বলিব এক কথা, আর কাজ করিব তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত, তাহা হইতে পারে না। ইহা যে কাহারও পক্ষে মানিয়া লওয়া কঠিন। ইহা সকলের জন্য বিপজ্জনকও বটে। কাহারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তাহা আমরা জানি না, এমনটিও নহে; কিন্তু সাময়িক সুবিধা লাভের জন্য এই ব্যাপারে স্পষ্ট করিয়া কিছু বলিতেছি না, যাহা দুর্ভাগ্যজনক। এই দ্বিচারিতা দেশ ও দশের জন্য ক্ষতিকর।

আমাদের প্রশ্ন, তাহাদের মধ্যে যাহারা অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক, তাহাদের এই অর্থ আসে কোথা হইতে? মাদক কারবারসহ এমন কোনো অন্যায়-অপকর্ম নাই, যাহা তাহারা করেন না; কিন্তু তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা আমরা কেন বলি না? একাডেমিক কারণেও তাহাদের সম্পর্কে জানা কি সংগত নহে? আমরা জানি, আমেরিকায় রাজনৈতিক দলগুলির আর্থিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। সেখানকার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা প্রত্যেকে চাঁদা দেন। ইহার চুলচেরা হিসাব থাকে; কিন্তু আমাদের দেশে তো সেই ব্যবস্থা অদ্যাবধি প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। অতএব, উপরোক্ত অনুপ্রবেশকারী ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি সম্পর্কে সজাগ হওয়ার এখনও সময় রহিয়াছে।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন