পায়রা বন্দরের প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৪, ১৯:১২

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার রাবনাবাদ চ্যানেলের পশ্চিম তীরে অবস্থিত বাংলাদেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা। এই বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল) মো. নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কলাপাড়া এলাকাবাসীর অভিযোগ, বন্দরের বিভিন্ন প্রকল্প এই কর্মকর্তার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বাস্তবায়ন হয়। এমনকি তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।

সম্প্রতি পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং কলাপাড়ায় সরেজমিন পরিদর্শন করে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানা গেছে। কলাপাড়ায় নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে পোস্টারিং করা হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনও করেছে। কলাপাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব তালুকদার সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পায়রা বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সরকার বেশকিছু জমি অধিগ্রহণ করেছিল। অনেকে জমিজমা হারিয়ে এখন বেকার ঘুরছেন। এই তালিকায় ক্ষমতাসীন দলের কিছু রাজনৈতিক কর্মীও রয়েছেন। কিছুদিন আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে প্রধান প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন এসব নেতাকর্মীদের আশ্বাস দেন যে, বন্দরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোতে তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের চাকরি দেবেন। এই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্তরা নাসির উদ্দিনের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে গেলে তাদেরকে অপমান করে বের করে দেওয়া হয়। এমনকি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অপবাদও দেন নাসির উদ্দিন।

আবদুল মোতালেব তালুকদার বলেন, নাসির উদ্দিন এসব বিষয়ে কোনো দিন কর্ণপাত করেননি। বরং স্বাধীনতাবিরোধীদের দিয়ে তার বলয় সাজিয়েছেন। তিনি জানান, প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়েছেন। তিনি ঐ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

পায়রা বন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের একজন কলাপাড়ার লালুয়া ইউনিয়নের চর চান্দুপাড়া গ্রামের মো. হাসান খান ইত্তেফাককে জানান, সরকারের জন্য আমরা জমি দিয়েছি। কথা ছিল আমাদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি চাকরি দেবে। কিন্তু আমরা কোনো চাকরি পাইনি। এজন্য মানববন্ধনও করেছি। এছাড়া লালুয়া ইউনিয়নের মঞ্জুপাড়া গ্রামের পলাশী আক্তার এবং টিয়াখালি গ্রামের কবির তালুকদারের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তারাও জানিয়েছেন, জমিজমা হারিয়ে তারা নিঃস্ব হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের চাকরির ব্যবস্থা করেনি। 

কলাপড়া প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ঐ সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, পায়রা বন্দরের বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে বহুমুখী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয়। এ সুযোগ নিয়ে প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন তার ভায়রা এ বি এম জাহিদুল ইসলামের নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নাম দেওয়া হয়, এবিএম ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট লি.। এটি মূলত নাসিরেরই পরোক্ষ প্রতিষ্ঠান। বনানী ডিওএইচএস এর মসজিদ রোডের ১০৮ নম্বর বাড়িটি নাসির উদ্দিনের। সেখানেই এ বি এম ওয়াটার ডেভেলপমেন্টের অফিস। এ ধরনের আরো কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে নাসিরের। যেমন আলী আক্কাস কন্সট্রাকশন কোম্পানিটিও নাসিরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। শুধু তাই নয়, প্রকল্পের ডকুমেন্ট তৈরি থেকে শুরু করে ফিজিবিলিটি স্টাডিও পরিচালিত হয় নাসিরের প্রতিষ্ঠান দিয়ে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘এসব অভিযোগ আমার কানে এসেছে। আমি মন্ত্রণালয়কেও জানিয়েছি। তবে সংবাদ সম্মেলনে যে অভিযোগগুলো এসেছে তা এক পক্ষের। কেউ যদি আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল) মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলতে তাকে বেশ কয়েক বার ফোন দেওয়া হয়। তিনি ফোন ধরেননি। পরে তার মোবাইলে ভয়েস মেসেজসহ একাধিক এসএমএস দেওয়া হলেও তিনি উত্তর দেননি। 

এদিকে সম্প্রতি নাসির উদ্দিনের অপসারণ চেয়ে কলাপাড়ায় মানববন্ধন করা হয়েছে। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, চাকরি দেওয়ার নাম করে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়েছেন। এলাকার লোকজন তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।

ইত্তেফাক/এবি