সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

আড়াই মাসে গ্রেফতার সহস্রাধিক

রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

গ্রেফতার-অভিযানেও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না খুন, মাদকসহ সব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৪, ০৭:৩০

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং। কোনো কিছুতেই দমানো যাচ্ছে না কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশে গ্রাম পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ছে। খুন, ধর্ষণ, মাদক চোরাচালান, মাদক সেবনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে কিশোররা। মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ ও আধিপত্য নিয়ে বিরোধে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে তারা। কিশোর অপরাধ দমনে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে নানাভাবে চেষ্টা করেও পেরে উঠছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ডাটাবেজ তৈরির কাজ চললেও মিলছে না সুফল।

ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও একশ্রেণির জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায় থেকে পাড়ামহল্লা, অলিগলি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। মোটরসাইকেল নিয়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানোর কারণে সবার কাছে আতঙ্কের নাম এখন ‘কিশোর গ্যাং’।

গ্রামগঞ্জেও বিস্তৃত হয়েছে কিশোর অপরাধীদের নেটওয়ার্ক। গত দুই মাসে সহস্রাধিক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও র‍্যাব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কমছে না। কিশোর গ্যাং লাঠিয়াল বাহিনীর মতো হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়। পাড়ার একশ্রেণির মেম্বার, ইউপি চেয়ারম্যান, কোনো কোনো সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতারা তাদের প্রশ্রয় দেয়। তাদের দিয়ে দখল, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি করাচ্ছে। কেউ বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে তাদের চাঁদা দিতে হয়। এসব কিশোর গ্যাং প্রকাশ্যে মানুষ খুনও করে। বছর তিনেক আগে রাজধানীর পল্লবীতে সন্তানদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় শাহিনুদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে। সুমন নামে এক কিশোর গ্যাং লিডার তাকে হত্যা করে। পরে সে এক জনপ্রতিনিধিকে ফোন করে বলে, স্যার ফিনিশ। ঘটনাটি বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

ইতিমধ্যে সাভারে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সাভারে মুদি দোকানদার টাকা ছাড়া সিগারেট দেয়নি। এ কারণে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করে ঐ দোকানিকে হত্যা করে কিশোর গ্যাং। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গোলাকান্দাইলে কিশোর গ্যাং মাসুম বিল্লা হত্যাসহ ১২ মামলার আসামি। ঐ এলাকায় ঘরবাড়ি কিছুই করতে গেলেই তাকে চাঁদা দিতে হয়। সে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে। অথচ পুলিশ তাকে খুঁজে পায় না। স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির একজন কর্মকর্তার সঙ্গে তার সখ্যতা রয়েছে বলে এলাকাবাসী জানান। এছাড়া পুরো রূপগঞ্জ এলাকায় পাড়া-মহল্লায় অনেকগুলো কিশোর গ্যাং রয়েছে।

কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী, গাজীপুর—এসব এলাকাতেও পাড়া-মহল্লায় আছে কিশোর গ্যাং। এছাড়া সারা দেশ থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধিরা জানান, সারা দেশে ইউনিয়ন-গ্রামে রয়েছে কিশোর গ্যাং।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এদের উত্থানের মূলে রয়েছে মাদক। তারা পকেটে ইয়াবা নিয়ে চলে, বিক্রি করে। কেউ অর্ডার দিলে মোটরসাইকেলে দিয়ে পৌঁছে দেয়। স্ব স্ব থানার একশ্রেণির পুলিশ নিয়মিত তাদের কাছ থেকে মাসোহারা পায়। তাদের ধরতে গেলে জনপ্রতিনিধিরা তাদের দলীয় লোক বলে ছাড়িয়ে নেয়।

এলাকার জ্যেষ্ঠ লোকজন জানান, আগে তাদের সামনে এই বয়সের সন্তানরা ভয়ে আসতো না। তাদের এখন চাঁদা দিয়ে চলতে হয়। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটবে।

‘বড় ভাই সালাম দিছে, সামনে পার্টি... কিংবা কাকা সালামি কই?’ ঈদ, নববর্ষ, থার্টিফাস্ট নাইটের নামে এভাবেই নীরবে চাঁদাবাজি করছে এই উঠতি বয়সী ছেলেরা। শুরুতে আড্ডা, পার্টি বা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার মতো অপরাধে যুক্ত থাকলেও এখন তা বিস্তৃত হয়েছে ভয়ংকরভাবে। আধিপত্য বিস্তার থেকে শুরু করে জবরদখল ও মাদকবাণিজ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে বখাটে কিশোরদের। এমন কোনো অপরাধ নেই কিশোর গ্যাং করছে না। তারা সিগারেট, চা বাকিতে খায়। এদের পকেটে ছুরিসহ দেশীয় অস্ত্র থাকে। ভোটের সময় নেতাদের পক্ষে সিল মেরেছে। মাদক হলো তাদের আয়ের উৎস। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মাদকের মতো সর্বনাশা তাদের গ্রাস করে করেছে। এটা দেশের জন্য খারাপ বার্তা। এটা চলতে থাকলে উন্নয়নে বড় বাধার সৃষ্টি করবে। মানুষের প্রথম বিষয় হলো নিরাপত্তা।

গতকাল রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি থেকে মানুষ মুক্তি চায়। সরকার সমর্থকদের ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাং সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনৈতিক মদতে কিশোর গ্যাং নামে উঠতি কিশোরদের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। যারা কিশোর গ্যাং সৃষ্টি করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দেশব্যাপী সব থানাকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপারে কোনো আপোষ নেই। যেখানে কিশোর গ্যাং অপরাধ করবে, সেখানেই ব্যবস্থা নিতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা ব্যবস্থা না নিলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। র‍্যাবের মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন বলেন, র‍্যাব মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অলআউট ব্যবস্থা নিচ্ছে। সারা দেশে র‍্যাবের পক্ষ থেকে কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা করে অভিযান চলছে। আমরা ছাড়ব না। কোনো অবস্থাতেই দেশে কিশোর গ্যাং বলতে কোনো চিহ্ন রাখব না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ক্রমান্বয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। নানা ধরনের অপরাধ করে সমাজে নৈরাজ্য ও অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে পরিচালিত ব্যবস্থা একপক্ষীয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে শুধুমাত্র গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেফতার করছে। কিন্তু গ্যাংগুলোর আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা কিংবা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত ‘বড় ভাইদের’ আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। দুই-একটি মামলা হলেও সেই মামলায় এদের অবস্থান আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে না।

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি এদের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে। শনিবার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণ নিয়ে আয়োজিত ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার, ড. খ. মহিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। টিকটক অ্যাপসের মতো আরো অনেক অ্যাপস আছে, এসব বিতর্কিত অ্যাপস বন্ধ করতে হবে। সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে মদতদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যতীত কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

ইত্তেফাক/এমএএম