সুখের সন্ধানে

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৪, ০৬:৩০

ক্যালেন্ডারের পাতায় গতকাল ২০ মার্চ শুধু একটা দিন নয়, বরং অধিক সুখী, অধিক অন্তর্ভুক্ত ও অধিক স্থিতিস্থাপক বিশ্বের জন্য একটা সর্বজনীন আন্দোলন। বিশ্বের সব মানুষের জন্য সুখ ও কল্যাণ—এই আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ১২ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দিনটিকে আন্তর্জাতিক সুখ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা ২০১৩ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। এবারের এই দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘একসাথে সুখ’, অর্থাৎ অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার এবং বৃহত্তর কিছুর অংশ হওয়ার বোধ থেকেই আসে স্থায়ী সুখ।

সুখ মানুষের অতি কাঙ্ক্ষিত একটি লক্ষ্য। এখন প্রশ্ন, সুখের সংজ্ঞা কী বা সুখ বলতে কী বোঝায়? মানুষ কীসে সুখ পেতে বা কীভাবে সুখী হতে পারে? সুখ ও সন্তুষ্টির ব্যাপারটা মানুষের জীবনে জড়িয়ে থাকলেও তা সংজ্ঞায়িত করা দুরূহ। কারণ সুখের অর্থ একেক মানুষের কাছে একেক রকম। প্রাচীন কাল থেকে আজও মানুষ এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছে, আলোচিত হচ্ছে, বর্তমান দুনিয়ায় গবেষণাও হচ্ছে—তবে উত্তর দেওয়া কঠিন। প্রাচীন কালের চৈনিক, গ্রিক, ভারতীয় দার্শনিক ও চিন্তকগণ থেকে হাল আমলের দার্শনিকগণ যেমন—লাও সে, কনফুসিয়াস, ঝুয়াংজি; সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টোটল; চাণক্য; রুশো, জেরেমি বেন্থান, বার্ট্রান্ড রাসেল নানা মতামত দিয়েছেন।

আজকের দিনের বিজ্ঞানীগণও মানুষের মস্তিষ্কের সুখ রিসিপ্টরগুলোর বৈশিষ্ট্যসমূহ অবলোকন ও দার্শনিক ব্যাখ্যা করেছেন। সুখকে ভালোভাবে বুঝতে হলে দর্শন, জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও কলা সমন্বয়ে আন্তঃবিষয়ক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হবে। সক্রেটিস বলেছেন, তোমার যা আছে তা নিয়ে তুমি যদি সুখী না হও, তবে যা তুমি পেতে চাও তা নিয়ে সুখী হবে না। প্লেটোর মতে, সুখ, প্রকৃতি, সৌন্দর্য ও সমাজ পরস্পর সম্পর্কিত। মানুষ এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় বলে সমাজ ও বন্ধুত্ব থেকে সুবিধা নেয়—এজন্য সামাজিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সুখ অর্জনে প্লেটোর মতের সঙ্গে তার শিষ্য অ্যারিস্টোটল মিতাচার, মনোবল, বিচক্ষণতা ও ন্যায়বিচার—এ চার প্রধান গুণের সমন্বয়ের কথা বলেছেন।

মধ্যযুগের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তক ইবন সিনার মতে, সুখ হচ্ছে মানুষের লক্ষ্য এবং প্রকৃত সুখ বিশুদ্ধ ও পার্থিব স্বার্থমুক্ত। আরেক ইসলামি দার্শনিক আল-গাজালির মতে, সুখের চারটি উপাদান—আত্মজ্ঞান, ঈশ্বরের জ্ঞান, জাগতিক জ্ঞান ও পরকালের জ্ঞান। ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র সুখকে দৈবক্রমে শুভ ও অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার বলে কল্পনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণায় ‘জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের সাধনা’কে তিনটি অপরিহার্য অধিকার বলে গ্রহণ করা হয়েছে। সুখের বিষয়টি বাঙালির দর্শনচর্চায়ও এসেছে, যা হাজার বছরের বেশি পুরোনো, যেমন দশম শতকের চর্যাপদের দর্শনচর্চায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

আধুনিক বিজ্ঞান সুখ বিষয়ে কী বলে, তা দেখা যেতে পারে। রিভিউ অব জেনারেল সাইকোলজি সাময়িকীতে ২০০৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে যে, কারো সুখ তার জীন ৫০ শতাংশ, আর্থিক অবস্থাসহ নিজের জীবনের পরিস্থিতি ১০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কাজেই সুখের কিছুটা তার নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন। আবার সুখী হওয়ার অর্থ একজন প্রতিদিন প্রতিক্ষণ নির্মল আনন্দ ও প্রফুল্লতা উপভোগ করবেন—এই ধারণাও সঠিক নয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বার্কলে ২০১৪ সালে পরিচালিত কীভাবে সুখী হওয়া যায় বিষয়ক আয়োজিত এক অনলাইন কোর্সে সুখ ও সন্তুষ্টি অর্জনে সম্পর্ক, সহানুভূতি, কৃতজ্ঞতা ও মননশীলতা যে ভূমিকা রাখে, কোর্সে অংশগ্রহণকারীগণের ফলাফলে তা দেখা গেছে।

সুখী হওয়ার পন্থা একেক জনের কাছে একেক রকম হলেও সুখী থাকার ব্যাপারে কতগুলো সাধারণ বিষয়ে সবাই একমত প্রকাশ করেছেন—কৃতজ্ঞতা ও মননশীলতার চর্চা করা, মানসিকতার উন্নয়ন করা, নিজের পছন্দসই বা শখের কাজে যুক্ত থাকা, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, চ্যালেঞ্জকে আলিঙ্গন করা, মানবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া এবং অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া ও সাহায্য করা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে প্রতিপালন দ্বারা সামাজিক বন্ধন জোরদার করা, পর্যাপ্ত ঘুম, ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে নিজের প্রতি যত্নশীল থাকা, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা, স্ব-আলাপে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা ইত্যাদি। স্বামী-স্ত্রী, পরিবার, বন্ধু, সমাজের অন্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সারা জীবন সুখী রাখার সবচেয়ে বড় উপাদান, যা স্ট্রেস হরমোনকে দুর্বল করে, ফলে এমন সম্পর্কের অধিকারীগণ শারীরিক ও মানসিকভাবেও স্বাস্থ্যবান এবং তুলনামূলকভাবে বেশি সুখী হয়। সাম্প্রতিককালে ডিজিটাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসেছে, যার অতিব্যবহার শরীর-মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে ব্যবহার সীমিত করা দরকার।

সুখের গোপন কথা হলো আরো চাওয়াতে নয় বরং অল্পে সন্তুষ্ট থাকার সক্ষমতা অর্জন করায়। তবে বৈশ্বিক বাজার অর্থনীতির বিদ্যমান পরিবেশে চাহিদা সীমাহীন হওয়ার সুযোগ থাকায় সুখী হওয়া কঠিন। সুখী-সুন্দর জীবনযাপনে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব—সবার দায়িত্ব থাকলেও প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এই পৃথিবীতে স্বল্পকালীন ও নির্ধারিত অবস্থানকে সুখী করতে ব্যক্তি হিসেবে নিজেকেই সচেষ্ট হতে হবে, যথোপযুক্ত কৌশল বের করতে হবে। ব্যক্তি নিজে সুখ-সন্ধানে সক্ষম হলে এবং পাশাপাশি সমাজ-সংস্কৃতির হূত ও ক্ষয়িত মূল্যবোধগুলো ফেরানো গেলে পর্যায়ক্রমে পরিবার, সমাজ অর্থাত্ সবাই সুখী হবে।

লেখক :ভূতত্ত্ববিদ ও গবেষক

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন