ডিজ ইনফরমেশন বা কুতথ্য জানা জরুরি কেন

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৪, ০৭:০০

ডিজ ইনফরমেশন বা ‘কুতথ্য’ শব্দটি এখন দেশে-বিদেশে এবং একাডেমিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত একটি বিষয়। সমাজবিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিষয়টি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। কারণ রাজনীতিতে এর হীন প্রভাবের কারণে বিশ্ব জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্র বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

প্রাচীন অ্যাথেন্সেও বিভ্রান্তিকর কুতথ্যের প্রচার দেখা গেছে। যেমন—সক্রেটিসের বিচারের কথা যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যাবে, অ্যাথেন্সের তত্কালীন শাসকগণ অভিযোগ করেছিলেন যে সক্রেটিস তরুণদের মধ্যে অ্যাথেনীয়দের বিশ্বাস সম্পর্কে ‘কুতথ্য’ ছড়িয়েছেন এবং ‘তরুণদের মন’কে দূষিত করেছেন। মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সক্রেটিস ‘হেমলক বিষ’ পান করে মৃত্যুদণ্ড গ্রহণ করেন। কারণ তিনি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা এবং তিনি যে সত্য ধারণাগুলোর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, সেগুলো রক্ষার ব্যাপারে দৃঢ় ছিলেন।

মধ্যযুগে যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের সৈনিকদের নৈতিকতা ও সাহসকে দুর্বল করার জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর কুতথ্য ছড়িয়েছে। আবার, বিপরীতভাবে যোদ্ধাদের উত্সাহিত করার জন্য তারা গান, কবিতা ও রসের কথামালা বলত। এছাড়া, যুদ্ধের ময়দানে গান গাইতে এবং নাচতে পারে এমন সুন্দরী নারীরাও উপস্থিত থাকত, আর এসবের উত্স ছিল কুতথ্য, যাতে করে যুদ্ধরত সেনাদের মনোবল চাঙ্গা করা যায়। আরব জাতির ইতিহাসের এরকম অনেক যুদ্ধের ঘটনা জানা যায়।

আধুনিক যুগে কুতথ্যের উত্পত্তি হয় ১৯৫০-এর দশকে, রাশিয়ান শব্দ ‘ডেজিনফরম্যাটসিয়া’ থেকে, যার অর্থ হলো সত্যকে লুকানো বা কোনো বিশেষ বিষয় সম্পর্কে জনমত পরিবর্তন করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এবং সচেতনভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো। শীতল যুদ্ধের সময়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া) উভয়ই একে অপরের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর কুতথ্য ব্যবহার করার জন্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে, কুতথ্য বিভিন্ন উপায়ে প্রতিপক্ষকে ভুক্তভোগী করার জন্য অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

কুতথ্য, ভুল তথ্য এবং মিথ্যা সংবাদ—এই তিনটি ভিন্ন ধারণা। তবে এগুলোর বৈশিষ্ট্যগুলো অনেকটা একই রকম। কুতথ্য হলো সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের উদ্দেশ্যমূলক প্রচার। অন্যদিকে, প্রতারণার উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয় ভুল তথ্য। আর মিথ্যা সংবাদ হলো, যা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। অন্যদিকে, ম্যালিনফরমেশন হলো সঠিক তথ্য বা কুতথ্য, যা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়। অনেক সময় অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত থাকে এর সঙ্গে।

কুতথ্য প্রচারকারীরা তাদের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম যেমন টুইটার, টিকটক, ইউটিউব এবং ফেসবুক ব্যবহার করে কুতথ্য ছড়িয়ে দেয়। এছাড়া, এর প্রচার ক্রস-মিডিয়া এবং মিক্স-মিডিয়া কৌশলের ওপরও নির্ভর করে, যেমন ব্লগ। আবার অনেকে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এমনভাবে কুতথ্য ছড়ানো হয়, যাতে ভোটাররা নির্বাচনি প্রচারের প্রেক্ষাপটে তাদের মতামত গড়ে তোলার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েন।

ব্রাজিলে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কুতথ্য ছড়ানোর জন্য টুইটার ও হোয়াটসঅ্যাপ উভয় মাধ্যম ব্যবহূত হয়েছিল। টুইটগুলো এবং হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাগুলো প্রায়শই কুতথ্যকে ‘যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা’ হিসেবে দাঁড় করায় এবং কর্তৃপক্ষ তা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলে চালিয়ে দেয়। উপরন্তু, ব্রাজিলে কুতথ্য প্রচারকারীরা টুইটারে রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ২০১৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য কন্টেন্ট তৈরি এবং প্রচারের কৌশল ব্যবহার করেছিল। এ বছর অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ডিজইনফরমেশন অস্ত্র ব্যবহূত হতে পারে।

২০২১ সালে কুমিল্লায় সংঘটিত সহিংসতার কথা আমরা কম-বেশি সবাই জানি, যার ভিত্তি ছিল কুথত্য। কুতথ্য তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘রাজনীতিবিরোধী’ মনোভাবও বাড়াতে পারে। এর দ্বারা আইনি অধিকার এবং স্বার্থ লঙ্ঘিত হতে পারে। কুতথ্যের কারণে বেড়ে যেতে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও। মোটকথা, কুতথ্য আমাদের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের নানান দিককে প্রভাবিত করে। যেহেতু কুতথ্য সম্পূর্ণরূপে দূর করা অসম্ভব, তাই আমাদের সচেতন হতে হবে, যেন আমরা এটি কমাতে পারি।

লেখক :জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন