চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট বাজেটের মাত্র ২৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। টাকার অঙ্কে তা ১ লাখ ৯৪ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। এবার বাজেটের আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে বাজেটের আকার প্রতি বছর বাড়লেও বাস্তবায়ন হার আগের চেয়ে কমে যাচ্ছে। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।
মূলত অর্থ ব্যয়ে কৃচ্ছ সাধন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং ডলারের সংকটের প্রভাব পড়েছে বাজেট বাস্তবায়নে। ছয় মাসের হিসাবে গত বাজেট (২০২২-২৩) বাস্তবায়ন হার ছিল ২৭ শতাংশ এবং রাজস্ব আহরণ ৩৮ শতাংশ। এর আগের অর্থবছর (২০২১-২২) বাস্তবায়ন হার ২৮ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায় ৪২ শতাংশ। আর ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ছয় মাসে বাস্তবায়ন হার ২৭ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায় ছিল ৩৬ শতাংশ।
অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছে। চলতি হিসাবের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এতে আমদানির প্রবৃদ্ধি বিগত অর্থবছরের ছয় মাসের তুলনায় কমেছে ২৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বর্তমান ডলার-সংকটের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং মিতব্যয়ের কারণে এ খাতে খরচ হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া রাজস্ব আদায়ও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। অর্থবছরের ছয় মাসে পুরো লক্ষ্যমাত্রার ৩৬ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়েছে। অপরদিকে বিদেশি ঋণও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পাওয়া গেছে মাত্র ১০ শতাংশ। কৃচ্ছ সাধনের কারণে চলতি বাজেটে মোট ব্যয়ের মধ্যে ১৫ শতাংশ কম হবে এমন আভাস অর্থবছরের শুরুতেই দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথম দিকে টাকা ব্যয় কম হয়। শেষদিকে টাকা খরচের হিড়িক পড়ে। আর তখনই কাজের এবং অর্থ ব্যয়ের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এনবিআর কর ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রথম ৬ মাসে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা আদায় হয়। এটি মোট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ৩৬ শতাংশ। এনবিআরবহির্ভূত কর বাজেটে ২০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬ মাসে ৩ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। আদায় কম প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের পর্যালোচনায় বলা হয়, এমনিতে ডলার-সংকটে এলসি খোলার জটিলতা পণ্য আমদানি খাতকে সংকুচিত করেছে।
এদিকে সরকার পরিচালনা খাতে অর্থবছরের ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। এটি মোট ব্যয়ের ৩৩ শতাংশ। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ভাতা খাতে বেশি ব্যয় হয়েছে। অপরদিকে মূলধনি খাতে ব্যয় কম করা হয়। এছাড়া উন্নয়ন খাতে পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা খরচের পরিকল্পনা থাকলেও প্রথম ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪৩ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। বাজেটের টাকা কম ব্যয় হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন। ঐ সময় মন্ত্রণালয়গুলো টাকা খরচ কম করেছে।
এছাড়া অর্থবছরের শুরুতেই কৃচ্ছ সাধনের কারণ হিসেবে জ্বালানি খরচ, বিদেশ ভ্রমণ, জমি অধিগ্রহণ, সরকারি ভবন নির্মাণ, গাড়ি কেনাসহ বিভিন্ন ব্যয় খাতের ওপর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। এসব কারণে বিগত তিন অর্থবছরের তুলনায় এবার বাজেট বাস্তবায়নের হার কম। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হার গত এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে কম। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যে দেখা যায়, ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ২৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ২৪ দশমিক ০৬ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরের এ হার ছিল ২৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর আগে আগে ২০১০-১১ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল ২৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
