‘গণহত্যা দিবস’-এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কতদূর'

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৪, ০৪:৩০

একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের ২০ তারিখে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলন চিরতরে দমনে গণহত্যার নীলনকশায় অনুমোদন দেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্কালীন মেজর সিদ্দিক সালিকের গ্রন্থ ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ থেকে জানা যায়, এদিন ঢাকা সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল হামিদ খান, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক টিক্কা খান, জেনারেল পিরজাদাসহ ঊর্ধ্বতন সামিরক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে যে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালিত হয়, তা অনুমোদিত হয়।

এই দিন ছিল অসহযোগ আন্দোলনের ২৪তম দিন। সেই দিনের ঘটনা নতুন প্রজন্মের জানা উচিত। সেদিন সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। মধ্যরাতে পাকিন্তানি সৈন্যরা সাঁজোয়া ট্যাংক নিয়ে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর নামে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে হত্যা করতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা ও রাজারবাগে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষক, বাঙালি পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের হত্যা করতে থাকে। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে তারা। এর অব্যবহিত আগেই জাতির পিতা স্বাধীনতার চূড়ান্ত  ঘোষণা বার্তা লিখে যান—‘ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও’—যা প্রথমে ইপিআরের ওয়্যারলেস মাধ্যমে প্রচারিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে এই বার্তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দি করে অমানুষিক নির্যাতন করে। ১৩ জুন পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস যুক্তরাজ্যের দ্য সানডে টাইমস (The Sunday Times) পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘জেনোসাইড’ (GENOCIDE) শিরোনামে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের নির্মম বর্বরতার বাস্তব চিত্র নির্ভর একটি বিস্তারিত নিবন্ধ প্রকাশ করলে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টি ত্বরান্বিত হয়।

জাতিসংঘের ‘দ্য কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইড’ অনুযায়ী নিম্নবর্ণিত পাঁচটি কাজের যে কোনো একটি করলে তা গণহত্যার অপরাধ হবে :১. জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের ব্যাপক হারে হত্যা করলে, ২. তাদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিসাধন করলে, ৩. কোনো জাতিগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিসাধনের লক্ষ্যে সুকৌশলে কোনো কর্ম পরিচালনা করলে, ৪. সদস্যদের প্রজননক্ষমতা বিনষ্ট করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলে এবং ৫. শিশুদের পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন বা নিজ জাতিগোষ্ঠী থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিলে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী ২৫ মার্চের ঘটনা গণহত্যার শামিল নিঃসন্দেহে। এই রাতে পাকিস্তান বাহিনী প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে হত্যা করে। ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত ৯ মাসে হত্যা করে ৩০ লাখ বাঙালিকে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দি পলিটিক্যাল টাস্কফোর্স পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৫৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ৪৩টি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এতে অন্তত ৫ কোটি লোক নিহত হয়েছে। ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক গণহত্য দিবস পালিত হলে এইসব গণহত্যার ব্যাপারে বিশ্ববাসী আরো সচেতন হবেন। আজকে গাজায় চলা গণহত্যার মতো ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে বিশ্বজনমত আরো বাড়বে।

২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক বর্বরোচিত হামলার সেই নৃশংস ঘটনার স্মরণে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ মহান জাতীয় সংসদের চতুর্দশ অধিবেশনে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করা হয়। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে একসময় গণহত্যার এই বিষয়টি চাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়। ১৯৭৫ সালের পর এই অপরাজনীতিতে জড়িত ছিল সামরিক-বেসামরিক আমলা, তাদের পাকিস্তানি দোসররা। গণহত্যার বিষয়টিকে তারা খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি অবলেপন। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০১৭ সালে প্রথম বারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালিত হয়। ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিকৃতি প্রতিরোধ করা হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখা হবে, সর্বোপরি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে নারকীয় ও বর্বরোচিত এই হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে অবহিত করে গণহত্যাকারী ও তার দোসরদের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরা হবে—এটাই এই দিবসের লক্ষ্য। এখন এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সচেষ্ট হতে হবে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সংগঠন লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলারসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি মিলেছে। এখন প্রয়োজন জাতিসংঘের স্বীকৃতিও। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসী স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারবেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলার ইতিহাসে ঘটেছিল আরেক কালো অধ্যায়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা ভেবেছিল বাঙালির অস্তিত্ব সমূলে বিনাশ করা যাবে। পাকিস্তানি ধারায় বাংলাদেশকে শাসন করা যাবে। ২১ বছর সেই ষড়যন্ত্রই চলেছে। বাংলার মাটিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি তার দোসররা বিভিন্নভাবে বাংলার মাটিতে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানিদের সঙ্গে ব্যাপক গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, সীমাহীন লুটপাটে যুক্ত হয়েছিল তারা। এই অপরাধের জন্য ১৯৭২ সালেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় সাড়ে ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।

ইতিহাসের এই দায় থেকে জাতিকে মুক্ত করা, ইতিহাসকে শুদ্ধ করার প্রয়োজনেই শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়ের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের পথ ধরেই আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছেন, ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাস ঢেলে সাজাচ্ছেন। সংবিধানের চার মূলনীতি প্রতিস্থাপন করেছেন। ত্রিশ লাখ মানুষকে হত্যা এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি যারা করেছে, তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তাই আজকে জাতির সময় এসেছে, এই গণহত্যার সব ঘটনার বিবরণীর সঙ্গে আগামী প্রজন্মকে যুক্ত করা। তারই ন্যায্যতার প্রয়োজন আজ। প্রয়োজন ২৫ মার্চ কালরাত্রির সেই ভয়াবহ নৃশংসতা এবং একই সঙ্গে লাগাতার ৯ মাসের হত্যাযজ্ঞের বিবরণ জনসমক্ষে নিয়ে আসা। প্রয়োজন এই হত্যাযজ্ঞকে স্মরণ করে গণহত্যা দিবস যথাযথভাবে পালন করা। একই সঙ্গে জাতীয়ভাবে দিনটি নির্ধারণ করে সব আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি আদায় করা। একই সঙ্গে আজকে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ১৯৭১ সালের ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যের বিচারের লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জনমত গঠন। প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশে সংগঠিত গণহত্যা, সম্পদ ধ্বংস ও লুণ্ঠনসহ নারী নির্যাতনের জন্য যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ। পাকিস্তানের কাছে পাওনা সব অর্থ-সম্পদের হিস্যা আদায় করাও আজকে একটি কর্তব্য। যুদ্ধাপরাধীদের মানবতাবিরোধী অপরাধে যাদের বিচার হয়েছে, যাদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা। এসব কাজ সম্পন্ন করার প্রয়োজনেও এই দিবসটি পালনের গুরুত্ব সমধিক।

শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, আজকের সুসভ্য বিশ্বসমাজ ও বিশ্বমানবতার অগ্রযাত্রার স্বার্থেও অন্তত একটি দিন গণহত্যার মতো পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন এই কারণেও যে, আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। আসন্ন এই দিবসকে ঘিরে গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা জাগ্রত করা এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাই হবে আমাদের কাজ। যাতে আর কখনই এইরকম গণহত্যার ঘটনা না ঘটে বিশ্বের কোনো দেশে।

 লেখক :বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.

ইত্তেফাক/এমএএম