কোথায় আছে একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চের ইত্তেফাক?

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৪, ১৫:২৪

আজ স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশের সব জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ সংখ্যা, স্বাধীনতাসংখ্যা। কিন্তু আজ থেকে ৫৩ বছর আগে একাত্তর সালের ছাব্বিশে মার্চ ঢাকা নগরীতে কোনো দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে পারেনি। কথাটা বোধ হয় ঠিক হলো না। বলা যায়, দেশের কোনো মানুষের কাছে ঢাকার কোনো সংবাদপত্র পৌঁছোতে পারেনি। ঢাকা নগরীর কোনো হকার পত্রিকা অফিসে যেতে পারেনি পত্রিকা সংগ্রহের জন্যে। কিন্তু একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। এবং সেই পত্রিকাটি হচ্ছে দৈনিক ইত্তেফাক। অন্য কোনো পত্রিকা ছাপা হয়েছিল কি না, আমি জানি না। তবে ইত্তেফাকের কথাটা এজন্যেই বলছি যে, সে সময় আমি ইত্তেফাকে কর্মরত ছিলাম, সেই পঁচিশে মার্চের রাতে। আজ খুব ইচ্ছে করছে সেই সময়টার স্মৃতিচারণ করতে।

পাঠক ক্ষমা করবেন, সেই দিনের স্মৃতি বলার মতো এখন আর কেউ বেঁচে নেই। সর্বশেষ যিনি মারা গেছেন, তিনি সৈয়দ শাহজাহান, দৈনিক ইত্তেফাকে রিপোর্টিংয়ে  ছিলেন। ইত্তেফাকের এখন একজন সিনিয়র সাংবাদিকই বেঁচে আছেন, তিনি শাহবুদ্দিন ভুইয়া, তিনি সহ-সম্পাদক ছিলেন, কিন্তু সেদিন, ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় তার ডিউটি ছিল না। সেই সময় আমার পদও ছিল সহ-সম্পাদকের। নৈশপালায় আমার ডিউটি। আর এই কারণেই সম্ভব হয়েছে এমন কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের, যা আমার কাছে অমূল্য সঞ্চয়।

সন্ধ্যার পর যখন অফিসে এলাম, তখন আমাকে দেওয়া হলের তাজউদ্দীন সাহেবের নির্দেশাবলী লেখার দায়িত্ব। ঢাকার অবস্থা তখন অত্যন্ত উত্তপ্ত। অনবরত টেলিফোন আসছে। ইয়াহিয়া খান চলে গেছেন কি না, মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে কি না-এই অজস্র টেলিফোন, যা আমাদের অনেককেই ধরতে হচ্ছিল এবং উত্তর দিতে হচ্ছিল। শহিদ সিরাজুদ্দীন হোসেন বসে লিখছেন তার কক্ষে, বার্তা বিভাগের দায়িত্বে আছেন মরহুম আসফ উদদৌলা রোল। ডেস্কে আছেন ইয়াহিয়া বখত, রিপোর্টিংয়ে সৈয়দ শাহজাহান, আমীর হোসেন। রাস্তায় সেনাবাহিনী নামতে পারে, এই কথাও ছড়িয়ে পড়ছিল সর্বত্র। এরই মধ্যে রাত তখন আনুমানিক ১০টা ৩৫ মিনিট- একটা টেলিফোন এলো রেডিও পাকিস্তান থেকে। তখন দশটায় রেডিও পাকিস্তান ঢাকার প্রচার শেষ, হয়তো-বা পাঁচ মিনিট পর আসা টেলিফোনে অজ্ঞাতনামা একজন জানালেন, বারো সেনাবাহিনীর একটি দল শাহবাগের রেডিও অফিসের ভেতর কিছু একটা রেখে গেছে। ফোনটা ধরেছিলাম আমিই। জানালাম সিরাজ ভাইকে। তিনি বললেন, বিভিন্ন ধরনের টেলিফোন এবং ভাসমান নানা প্রকার কথাবার্তার ভিত্তিতে একটি ছোট বক্স আইটেম লিখে দিতে। রাত এগারোটার দিকে পরিস্থিতি অনেক ঘোলাটে এবং থমথমে হয়ে এলো। আমরা অনুমান করছিলাম, ভয়াবহ একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে কিন্তু সেটা কতখানি ভয়াবহ, সেটা আন্দাজ করতে পারছিলাম না আমরা কেউই। এই সময়ই ইত্তেফাক অফিসের বার্তা বিভাগে এলেন সহকারী সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। তিনি জানালেন ঢাকার অবস্থা খুবই খারাপ। বিরাট একটা কিছু ঘটে যেতে পারে। একসময় মরহুম মোতাহার হোসেন সিদ্দিকী এলেন এবং সিরাজ ভাইয়ের কক্ষে গিয়ে কিছু কথা বললেন, তারপর চলে গেলেন। শুনলাম তিনি সিরাজ ভাইকে অনুরোধ করেছিলেন চলে যেতে কিন্তু সিরাজ ভাই অস্বীকার করেছিলেন। রাতে আমীর হোসেনও চলে গেলেন।

আমরা গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। রাত যত গভীর হচ্ছিল, ততই বোঝা যাচ্ছিল পরিস্থিতির ভয়াবহতা। আমাকে বলা হলো আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে টেলিফোন করে পুরো ব্যাপারটি জানতে। কিন্তু ওদিক থেকে কোনো জবাব পাওয়া গেল না। দৈনিক পূর্বদেশ অফিস থেকে ফোন করলেন মরহুম এহতেশাম হায়দার চৌধুরী। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা পত্রিকা বের করছি কি না। বার্তা বিভাগে এ নিয়ে কেউ কেউ বললেন, বলে দাও আমরা পত্রিকা বের করতে পারছি না। পত্রিকা বের হলে সে পত্রিকা পরদিন পড়বে কে? কারফিউ তো হবে নির্ঘাত। তখন কোনো হকার আসবে পেপার নিতে? কিন্তু সিরাজ ভাই বললেন অন্য কথা। তিনি বললেন, বলে দাও, পত্রিকা আমরা বের করবই। মানুষের হাতে না পৌঁছালেও ইতিহাসের হাতে তো থাকবে এই দলিল। আমি বলে দিলাম সেই কথা। তিনি ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, আপনারা চেষ্টা করুন, আমরা তো পারলাম না। দৈনিক পাকিস্তানও পারছে না। তবু যদি কখনো কেউ কিছু জানতে পারে, সেজন্যেই আপনাদের ওপর এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব বর্তাচ্ছে।

এরপর সিরাজ ভাই বললেন, অবস্থা খুব খারাপ। ওপরে বসে কাজ করা সম্ভব নয়। সবাইকে নিচে মেশিনরুমে গিয়ে পত্রিকা বের করতে হবে। ওপরতলাটা অন্ধকার করে দিতে হবে, যাতে সেনাবাহিনীর কোনো কনভয় দেখতে না পায়। আমরা চলে গেলাম নিচে এবং সেখানেই পত্রিকার ডামি তৈরি হলো, শুরু হলো ছাপা। এরপরের ঘটনা, এখানে অপ্রাসঙ্গিক।

কীভাবে ইত্তেফাক অফিসের ওপর দু-দুবার গুলি হলো, কীভাবে ক্যান্টিন ম্যানেজারের ভ্রাতৃপুত্রের খুলি উড়ে গেল গুলিতে, কীভাবে সিরাজ ভাই, রেজা ভাই এবং আমি গুলির হাত থেকে বেঁচে গেলাম, কীভাবে এরপর ইত্তেফাক অফিস কামানের গোলায় ভস্মীভূত হলো-এসবই ভিন্ন বিষয় আমি বলতে চাই, সেদিন সেই একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চ সমস্ত রকমের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দৈনিক ইত্তেফাক বেরিয়েছিল। কলেবর যদিও ছিল অনেক ছোট, তারপরও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই পত্রিকার একটি কপিরও হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। এই ঢাকায় বা বাংলাদেশের বা পৃথিবীর কোনো পাঠাগারে বা কোনো ব্যক্তির কাছে কি এই পত্রিকার কোনো কপি আছে?

শুধু ছাব্বিশে মার্চের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য দলিল, অগণিত ইতিহাস, সত্যের চেয়েও বিস্ময়কর অনেক তথ্য হারিয়ে গেছে, হারিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হয়েছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি, অনেক উপাত্ত জমা হয়েছে। কিন্তু সেটাই তো সব নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। জনযুদ্ধের এই চিত্র তুলে ধরতে হলে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ-সংগ্রমের কাহিনিও অতীতের বুক চিরে তুলে আনতে হবে। বিভিন্ন সময়ে ইতিহাস তুলে আনতে গিয়ে অনেকে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণই করেছেন। কোথাও আত্মবন্দনা, কোথাও ব্যক্তিবন্দনা ইতিহাসকে নৈর্ব্যক্তিক হতে দেয়নি। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের দলিল হয়তো হয়েছে কিন্তু ইতিহাস হয়নি। যারা ইতিহাসবেত্তা, তারা কখনো কোনো বিষয় এড়িয়ে গেছেন আর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের কারণে কিংবা কখনো সন্ত্রস্ত হয়ে নিশ্চুপ রয়েছেন। এর ফলে আমাদের জাতি ভয়াবহভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা বুঝি যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ ইতিহাস রচনার জন্য উপাত্ত সংগ্রহের কাজ সহজে শেষ হওয়ার নয়। এই প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। আর এরই জন্যে আমরা জানতে চাই, বাংলাদেশের এই জনযুদ্ধে মানুষ কীভাবে ভূমিকা রেখেছে, কীভাবে সৃষ্টি করেছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী মুক্তিসংগ্রাম। কেউ কি সন্ধান দেবেন ১৯৭১-এর ২৬ মার্চের ইত্তেফাক পত্রিকাটি কোথায় পাওয়া যাবে? কার কাছে? কোথায়? কোন দেশে?

• লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক জাগরণ

ইত্তেফাক/কেকে