কক্সবাজারের রামুতে সবজি চাষ বাদ দিয়ে তামাক চাষে ঝুঁকছেন অধিকাংশ কৃষকেরা। বেশি লাভের আশায় তামাক কোম্পানিগুলোর প্রলোভনে পড়ে প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে তামাক চাষে জড়িয়ে পড়েন কৃষকেরা। চলতি বছর রামুতে ১৪০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রামুর রাজারকুল, কাউয়ারখোপ, মনিরঝিল, মৈষকুম, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়ার নাপিতেরচর ও ফাক্রিকাটা এলাকায় বাঁকখালী নদীর দুই তীরে তামাকের ক্ষেত। এ ছাড়া ফসলি ক্ষেতে এবং পাহাড়ি এলাকায় চাষ বেড়েছে তামাকের।
নদীর তীরবর্তী চাষিদের ফলন নির্ভর করে পানি সেচের উপর। সেক্ষেত্রে বাকঁখালী নদী কৃষকদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু তামাক চাষে ব্যবহৃত অতিমাত্রার সার-কীটনাশক ও তামাকের রাসায়নিক উপাদান ক্রমেই নদী ও জলাশয়ের পানিতে মিশে পানিদূষণ করছে। বর্তমানে যা অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ডিম পাড়ার পরিস্থিতিতে কীটনাশকযুক্ত পানির কারণে মাছ বংশ বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ হারাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর দুকূল উপচে ঢলের পানিতে পলি জমে। আর সেই উর্বর জমির বেশির ভাগই এখন তামাকের দখলে। অথচ নদীর আশপাশের স্বল্প উর্বর জমিতে বাদাম, ভুট্টা, সরিষা, শাকসবজি, বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই তামাকের ক্ষতিকর প্রভাবে ভূমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়। তামাক চাষকৃত জমিতে অন্য ফসল সহজে হয় না। ফসলের জন্যে হুমকিস্বরূপ এই বিষাক্ত তামাক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক রোপন থেকে শুরু করে পাতা কাটা এবং শুকানো পর্যন্ত এর সকল প্রক্রিয়াতে রয়েছে বিষাক্ত উপাদান। কৃষকরা ভয়াল এ বিষ সম্পর্কে জানার পরেও বাড়তি লাভের আশায় তামাক চাষে ঝুঁকছে। এর পরিচর্যায় কৃষকরা নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের স্ত্রী ও কোমলমতি শিশুদেরও ব্যবহার করছে। ফলে বাড়ছে ক্যানসারসহ তামাকজনিত বিভিন্ন রোগের প্রকোপ। স্বাস্থ্য ও পরিবেশে ঝুঁকি জেনেও অনেকেই অতিরিক্ত লাভের আশায় তামাক চাষ ছাড়তে পারছে না।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ইতিমধ্যে বেশ কটি বেসরকারি সংস্থা কক্সবাজার জেলায় কাজ করলেও কৃষকের পক্ষ থেকে তামাক চাষ বন্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে অনেকটা বিনা বাধায় স্থানীয় কৃষকদের জিম্মি করে নানা প্রলোভন দেখিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো প্রতিবছর তামাক চাষে বিনিয়োগ করে আসছে।
আবু তারেক নামে এক কৃষক বলেন, তামাক চাষ আসলেই ক্ষতিকর উপাদান। কিন্তু সংসারের অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে তামাক চাষ করতে হয়। ফসলের চেয়ে তামাক চাষ করলে টাকা বেশি পাওয়া যায়। তাই অধিকাংশ কৃষক লাভের আশায় ফসলের পরিবর্তে তামাক চাষ করতে বেশি আগ্রহী হয়েছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলার সহসভাপতি মো. নেজাম উদ্দিন জানান, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি জেনেও কৃষকেরা তামাক কোম্পানিগুলোর ঋণসহায়তা ও লোভনীয় প্রলোভনে তামাক চাষ ছাড়তে পারছে না। দিন দিন তামাক চাষের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। তামাকে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার প্রয়োগের ফলে নদীদূষণ বেড়েছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র। পাশাপাশি তামাক পোড়ানোর জন্য সংরক্ষিত বন ও ভিটেবাড়ির গাছ কেটে উজাড় করা হচ্ছে।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশীষ কুমার জানিয়েছেন, তামাক চাষ আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। এখন শাক সবজি ও ফলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক কৃষকরা তামাক চাষ ছেড়ে অনেকটা ফসলের দিকে ঝুঁকছে। তামাক পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর একটি উপাদান। তামাক চাষের ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়। যে ভূমিতে একবার তামাক চাষ করা হয়, সেখানে অন্য কোন ফসল হয় না। যারা তামাক চাষ করেন, তাদের কৃষি অফিস থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করা হয় না। কৃষকদের তামাক চাষ থেকে সরে আসতে আমরা নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে আসছি। এটি অব্যাহত থাকলে তামাক চাষ একেবারে কমে আসবে।
